বিলুপ্তির পথে সিসালগাছ

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪১ এএম

দেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সোনালি সিসাল। এককালে দড়ি বা রশি তৈরির একমাত্র প্রধান উপকরণ ছিল সিসালগাছ। এই গাছের পাতার তন্তু বা আঁশ থেকে তৈরি হতো মজবুত সব রশি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো সিলেটের শ্রীমঙ্গলের রাজঘাট ইউনিয়নে এই গাছের ব্যাপক বাণিজ্যিক চাষ হতো। শহর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা এই পাহাড়ি এলাকায় দেশের সবচেয়ে বড় সিসাল বাগানটি ছিল বলে জায়গাটির নামই হয়ে যায় ‘সিসালবাড়ি’ পাহাড়।

পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ কোম্পানি জেমস ফিনলে সিসাল চাষ বন্ধ করে সেখানে চা বাগান গড়ে তোলে। কালের বিবর্তনে সরকারি খাতায় সিসাল বাড়ির নাম বদলে আজ তা ‘শিশিরবাড়ি চা বাগান’ নামে পরিচিত হলেও, স্থানীয় চা শ্রমিকদের মুখে এখনো এটি ‘সিসালবাড়ি’ হিসেবেই বেঁচে আছে। আজ সিসালের সেই সোনালি অতীত হারিয়ে গেছে; গাছটি এখন কেবলই শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ হিসেবে কিছু বাড়ির আঙিনায় টিকে আছে।

‘সিসাল’-এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘আগাভে সিসালেনা’, সিসাল আগাভে প্রজাতির গাছ। সিসাল থেকে তন্তু পাওয়া যায়, যা নানা পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এটা কখনো কখনো ‘সিসলশণ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। শণফাইবার এর একটি প্রধান উৎস ছিল এবং অন্যান্য ফাইবার নামকরণ করা হয়। সিসাল ফাইবার ঐতিহ্যগতভাবে দড়ি, কু-লী, কাগজ, কাপড়, প্রাচীর পাতার কার্পেট তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশরা এদেশে চায়ের আবাদ শুরু করলেও ১৯৫০ সালের পূর্ব পর্যন্ত শিশিরবাড়ি এলাকায় অব্যাহত ছিল সিসাল গাছের আবাদ। এদেশের রশি তৈরির প্রধান উপাদান সিসালের সবচেয়ে বৃহৎ বাণিজ্যিক চাষাবাদ হতো এখানে। ‘সিসাল’ গাছের পাতা থেকে তৈরি তন্তু দিয়ে দেশের তৈরি রশির অধিকাংশ চাহিদা মেটাতো ‘সিসালবাড়ি’ এলাকায় চাষকৃত সিসাল গাছ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পাট দিয়ে রশি তৈরিসহ রশি তৈরির বিভিন্ন উপাদান সহজলভ্য হওয়ায় এবং চা আবাদ অধিক লাভজনক হওয়ার কারণে ব্রিটিশ চা কোম্পানি জেমস ফিনলে ‘সিসালবাড়ি’-তে সিসাল চাষ বন্ধ করে ধীরে ধীরে চায়ের আবাদ শুরু করে। এক সময় জেমস ফিনলে চা কোম্পানি ‘সিসালবাড়ি’-তে সিসালের চাষাবাদ পুরোপুরি বন্ধ করে পুরো ‘সিসালবাড়ি’ এলাকা চা চাষের আওতায় নিয়ে আসে।

প্রবীণ গণমাধ্যমকর্মী সৈয়দ নেসার আহমদের স্মৃতিচারণে উঠে এলো এক হারিয়ে যাওয়া সোনালি অধ্যায়ের কথা। তিনি জানান, শুধু সিসালবাড়ি পাহাড়ই নয়, একসময় শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার ও সিলেটের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে চাষ হতো সিসালগাছের। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই দিন আজ অতীত। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এখন আর সিসালবাড়ি বা শিশিরবাড়ি চা বাগানসহ মৌলভীবাজার জেলা কিংবা শ্রীমঙ্গল উপজেলার কোথাও এই গাছের কোনো অস্তিত্ব নেই। এমনকি শিশিরবাড়ি চা বাগানের মূল প্লান্টেশন এলাকা কিংবা এর আশপাশের এলাকা থেকেও সিসালগাছ সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। তবে শ্রীমঙ্গলের ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়নের সাইটুলা গ্রামের সড়ক ঘেঁষে, জেমস ফিনলে চা কোম্পানির কালিঘাট চা বাগানে এখনো কয়েকটি সিসালগাছ সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এ গাছগুলো এক সময়ের রশি তৈরির প্রধান ও একমাত্র উপকরণ সিসালের স্বর্ণযুগের সাক্ষ্য বহন করছে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত