আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বা মেরিটাইম খাতে বাংলাদেশি নাবিকদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়াতে দ্রুত ভিসা জটিলতা নিরসনের জোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ মার্চেন্ট শিপিং ফেডারেশন।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে নাবিকদের অধিকার রক্ষা ও সমুদ্র খাতের আয় বাড়াতে সরকারের কাছে ১১-দফা কর্মপরিকল্পনা পেশ করে সংগঠনটি।
সংগঠনটি জানায়, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের প্রধান প্রধান সামুদ্রিক কেন্দ্রে (মেরিটাইম হাব) প্রবেশাধিকার ও ভিসাসংকটের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন বাংলাদেশি নাবিকরা। নির্ধারিত সময় জাহাজে যোগ দেওয়া কিংবা দায়িত্ব শেষে দেশে ফেরার অনুমতি না পাওয়ায় আন্তর্জাতিক জাহাজ মালিক কোম্পানিগুলো বাধ্য হয়ে বাংলাদেশি নাবিকদের বাদ দিয়ে অন্য দেশের নাগরিকদের নিয়োগ দিচ্ছে। ফলে হাতছাড়া হচ্ছে নিশ্চিত কর্মসংস্থান, আর দেশ হারাচ্ছে শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।
চরম ভিসা সংকট ও প্রধান দাবি
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠকালে তুলে ধরা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত (দুবাই), মিশর, সুয়েজ ক্যানেল অঞ্চল, তুরস্ক ও ইউরোপীয় বিভিন্ন বন্দরে বাংলাদেশি নাবিকরা ভিসা জটিলতায় আটকে যাচ্ছেন। এ সংকট কাটাতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর জোর দাবি জানানো হয়।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- দুবাই, মিশর, তুরস্কসহ প্রধান সামুদ্রিক কেন্দ্রগুলোতে বাংলাদেশি নাবিকদের জন্য ‘পৌঁছানোর পর ভিসা’ (অন-অ্যারাইভাল ভিসা) এবং ‘অনুমোদনপত্র’ সুবিধা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি প্রধান কেন্দ্রগুলোতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে বিশেষ ‘নাবিক সহায়তা ডেস্ক’ চালুকরণ ও ‘সমুদ্রবিষয়ক উপদেষ্টা বা কাউন্সিলর’ নিয়োগ দেওয়া এবং দীর্ঘদিন ভেনিজুয়েলার কারাগারে বন্দি থাকা ক্যাপ্টেন মাহবুবকে দ্রুত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা।
‘ফিলিপাইন মডেল’ ও বাংলাদেশের বাস্তবতা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার তথ্য উল্লেখ করে জানানো হয়, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ২৫ লাখ ৬০ হাজার নাবিকের একটি সুবিশাল বাজার রয়েছে, যা থেকে প্রতি বছর ৯০ থেকে ১২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আয় হয়। বর্তমানে বিশ্ববাজারে ৩৯ হাজার নাবিক বা মেরিন অফিসারের তীব্র ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না।
১১ কোটি ৭০ লাখ জনসংখ্যার দেশ ফিলিপাইন প্রতি বছর সাড়ে ৪ লাখ কর্মী পাঠিয়ে ১৬ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয় করছে। বিপরীতে ১৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষের বাংলাদেশে নিবন্ধিত নাবিক ২১-২২ হাজার হলেও আন্তর্জাতিক জাহাজে কাজ করছেন মাত্র ১১ হাজার ৬৪ জন। ফলে দেশ পাচ্ছে মাত্র ৫২ কোটি ডলার (প্রায় ৪,৬০০ থেকে ৫,৮০০ কোটি টাকা)।
উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, একজন সাধারণ প্রবাসী কর্মীর গড় বার্ষিক আয় যেখানে প্রায় ৩ লাখ টাকা, সেখানে একজন বাংলাদেশি নাবিকের গড় বার্ষিক আয় ৪৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র ১ জন নাবিকের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের ১৬ জন সাধারণ প্রবাসী কর্মীর সমপরিমাণ।
১১-দফা কর্মপরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল
জাতীয় অর্থনীতি ও নীল অর্থনীতির (ব্লু-ইকোনমি) বিশাল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ২০২৬ থেকে ২০৩৬ সালের জন্য ১১-দফা ‘নাবিক রপ্তানি কৌশল’ বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে রয়েছে- মিশর, দুবাই, সুয়েজ খাল ও তুরস্কের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বিশেষ সামুদ্রিক ভিসা চুক্তি সম্পাদন, লন্ডনে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থায় (আইএমও) স্থায়ী প্রতিনিধি নিয়োগ, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি নাবিকদের দক্ষতা তুলে ধরতে সেমিনার আয়োজন এবং সামুদ্রিক একাডেমির ক্যাডেটদের জন্য ১২ মাসের সমুদ্র প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
এছাড়া দেশীয় পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বন্দরে ‘নাবিক শ্রম কার্যালয়’ স্থাপন, সরকারি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরাসরি নাবিক সরবরাহের চুক্তি সম্পাদন এবং বিদেশে বিপদে পড়া নাবিকদের সুরক্ষায় প্রবাসে তাৎক্ষণিক আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
আয় বাড়বে ২০ বিলিয়ন ডলার
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মার্চেন্ট শিপিং ফেডারেশনের চেয়ারম্যান চিফ ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ রানা বলেন, আমরা কোনো দেশের অভিবাসন নীতিকে অসম্মান করছি না। সময়মতো ভিসা ও ট্রানজিট সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এবং ফিলিপাইন মডেল অনুসরণ করতে পারলে আগামী এক দশকে এ খাত থেকে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) অতিরিক্ত ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যোগ করা সম্ভব।
তিনি বিষয়টিকে জাতীয় জরুরি ইস্যু হিসেবে গণ্য করে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকরী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।