রাজধানীতে এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপট। পাড়া-মহল্লার সরু গলি, আবাসিক এলাকার ভেতরের রাস্তা, বাজারের প্রবেশমুখ এমনকি ব্যস্ত প্রধান সড়ক এবং ফ্লাইওভারের উপরেও নির্বিঘ্নে চলছে এসব যান। স্বল্প দূরত্বে কম ভাড়ায় যাতায়াতের সুযোগ থাকায় নগরবাসীর কাছে বাহনটি জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও বিদ্যুৎ সংকটের মুহূর্তে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে এটি। দৈনিক ১০ থেকে ১২ লাখ অটোরিকশায় গিলে খাচ্ছে বিদ্যুৎ। এদিকে গ্যারেজকেন্দ্রিক মাদক সিন্ডিকেটও চোখ রাঙাচ্ছে।
অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার এখন ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, নিরাপত্তা ও নাগরিকজীবনে নতুন চাপ তৈরি করেছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হচ্ছে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক অননুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট। কোথাও আবাসিক মিটারের বিদ্যুৎ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে, কোথাও সরাসরি বিদ্যুৎ লাইনে হুক লাগিয়ে চার্জ দেওয়া হচ্ছে।
রাজধানীর মুগদা, মান্ডা ও তেজগাঁও এলাকার কয়েকটি গ্যারেজ ঘুরে এবং খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, প্রায় প্রতিটি রিকশা গ্যারেজে আবাসিক মিটারের পাশাপাশি ইলেকট্রিক ভেহিকেল ও ব্যাটারি চার্জিং স্টেশন মিটারের সংযোগ রয়েছে। তবে গ্যারেজ মালিকরা আবাসিক মিটারে বেশি অটোরিকশা চার্জ দেন। চার্জিং মিটারে চার্জ দেন না। এর মাধ্যমে তারা বিদ্যুৎ চুরির পাশাপাশি সরকারি অর্থ লোপাট করছেন।
মান্ডা এলাকার গ্যারেজ মালিক আবুল কালাম বলেন, বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধির আগে তার গ্যারেজে ৩০-৩৫টি রিকশা চার্জ হতো। ওই সময় মাসে বিল আসত ২০-২২ হাজার টাকা। আর বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধির পর ২০টি রিকশায় চার্জ দিতে মাসে খরচ হয় ২৫-২৭ হাজার টাকা। তবে তিনি মিটার চালান এ বিষয়ে কিছু বলতে চাননি। লালবাগ এলাকার রিকশা গ্যারেজ মালিক দেলোয়ার বলেন, গণঅভ্যুত্থানের আগে ১৬৫টি রিকশায় চার্জিং খরচ আসত ২ লাখ টাকা। আর এখন ৭০টির বিদ্যুৎবিল আসে ৮০ হাজার টাকা।
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব বলছে, একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জ করতে দৈনিক ৮-১২ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। যার মূল্য ৯০.৮৮-১৩৬.৩২ টাকা। এ হিসাব অনুযায়ী, একটি রিকশা চার্জে যদি ৮ ইউনিট বিদ্যুৎও খরচ হয়, তবে ১২ লাখ রিকশায় প্রতিদিন ৯৬ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, যার মূল্য ৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
এদিকে গেল সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, রাজধানীতে প্রায় ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং স্টেশন চলছে। বিপরীতে সারা দেশে বৈধ চার্জিং স্টেশন রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও অনুরূপ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করছে। অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিকভাবে চার্জ দেওয়ার কারণে সরকারের বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলেও তিনি সংসদে জানান।
ঢাকা মহানগর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক সমিতির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকায় অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট কয়েকগুণ বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা অবৈধ এবং গ্যারেজ খুলে চার্জিং পয়েন্ট বসিয়েছে। এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর রাস্তায় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ নতুন করে রিকশা নামিয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন প্রকৃত গ্যারেজ মালিকরা।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মাসখানেক ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে শতাধিক অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এসব গ্যারেজে যাতে নতুন করে সংযোগ না দেওয়া হয়, সে জন্যও কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। পুলিশ সূত্র জানায়, গ্যারেজকেন্দ্রিক মাদকের একটা ঝামেলা আগে থেকেই আছে। শুধু রিকশা গ্যারেজ নয়, সব ধরনের গ্যারেজ ঘিরেই মাদক কেনাবেচা ও সেবনের একটা আখড়া থাকে। ডিএমপির ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তা বলেন, গ্যারেজকেন্দ্রিক মাদক মামলা বেশি হয়। এ ছাড়া চুরি-ছিনতাইও বেশি হচ্ছে। এসব এলাকায় ভ্রাম্যমাণ অপরাধীদের আনাগোনা সাধারণত বেশি থাকে। কেউ অপরাধ করে এসে গ্যারেজগুলোতে অবস্থান নিতে পারে সহজে।
রাজধানীতে ঠিক কতটি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে তার নির্ভুল, হালনাগাদ সরকারি পরিসংখ্যা নেই। তবে বিআরটিএর হিসাব উদ্ধৃত করে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশে ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে এবং এর মধ্যে ঢাকায় চলছে আনুমানিক ১০ থেকে ১২ লাখ। বিভিন্ন উৎসে সংখ্যার পার্থক্য থাকলেও এই বিপুল যানবাহনের বড় অংশই নিবন্ধন, রুট ও চার্জিং ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে কোন এলাকায় কতটি রিকশা চলছে, তার নির্ভরযোগ্য এলাকাভিত্তিক সরকারি ডাটাবেজও এখনো তৈরি হয়নি।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কয়েক মাস ধরে নিয়মিতভাবে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্যারেজগুলোতে অভিযান চালানো হচ্ছে। এতে সাধারণত অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, আবাসিক লাইনে বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং লাইন থেকে বিদ্যুৎ চুরির বিষয়গুলো দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এসব অভিযোগে শতাধিক গ্যারেজের বিদ্যুৎলাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। সড়কে রিকশা নিয়ন্ত্রণেও একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এর পাশাপাশি মাদকের বিষয়টিও নজরদারিতে নিয়ে আসা হচ্ছে। ডিএমপির ক্রাইম বিভাগ মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
গ্যারেজের আড়ালে চার্জিং ব্যবসা : সম্প্রতি তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন অবৈধ চার্জিংয়ের দেখা মিলেছে। তেজগাঁওয়ে বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে সরাসরি সংযোগ নিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ঘটনা ধরা পড়ে। মোহাম্মদপুরের একটি আবাসিক এলাকায় টিনশেড গ্যারেজে প্রায় ৩০টি রিকশা আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে চার্জ দেওয়ার ঘটনা পাওয়া যায়। মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বালুরমাঠ এলাকায় সেপ্টেম্বর মাসে ছয়টি গ্যারেজে যৌথ অভিযান চালান পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, র্যাব ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে চারটি গ্যারেজে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, ঢাকা উদ্যান, বসিলা, বেড়িবাঁধ, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, মিরপুর, পল্লবী, উত্তরা, বাড্ডা, নতুনবাজার, আফতাবনগর, মুগদা, মান্ডা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় অটোরিকশার গ্যারেজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সম্প্রতি ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে ধানমন্ডি-২৭ থেকে আসাদগেট পর্যন্ত মিরপুর রোডে সাম্প্রতিক এক অভিযানে শতাধিক অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা জব্দ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও ডিএমপি।
বিদ্যুৎব্যবস্থায় বাড়তি চাপ : শুধু বিদ্যুৎ চুরিই নয়, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জ দেওয়ায় স্থানীয় বিতরণব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, বিপুলসংখ্যক রিকশার একসঙ্গে চার্জিংয়ের ফলে ট্রান্সফরমার ও বিতরণ লাইনে অতিরিক্ত লোড পড়ছে এবং রাতের দিকে বিদ্যুতের চাহিদাও প্রত্যাশিত হারে কমছে না। বিদ্যুৎ খাতের এই চাপের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে রাজস্ব ক্ষতি। অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার হলে একদিকে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান রাজস্ব হারায়, অন্যদিকে বৈধ গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত অবকাঠামোর ওপর অনিয়ন্ত্রিত চাপ তৈরি হয়।
গ্যারেজেই তৈরি হচ্ছে আরেক ঝুঁকি : ব্যাটারি চার্জের পাশাপাশি গ্যারেজগুলোতে নিরাপত্তার বিষয়টিও উদ্বেগের। অনেক গ্যারেজ আবাসিক ভবন, দোকানঘর, টিনশেড বা সরু গলির মধ্যে। একসঙ্গে বহু ব্যাটারি চার্জ দেওয়ায় শর্টসার্কিট বা অগ্নিকা-ের ঝুঁকি রয়েছে। আবার ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ সংরক্ষণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সরকারও ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ও অনিরাপদ রিসাইক্লিংকে পরিবেশগত ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
অভিযান হচ্ছে, কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না : অবৈধ গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্টের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ ও বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলো। কিন্তু অভিযানের পর কিছু দিনের মধ্যে একই এলাকায় আবার সংযোগ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
নিয়ন্ত্রণে আট জোনের পরিকল্পনা : সরকার ইতিমধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় রাজধানীকে আটটি জোনে ভাগ করে নির্দিষ্টসংখ্যক রিকশাকে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি জোনের রিকশার জন্য আলাদা রঙ, ডিজিটাল নম্বরপ্লেট ও কিউআর কোড রাখার প্রস্তাব রয়েছে। কিউআর কোড স্ক্যান করে মালিক ও চালকের তথ্য জানা যাবে। সরকারের খসড়া নীতিতে নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স, নির্ধারিত রুট, অনুমোদিত নকশা, নিরাপদ যন্ত্রাংশ ও বৈধ চার্জিং স্টেশনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার একটি নীতিমালা করুক। আমরা তার মধ্যে থেকেই গাড়ি চালাব। ঢাকা শহরে যানজটের প্রধান কারণ হচ্ছে ১৩টি পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত ৩-৪ লাখ অটোরিকশা ঢাকা সিটিতে প্রবেশ করে। এই গাড়িগুলো সারা দিন চলে সন্ধ্যায় আবার ফিরে যায়। এতে সিটির রিকশা বসে থাকছে এক রকম।’
তিনি বলেন, ‘আমার ৭০টি অটোরিকশা আছে। সরকার নীতিমালা করে দিয়ে বলুক আমি কয়টা রিকশা চালাতে পারব। সেটাই চালাব। গণঅভ্যুত্থানের আগে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ রিকশা ছিল ঢাকা সিটিতে। এখন সেটা দাঁড়িয়েছে ১০-১২ লাখে। পুলিশ, সাংবাদিক ও ডাক্তারসহ সবাই ২-১০টি করে রিকশা কিনে রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছে। এখন এটা আপনি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন। সরকারের কাছে মালিক সমিতির পক্ষ থেকে দীর্ঘ দিনের দাবি ছিল নতুন রিকশা উৎপাদন বন্ধ করা হোক। তাহলে এটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।’