ঋতু বদলের সঙ্গে পোশাকের ভাষাও বদলায়। বর্ষার বিষণœতা পেরিয়ে শরৎ আসে একটু আলো, একটু স্বস্তি আর নীল মেঘ নিয়ে। তাই শরতের পোশাকও নীল-সাদা রঙ যেন আকাশেরই এক টুকরো প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা দেয়। যেখানে সাদা মেঘের ভেলায় ভেসে থাকে ফ্যাশনের নতুন গল্প। শরতের পোশাক নিয়ে লিখেছেন মোহসীনা লাইজু
শরতের পোশাকের ফ্যাশনের মূলে থাকে এর স্নিগ্ধতা। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের শুভ্রতা আর হালকা রোদের মিষ্টি উজ্জ্বলতা সব মিলিয়ে ঋতুটির নিজস্ব নান্দনিকতা আছে। সেই নান্দনিকতা ডিজাইনাররা ফুটিয়ে তোলেন পোশাকেও। গরমের তীব্রতা কমতে শুরু করলে পোশাকের সৌন্দর্য্য খুঁজে ফেরে ফ্যাশন প্রিয়রা। কাপড়, হালকা রঙ আর নকশায় পাওয়া যায় নতুনত্ব। বিশেষ করে সাদা, আকাশি ও নীল হয়ে ওঠে শরতের ফ্যাশনের প্রধান রঙ। শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ কিংবা টপস সবখানেই শরতের আকাশ আর মেঘের আবহ ধরা পড়ে নানা রূপে, নানা মোটিফে।
সাদা-নীলের শরৎ শাড়ি
ডিজাইনারদের ডিজাইনে এবারকার শরতের শাড়িতে একটু ভিন্নতা খুঁজে পাওয়া গেছে। শুধু একরঙা সাদা নয়, সাদার সঙ্গে আকাশি, নীল কিংবা ধূসর রঙের মেলবন্ধনেও তৈরি হয়েছে নতুনত্ব। কোথাও সাদা পোশাকে আকাশ নীলের ছোট ছোট ফুল, কোথাও আকাশি কাপড়ে সাদা পাড়। আবার কোথাও নীলের ওপর সাদা শিউলীফুল। শাড়িতে যেমন ডিজাইনারা মেঘ আর কাশফুল ফুটিয়ে তুলেছেন। আকাশি রঙ শরতের আবহ বোঝায়। তেমনি নীলের গাঢ় ও হালকা শেডও ব্যবহার করা যায় ভিন্ন ভিন্ন আবহ তৈরিতে। দিনের অনুষ্ঠানে হালকা আকাশি বা প্যাস্টেল নীল যেমন মানানসই, সন্ধ্যার আয়োজনে রয়্যাল ব্লু, নেভি কিংবা ইন্ডিগো পোশাক দিতে পারে একটু বেশি আভিজাত্য। সুতি শাড়ি শরতে বেশি মানানসই হলেও এর পাশাপাশি সিল্ক, তসর ও মসলিনও অনেকে বেছে নিচ্ছেন। শরতের শাড়ির বিশেষত্ব হলো এর রঙ। বিশেষ করে সাদা শাড়িতে নীল পাড় কিংবা নীল শাড়িতে সাদা পাড়ের কম্বিনেশন বিশেষভাবে নজর কাড়ে। তাঁত, সুতি, হাফ সিল্ক, মসলিন, জামদানি কিংবা হ্যান্ডলুম বিভিন্ন ফেব্রিকসে শরতের কাশফুল, মেঘ নানাভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
শাড়ির ডিজাইনেও দেখা যাচ্ছে বৈচিত্র্য। বড় মোটিফের পরিবর্তে ছোট ফুল, কাশফুল, মেঘ, লতা-পাতা কিংবা জ্যামিতিক নকশা শরতের পোশাকে তৈরি করতে পারে আলাদা আবহ। কোনো ডিজাইনার বেছে নিয়েছেন সাদার ওপর সূক্ষ্ম নীল সুতোর কাজ, আবার কেউ বেছে নিয়েছেন নীলের ওপর সাদা বুটির শাড়ি। শাড়ির আঁচল ও পাড়েও আসছে নতুনত্ব। চওড়া পাড়ের পাশাপাশি চিকন কনট্রাস্ট বর্ডার, অসমান পাড় কিংবা হাতে আঁকা শরতের মোটিফের ব্যবহার শাড়িকে করে তুলছে ঋতুভিত্তিক।
সালোয়ার-কামিজে স্বস্তির ছোঁয়া
প্রতিদিনের ব্যস্ততায় সালোয়ার-কামিজ এখনো মেয়েদের অন্যতম পছন্দের পোশাক। সুতি, ভয়েল, লন, খাদি কিংবা হালকা কটনের মতো ফেব্রিক এ সময় বেশ আরামদায়ক। খুব ভারী কাপড়ের পরিবর্তে বাতাস চলাচল করে এমন ফেব্রিক শরতের স্বস্তি দিতে পারে ষোলআনা।
কামিজে সাদা-আকাশির পাশাপাশি প্যাস্টেল শেডের ব্যবহার বাড়ছে। কোথাও সাদা কামিজের সঙ্গে আকাশি ওড়না, কোথাও নীল কামিজের সঙ্গে সাদা পালাজ্জো কিংবা প্যান্ট এমন কনট্রাস্ট লুক কলেজ বিশ^বিদ্যালয়ের মেয়েদের কাছেও বেশ আকর্ষণীয়। নকশায়ও এসেছে পরিবর্তন। প্রচলিত ফ্লোরাল মোটিফের পাশাপাশি জ্যামিতিক মোটিফ, মিনিমাল এমব্রয়ডারি, অ্যাবস্ট্রাক্ট ডিজাইন ও হাতে করা সুই সুতার সূক্ষ্ম কাজও জায়গা করে নিচ্ছে। খুব বেশি কাজের বদলে পোশাকের একটি নির্দিষ্ট অংশে নকশা রাখার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। এতে পোশাকটি যেমন পরিপাটি লাগে, তেমনি থাকে আধুনিকতার ছাপ।
শরতের টপসে তারুণ্য
তরুণীদের দৈনন্দিন পোশাকে টপসের জনপ্রিয়তা এখন বেশ চোখে পড়ার মতো। শরতের জন্য টপসে ব্যবহার করা হয়েছে হালকা ফেব্রিক ও কোমল রঙ। সাদা, স্কাই ব্লু, বেবি ব্লু, পাউডার ব্লু কিংবা নীলের বিভিন্ন শেডে তৈরি টপস জিনস, পালাজ্জো বা স্কার্টের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে যায়। ডিজাইনে এবার খুব বেশি জটিলতা নেই। বরং মিনিমাল কাট, পাফ সিøভ, রাফল, টাই-আপ ডিটেইল, কলার কিংবা ছোট এমব্রয়ডারি টপসকে আলাদা করে তুলছে। শরতের আবহের সঙ্গে মিলিয়ে ছোট কাশফুল, মেঘ কিংবা বিমূর্ত নকশার প্রিন্টও নতুনত্বের জায়গা নিয়েছে।
ফেব্রিকেই স্বস্তি
পোশাক নির্বাচনে শুধু রঙ বা ডিজাইন নয়, ফেব্রিকও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে শরতের দিন এখনো বেশ উষ্ণ থাকতে পারে। তাই অতিরিক্ত ভারী বা শরীরের সঙ্গে লেগে থাকে এমন কাপড়ের বদলে হালকা, নরম ও বাতাস চলাচল করে এমন কাপড় বেশি উপযোগী। সুতি ও হ্যান্ডলুমের পাশাপাশি পাতলা খাদি, ভয়েল, মসলিন, লাইটওয়েট সিল্ক ও হালকা জর্জেটও ব্যবহার করা যেতে পারে পোশাকের ধরন অনুযায়ী। শাড়িতে একটু ফ্লুইড ফেব্রিক যেমন সৌন্দর্য বাড়ায়, তেমনি সালোয়ার-কামিজ বা টপসে সুতি কিংবা কটন-ব্লেন্ড দৈনন্দিন ব্যবহারে দিতে পারে স্বস্তি।
পোশাকের ধরন
কুর্তির ক্ষেত্রে নেক লাইনে করতে পারেন শরতের মোটিফ এর নকশা। পোশাকে নতুনত্ব নিয়ে আসা যেতে পারে মুন শেইপ, ওভাল শেইপ আবার কখনো বা পেছনের অংশের ঝুল রাখা যেতে পারে বেশি। সমান করে নয়, বরং বড় বা ছোট করে প্যাটার্নের চল চলছে এখন। পছন্দমতো বেছে নিতে পারেন হাতা কাটা, ছোট হাতা এমনকি ম্যাগি হাতা কুর্তি-কামিজ। লম্বা কাটের কুর্তি-কামিজের পাশাপাশি চলছে মাঝারি কাটিংয়ের কুর্তি-কামিজ। অফিস কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য কুর্তি ও সালোয়ার-কামিজ বেছে নিতে পারেন। কুর্তির সঙ্গে পরতে পারেন প্যান্ট অথবা পালাজ্জো। জিন্সও মানিয়ে যাবে বেশ। সঙ্গে রাখতে পারেন স্কার্ফ। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে অথবা পোশাকের বিপরীত রঙের স্কার্ফ বেছে নিতে পারেন অনায়াসে।
শাড়ি পরতে চাইলে হালকা রঙের শাড়ির মধ্যে বেছে নিন ফিকে নীল শাড়িতে জরির পাড় দেওয়া, সাদা জমিনে বুটি তোলা জামদানি শাড়ি ও এর সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ। ব্লাউজের হাতা থ্রি কোয়ার্টার হলে ভালো মানাবে। এই আবহাওয়ায় মানাবে নতুন প্যাটার্নের পোশাক। পোশাকের স্লিভে থাকতে পারে বেল স্লিভ। কনুই অব্দি নয়, বরং কনুইয়ের একটু নিচ পর্যন্ত কাটিং রাখতে পারেন ফ্যাশনে। এখন যেহেতু প্লাস সাইজের জনপ্রিয়তা। তাই ক্যাজুয়াল এবং ফরমাল দুই ধরনের লুকেই এমন ধরনের পোশাক বেছে নিতে পারেন।
সবচেয়ে বেশি ভেরিয়েশন রয়েছে টি-শার্টে। স্ক্রিন প্রিন্ট শরতের মোটিফ ক্রেতাদের সহজেই আকৃষ্ট করবে। এ ছাড়া শরতে সিল্ক কিংবা জর্জেট পরার উপযুক্ত সময়। আরামদায়ক হবে লিনেন, ধুপিয়ান, ভয়েল, মসলিন, তাঁতের কাপড়ও। জর্জেট, জয়সিল্ক, সিল্ক কাপড়ের লং কামিজ, গাউন ধাঁচের পোশাক এই সময়ের উৎসবের জন্য ফ্যাশনেবল ও আরামদায়ক। সঙ্গে পোশাকের নকশায় থাকতে পারে শরতের মোটিফ।