হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানির অভিযোগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মদিনা থেকে ঢাকাগামী বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটে উমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি ও ট্যাগযুক্ত লাগেজ সময়মতো সরবরাহ না করার ঘটনায় গ্রাউন্ড সার্ভিসের দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হলেও ঘটনার সময় ব্যাগেজ এরিয়ার কন্ট্রোলার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা আছেন বহাল তবিয়তে।
বিমানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কন্টেইনার অফলোডিং ও পরিচালনাগত গাফিলতির কারণে ব্যাগেজ বেল্টে সময়মতো জমজমের পানি পৌঁছাতে বিলম্ব হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—ঘটনার সময় ব্যাগেজ এরিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা কর্মকর্তার ভূমিকা কেন তদন্তে এলো না।
এ বিষয়ে বিমানের গ্রাহকসেবা পরিচালক বদরুল হাসান লিটন বলেন, প্রাথমিকভাবে যাদের গাফিলতি ছিল বলে প্রতীয়মান হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিষয়টি আরও অধিকতর তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে আরও কারও গাফিলতি বা অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
সূত্রমতে, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে মদিনা থেকে বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটটি ঢাকায় অবতরণ করে। এরপর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেক যাত্রী তাদের ট্যাগযুক্ত লাগেজ পাননি। উমরাহ যাত্রীরা জমজমের পানিও পাননি। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও বিষয়টির সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ তৈরি হয় যাত্রীদের মধ্যে।
এ ঘটনায় ফ্লাইটে থাকা চার সংসদ সদস্য বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। তারা হলেন—মেহেরপুর-১ আসনের মো. রাশেদুল ইসলাম রাসেল, ঢাকা-৫ আসনের মোহাম্মদ কামাল হোসেন, গাজীপুর-৪ আসনের সালাহউদ্দিন এবং খুলনা-২ আসনের জাহাঙ্গীর হুসাইন।
অভিযোগে বলা হয়, ঢাকায় অবতরণের প্রায় তিন ঘণ্টা পরও ৩৫ জন সংসদ সদস্যসহ অধিকাংশ যাত্রী তাদের ট্যাগযুক্ত জমজমের পানি পাননি। দীর্ঘ সময় ধরে কেন পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না, সে বিষয়েও যাত্রীদের যথাযথ তথ্য দেওয়া হয়নি।
চিঠিতে ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে বিমান কর্তৃপক্ষকে চার কর্মদিবস সময় দেওয়া হয়। এর পরপরই গ্রাউন্ড সার্ভিসের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
সূত্র জানায়, ঘটনার সময় দায়িত্বে ছিলেন জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার মো. শাখাওয়াত হোসাইন খান (পি-৩৬৬৬৭), গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার মনিরুজ্জামান প্রধান এবং গ্রাউন্ড সার্ভিস অফিসার সাদ্দাম হোসেন। এর মধ্যে মনিরুজ্জামান প্রধান ও সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনার প্রকৃত দায় নির্ধারণে কেবল মাঠপর্যায়ের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ব্যাগেজ এরিয়া নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানবন্দরে কর্মরত এক কর্মী জানান, নির্বাহী পরিচালক আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। সদ্য জামায়াতে যোগ দেওয়া মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান নির্বাহী পরিচালকের ওপর চড়াও হন। তাকে নানা ধরনের অসম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে থাকেন। তিনি নির্বাহী পরিচালককে অশ্রাব্য ভাষায় বিমানবন্দরের দায়িত্ব থেকে বের করে দেয়ারও হুমকি দেন। এমন অবস্থায় তিনি শান্ত থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে তিনি তাদের বলেন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা বিমান দিয়ে থাকে। পরে সেখানে বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত হলে তাদের সঙ্গেও অসাদচারণ করেন সংসদ সদস্য ও নেতারা। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করে বিমান, জমজমের পানিও দেবে বিমান এমনটা বোঝানোর পর তারা শান্ত হন।
বিমানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিমানবন্দরে প্রায়ই যাত্রী হয়রানির ঘটনা ঘটে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি দায়ী ব্যক্তি বা যাদের গাফিলতির কারণে ঘটনা ঘটে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে হেলপার ও সাধারণ কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এতে সমস্যার মূল জায়গাটি অমীমাংসিত থেকে যায়।
এদিকে এ ঘটনার সঙ্গে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, শাহজালাল বিমানবন্দরে যাত্রী ভোগান্তির অন্যতম কারণ বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা। তার মতে, বিমানবন্দরে একাধিক সংস্থা একসঙ্গে কাজ করলেও কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ট্রলি ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের দায়িত্ব পালনের ঘাটতিও ভোগান্তি বাড়ায়।