একাডেমিক ও প্রশাসনিক গতিশীলতা প্রধান চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১২ এএম

দেশের অন্যতম শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি)। শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, একাডেমিক ও প্রশাসনিক গতিশীলতাসহ নানা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা এতে রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে ‘দেশ রূপান্তর’-এর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১তম উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান।

উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসে মূল অগ্রাধিকার কীভাবে বাস্তবায়ন করছেন? এ প্রশ্নের জবাবে চবি উপাচার্য জানান, একাডেমিক গতিশীলতা বৃদ্ধি করা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে ফিরিয়ে আনা এবং গবেষণামুখী করা ছিল তার প্রধান অগ্রাধিকার। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য চবিকে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে নেওয়া।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের আউটকাম বেসড এডুকেশন (ওবিই) কারিকুলামের প্রধান চ্যালেঞ্জ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দেশে সর্বপ্রথম চবিতে শতভাগ ওবিই কারিকুলাম চালু হয়েছে। তবে এটি নতুন ও আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি হওয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়কেই প্রচুর শ্রম দিতে হচ্ছে। এই পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা চ্যালেঞ্জিং ছিল। প্রায় ৪০০ জন শিক্ষককে প্রশ্ন প্রণয়নের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ১৫ জন শিক্ষককে ‘মাস্টার ট্রেইনার’ হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। ক্লাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনুপাত আরেকটি চ্যালেঞ্জ।’

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করতে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে উপাচার্য বলেন, ‘ওবিই কারিকুলাম গবেষণানির্ভর। এতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি গবেষণায় যুক্ত হচ্ছে। মাস্টার্সে থিসিস নিলে ১৫ হাজার টাকা করে টানা ৬ মাস, এমফিলের জন্য মাসে ২০ হাজার টাকা করে ৩ বছর এবং পিএইচডির জন্য মাসে ৪০ হাজার টাকা করে ৩ বছর বৃত্তি পাবে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের জন্য ভাইস চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড ও ডিনস অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হবে। এমফিল ও পিএইচডির সুপারভাইজাররা মাসিক সম্মানী পাবেন। শিক্ষকদের গবেষণায় ৩০ লাখ টাকার প্রাথমিক বাজেটের সীমা উন্মুক্ত থাকবে। শিক্ষকদের পদোন্নতির নীতিমালায় পরিবর্তন করা হবে। শিক্ষকদের পদোন্নতি লাভে নামমাত্র গবেষণা বন্ধ করে বাস্তবধর্মী গবেষণা করতে হবে।’

শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরে প্রশাসনের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বর্তমান কর্মক্ষেত্রের চাহিদা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে একটি বড় ফারাক রয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে ‘ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কলাবোরেশন সেল’ গঠন করা হয়েছে, এতে ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিরা সরাসরি শিক্ষার্থীদের পাঠদান করবেন। সব অনুষদে বিশেষ এআই কোর্স চালু করা হবে। প্রতিটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা যেন ইন্ডাস্ট্রিতে সরাসরি ইন্টার্নের সুযোগ পায় আমরা তা নিশ্চিত করব।’

শিক্ষার্থীদের পরিবহন ও আবাসন সংকট নিরসনের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘আবাসন সংকট নিরসনসহ বিভিন্ন উন্নয়নে ৭০০ কোটি টাকার একটি ডিপিপি অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। বিভিন্ন অব্যবহৃত ভবন নতুনভাবে আবাসনের আওতায় আনা হবে। ক্যাম্পাসে ১৫টি বাস চালু হবে। শাটল ট্রেনের ট্রিপ সংখ্যা বাড়াতে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। শিগগিরই রেললাইন সংস্কারের কাজ শুরু হবে।’

দীর্ঘ দুই যুগেও চবিতে কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ার প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে মানসম্মত শিক্ষা এবং আবাসন প্রধান শর্ত। গবেষণার অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন। গবেষণাবান্ধব ক্যাম্পাস তৈরি হলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা চবির প্রতি আগ্রহী হবে। বিদেশে থাকা গবেষক ও শিক্ষকদের মাধ্যমে পাঠদান, কারিকুলাম তৈরি ও যৌথ গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কনফুসিয়াস সেন্টার চালুর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা চীনা ভাষা শিখতে পারবে। চীনা শিক্ষার্থীরা চবিতে বাংলা ভাষা শিখতে আসবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গভাবে অটোমেশনের আওতায় আনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চারটি অনুষদে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ অটোমেশন কার্যক্রম শুরু হবে। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফলসহ সব একাডেমিক কার্যক্রম সফটওয়্যারের মাধ্যমে অনলাইনে হবে। ধাপে ধাপে অন্যান্য অনুষদকেও এর আওতায় আনা হবে, যাতে ফলাফল প্রকাশে আর কোনো বিলম্ব না হয়। এক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কর্মস্পৃহা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি করা। সবার একাডেমিক ও প্রশাসনিক গতিশীলতা বাড়াতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

চাকসু নির্বাচনসহ বিভিন্ন সংবিধিবদ্ধ পর্ষদের নির্বাচন কখন হবে? এ প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘চাকসু এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সবচেয়ে বড় সহযোগী। অনুকূল পরিবেশ বিবেচনায় রেখে চাকসু নির্বাচন হবে। তখন সিনেটে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি নির্বাচনও হবে। আগামী সিনেট অধিবেশনে শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা থাকতে পারবে। সিনেট, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল ও রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটস নির্বাচনসহ বিভিন্ন পর্ষদের নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমিতির নির্বাচনও যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে।’

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় একটি গণতান্ত্রিক স্থান। এখানে সবাই মতপ্রকাশ ও গণতন্ত্র চর্চা করবে। সব ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন সহাবস্থান ও সম্প্রীতি বজায় রাখবে। ক্যাম্পাসে সুস্থ রাজনৈতিক সহাবস্থান ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকে এবং শিক্ষার্থীরা যেন শিক্ষা ও গবেষণামুখী হয়, এটাই প্রত্যাশা।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত