মুসাব্বির উদ্দিন
শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল
হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ প্রকাশ পায় অনেক আগে থেকেই। এমনও দেখা গিয়েছে, মাসখানেক আগে থেকেই কিছু কিছু উপসর্গ ফুটে উঠেছে। কিন্তু সচেতন না থাকার কারণে অনেক সময় হার্ট অ্যাটাক হয়ে যায়। তরুণদের অনেকেই হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছেন। খুব কম বয়সেও করাতে হচ্ছে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি। হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছে আচমকা, কিছু বুঝে ওঠার আগেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাচ্ছে। অনেকে নাচতে গিয়ে, জিমে শরীরচর্চার সময়ে, এমনকি বসে থাকার সময়েও হঠাৎ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। মূল কারণ হলো বংশগত। খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ জীবনযাপনের পদ্ধতি। স্থূলত্ব, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, তেল-মসলা দেওয়া খাবার খাওয়ার অভ্যাস, অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড খাওয়া। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা এই সব কিছুই হার্টকে দুর্বল করে দেয়।
লক্ষণ
হঠাৎ করে ওজন বৃদ্ধি হতে শুরু করবে। অনেকেই বুঝতে পারেন না, স্থূলত্ব বা ওবেসিটি কিন্তু বিপদ বাড়িয়ে তোলে। ওজন অস্বাভাবিক বাড়তে শুরু করা, সেই সঙ্গে হজমের গোলমাল, ঘন ঘন অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা জানান দেয়, হার্টের অবস্থাও খারাপের দিকেই যাচ্ছে।
শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা যদি ঘন ঘন হতে থাকে, তা হলে সাবধান হতে হবে। অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত হার্টে কম পৌঁছলে শ্বাসের সমস্যা বেশি হয়। ধমনিতে কোনো ব্লকেজ হলেও এমন হতে পারে। হাঁপানি বা সিওপিডি না থাকা সত্ত্বেও যদি শ্বাসকষ্ট মাঝেমধ্যেই হয়, চিকিৎসকের কাছে যেতেই হবে।
মাইগ্রেন বা মাথাব্যথার সমস্যা যদি হঠাৎ হঠাৎ হয়, তা হলেও চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া ভালো। অনেক হার্টের রোগীর এক মাস ধরে মাইগ্রেনের সমস্যা দেখা দেয়, বুকে, কাঁধে ও হাতে ব্যথা শুরু হয়। মনে হতো, বুকে যেন পাথর চেপে বসে আছে। রাতে শোয়ার সময়েও চিনচিনে ব্যথা করত। এগুলোও হৃদ্রোগের পূর্বলক্ষণ হতে পারে।
ঠা-া ঘরে বসেও যদি দরদর করে ঘাম হয়, রক্তচাপের সমস্যার লক্ষণ তো বটেই, হার্টের রোগও বাসা বাঁধছে কি না পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া জরুরি। রাতে শুয়ে যদি দেখেন, সারা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, দেরি করবেন না। হার্টের রোগ হলে ঘুমের সমস্যাও দেখা দেয়। রাতে শুলেই অস্বস্তি হবে, এমনকি অনিদ্রাও দেখা দিতে পারে।
হঠাৎ করেই হাত-পা ফুলে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। আর্থ্রাইটিস বা ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যা নেই, কিন্তু তা-ও দেখছেন হাত-পা ফুলে যাচ্ছে। আসলে কোষে কোষে অতিরিক্ত ফ্লুইড বা তরল জমা হওয়ার কারণে এমন হতে পারে, যা হৃদ্রোগের অন্যতম বড় লক্ষণ।
মাথা ঘোরা, বমি ভাব, আচমকা অজ্ঞান হয়ে গেলে সহজভাবে নিবেন না। গ্যাসের সমস্যার জন্য এমন হচ্ছে। কিন্তু এটা না হয়ে হার্টে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পৌঁছলে প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কেও। এর ফলে রোগীর ঘন ঘন ‘প্যানিক অ্যাটাক’ হয়।
ঠান্ডা না লাগলেও শুকনো কাশি সারবে না। কাশির সঙ্গে মিউকাস উঠে আসবে। সামান্য পরিশ্রম করলেই হাঁপিয়ে পড়বেন এবং কাশি শুরু হবে। এমন লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হবেন এবং ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
কেন যাবেন ডাক্তারের কাছে
ওপরের লক্ষণগুলো দেখা দিলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে গিয়ে ইসিজি করে প্রাথমিক রোগ নির্ণয় করতে হবে। ইসিজিতে এসটি লেভেল বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো রোগীর হার্টের সমস্যা শুরু হয়ে গিয়েছে। হার্টের পেশি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেটা দেখার জন্য বুকে ব্যথা বা অস্বস্তির তিনঘণ্টা পর ট্রপ-টি নামক পরীক্ষা করা হয়। যদি এই পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ আসে তবে নিশ্চিতভাবে রোগীর হার্ট অ্যাটাক শুরু হয়ে গিয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। দ্রুত রোগীকে প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে (অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট ৩২৫ মি.গ্রা, ক্লোপিডোগগ্রেল ৩০০ মি.গ্রা সঙ্গে প্যান্টোপ্রাজল ৪০ মি.গ্রা এবং অ্যাটোরভ্যাস্টাটিন ৮০ মি.গ্রা খাইয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে দিতে হবে। এই পর্যায়ে চিকিৎসা করলে সাময়িক হার্ট অ্যাটাক আটকানো সম্ভব। তাছাড়া ইকো কার্ডিওগ্রাফি করে ওয়াল মোশন অ্যাবনর্ম্যালিটিজ দেখে নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
যা করবেন
হার্ট অ্যাটাকের মতো বড় বিপদকে প্রতিহত করার জন্য কিছু ভালো অভ্যাস রপ্ত করতে পারলে এর কবল থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণে রাখা, প্রতিদিন নিয়ম করে ব্যায়াম ও হাঁটাচলা করা, লিপিড প্রোফাইলে কোনো সমস্যা থাকলে সেটা পরীক্ষা করে নেওয়া ও চিকিৎসা করা, কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের ওষুধ নিয়ম করে খাওয়া উচিত। মেডিটেশন ও মর্নিং ওয়াক এইক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাইরের ফাস্টফুড, তৈলাক্ত খাবার, ধূমপান ও মদ্যপান বাদ দেওয়া। মেয়েদের ক্ষেত্রে ৩৫ বছর বয়সের পর কন্ট্রাসেপটিভ পিল ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। মিউজিক থেরাপি ও স্বাস্থ্যকর স্থানে ভ্রমণ খুবই উপকারী হার্টের জন্য।