বিনিয়োগকারী কেন আস্থাহীনতায়

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৫ এএম

বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা ও সুরক্ষা বাড়াতে ‘বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬’ আজ রবিবার থেকে উদযাপন করছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এবারের প্রতিপাদ্য ‘বিনিয়োগকারীর স্থিতিস্থাপকতা, ডিজিটাল প্রতারণা ও প্রতারণা সতর্কতা’। এর আগের সরকারগুলোও ডাক-ঢোল পিটিয়ে দিবসটি পালন করেছে। দেশ-বিদেশে সভা-সেমিনারও করেছে। তারপরও বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট রয়েই গেছে। পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মত ছিল, রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে ওঠা ও নির্বাচিত সরকার। কিন্তু নির্বাচিত সরকার আসার পরও বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা কাটেনি।

সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিনিয়োগের জটিলতাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতি সংশোধন করা হয়েছে। ফলে আগামীতে পুঁজিবাজারসহ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হবে নিরাপদ ও টেকসই।

সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বাজারের মূল্যসূচক একটি স্থানে আটকে আছে। মূলধন ঘাটতি বা আর্থিক পরিস্থিতি ভালো না থাকায় তালিকাভুক্ত কোম্পানি শেয়ার হোল্ডারদের (সাধারণ বিনিয়োগকারী) কাক্সিক্ষত মুনাফা দিতে পারছে না। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে লোকসানেও শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। পোর্টফোলিও ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকায় নতুন করে পুঁজি খাটাতে ভয় পাচ্ছেন তারা। পাশাপাশি এক যুগেরও বেশি সময়ে পুঁজিবাজারে ভালো ও মানসম্পন্ন আইপিও না থাকায় নতুন করে বিনিয়োগকারীরা বাজারে আসছেন না। তাই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের চেয়ে স্বল্পমেয়াদি ফাটকা বা নন-পারফর্মিং শেয়ারের দিকে ঝুঁকছেন, যা তাদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জানা গেছে, ২০০৯ সালের শুরুতে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বধীন জোট সরকার। পরের বছর ২০১০ সালে দেশের শেয়ারবাজারে মহা ধস নামে। লাখ লাখ বিনিয়োগকারী রাতারাতি পুঁজি হারান। এ নিয়ে অনেক মামলা ও তদন্ত হয়। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি। অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ২০১১ সালে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আসেন ড. এম খায়রুল হোসেন। তার ৯ বছরের দায়িত্বকালে বহু কোম্পাানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও বেশিরভাগেই ছিল নামসর্বস্ব। এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে দফায় দফায় প্রতারিত হয়েছেন বিনিয়োগকারীরা, যা খায়রুল হক পরবর্তী শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম কমিশনের সময়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পটপরিবর্তনের পর কমিশনের দায়িত্বে আসেন খন্দকার রাশেদ মাকসুদ। বেশ কিছু কারসাজি ও অনিয়ম চিহ্নিত করে তার কমিশন। এছাড়া পুঁজিবাজার সংস্কারে অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, যা মাসুদ খানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন কিছু কিছু ক্ষেত্রে অধিকতর সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে। কমিশনে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারীর দপ্তর।

প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) তানভীর শাহরিয়ার গনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১০ থেকে ১২ বছর পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি বা আইপিও আসেনি। এটি আস্থার সংকটের অন্যতম কারণ। আরেকটি হলো তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা সমাধান না করা। ফলে বাজার পরিস্থিতি একটি নিদিষ্ট চক্রে আটকা পড়ে গেছে। আমরা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি এবং সমাধানের চেষ্টা করছি। আশা করছি, চলতি বছর তিন থেকে চারটি কোম্পানি শেয়ারবাজারে যুক্ত হবে। এজন্য ভালো ও মানসম্মত কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়াতে খুব শিগগিরই সরাসরি তালিকাভুক্তি ব্যবস্থা চালু হবে। এজন্য বিএসইসি নীতিমালা তৈরি হয়েছে। বর্তমান কমিশনের এই চার মাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনেকগুলো কাজ হাতে নিয়েছে, ভালো অগ্রগতিও হয়েছে। আগামী বছর এসব উদ্যোগের প্রতিফলন দেখা যাবে। বিশেষ করে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।’

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট দীর্ঘদিনের। অনাস্থা দূরীকরণ প্রসঙ্গে তানভীর গনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বিশ্বের কোনো দেশে শেয়ারবাজারে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়ার সুযোগ নেই। সে জন্য উন্নত দেশের পুঁজিবাজারে ঝুঁকির পরিমাণ কম, আমাদের এখানে বেশি। তাই বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে হবে, পাশাপাশি বিনিয়োগ সচেতন হতে হবে এবং বিনিয়োগের আগে সঠিক তথ্য যাচাই কর উচিত। আপনি কোথায় বিনিয়োগ করছেন, সেটি না জানলে ক্ষতিগ্রস্ত হলে কাকে দোষ দেবেন? পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেই, অনেকে লাভবান হতে চাচ্ছেন এবং প্রতিদিন ট্রেডিং করতে হচ্ছে। এতে সুবিধাভোগীরা বাজারে কারসাজির সুযোগ পাচ্ছেন। তবে কারসাজি ঠেকাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় তদারকিতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো হচ্ছে। ফলে সামনের দিনে কারসাজি করে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শেয়ারধারী পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিনিয়োগকারীরা সব সময় প্রতারিত হয়ে আসছেন এবং হচ্ছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার কথা বললেও তারা ব্যর্থ হচ্ছে। এর দুটি মূল কারণ প্রথমত, ভালো আইপিও দিতে না পারা এবং বিগত সময়ে আইপিওর নামে নামসর্বস্ব কোম্পানি তালিকাভুক্ত করে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করা। দ্বিতীয়ত, সরকারের আইন, বিধান ও নীতি ঠিক না থাকা। এক বছর কোনো সুবিধা দেওয়া হলে, পরের বছর তা বাতিল করা হয়। এতে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।

এ ছাড়া ব্রোকারেজ হাউজগুলো বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করে থাকে। তাদের না জানিয়ে অনেক ক্ষেত্রে শেয়ার বিক্রির খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি চিহ্নিত হওয়ার পর প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজের কারসাজি চিহ্নিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট হাউজের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। এটি ইতিবাচক হলেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। আরেকটি হলো মার্চেন্ট ব্যাংকের ঋণের ফাঁদে অনেক বিনিয়োগকারী প্রতারিত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার কথা বলা হলেও সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে না, যা শেয়ারবাজারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। আছে ডিজিটাল প্রতারণা। বড় বড় বিনিয়োগকারীরা সামাজিক মাধ্যমে ফলোয়ার তৈরি করে তাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন, কোন শেয়ার কিনতে হবে, কোন শেয়ার বিক্রি করতে হবে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রতারিত হচ্ছেন। ডিএসই, সিএসই ও বিএসইসির উদাসীনতার কারণে এমনটি হচ্ছে।

বিনিয়োগকারীরা কেন এখনো আস্থাহীনতায়? এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার অন্যতম কারণ হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা। সংকটটি এখন কেটেছে। দেশে গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে। তবে- আরেকটি কারণ হলো গ্যাস, বিদ্যুতের সংকট। শিল্প কলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর দ্রুত সমাধান করতে হবে। এছাড়া বিগত সময়ে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত নীতি সহায়তা পাননি এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতারিতও হয়েছেন। আর প্রতিকারে আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার মধ্যে পড়েছেন। ফলে বর্তমান সরকারের প্রধান কাজ হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় যথাযথ নীতি সহায়তা বজায় রাখা। বছর বছর নীতির পরিবর্তন না করা এবং ব্যবসার উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় কমিয়ে আনা। এ বিষয়গুলোও সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাজারে প্রভাব ফেলেছে।

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রসঙ্গে অর্থনীতির এ বিশ্লেষক বলেন, বিগত সময়ে দেশের শেয়ারবাজারে নানান কেলেঙ্কারি হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা বারবার প্রতারিত হয়েছেন। তবে শেয়ারবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের এখনো আগ্রহ রয়েছে। এখানে সংকট শুধু আস্থার। ফলে বাজারকে প্রাণবন্ত করতে হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা দিতে হবে। তাদের সুরক্ষায় কার্যকর আইন ও প্রয়োগ থাকতে হবে। প্রতারণা ঠেকাতে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যতটুকু জেনেছি, বর্তমান কমিশন সে উদ্যোগ নিয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের কোনো দেশে ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতর গুরুত্ব নেই। আমাদের এখানে সেটি বিদ্যমান। পুঁজিবাজার হলো অর্থ সংগ্রহের জায়গা। সেখানে কোনো কোম্পানি আসছে না। তারা ব্যাংকে চলে যাচ্ছে। এর মানে পুঁজিবাজারে এমন কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, যে জন্য উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন। বিষয়গুলো চিহ্নিত করে কমিশন কাজ করছে। এর অগ্রগতিও ভালো বলে জেনেছি। কাজটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর সঙ্গে বিনিয়োগকারীরাও আস্থা ফিরে পাবেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত