শেষ হলো এশিয়ান গেমসের ২০তম আসর। এবারের এশিয়ান গেমসে পদকের লড়াইয়ে বিশেষ কোনো চমক নেই। এশিয়ান গেমসে যে দলগুলো সব সময়ই বেশি পদক জেতে, এবারও তারাই।
চীন জিতেছে ১৬৯টি স্বর্ণসহ ৩৪১টি পদক। এশিয়ান গেমসের সর্বকালের পদক তালিকায়ও তারাই শীর্ষে ১,৮৪৩ সোনাসহ ৩,৯১১ পদক জিতে।
জাপান এবার ৮৩ সোনা জিতে দ্বিতীয়, সর্বকালের তালিকায় তারা দ্বিতীয় ১,১৬৭ সোনা জিতে। আর ৮২৬ নিয়ে সর্বকালের তৃতীয় স্থানে থাকা দক্ষিণ কোরিয়া এবারের আসরে জিতেছে তৃতীয় সর্বোচ্চ ৩৯ সোনা।
ভারত ২১টি স্বর্ণসহ ৮৬ পদক জিতে হয়েছে চতুর্থ।
এবারের গেমসে অংশ নিয়েছে মোট ৪৫টি দেশ, সঙ্গে একটি শরণার্থী দল। এর মধ্যে পদক জিতেছে মোট ৪০টি দেশ। এরমধ্যে একটি ব্রোঞ্জ জয়ী বাংলাদেশের অবস্থান ৩৭তম। অবশ্য এই অবস্থানে আরো তিনটি দেশ আছে।
সাংগঠনিক অব্যবস্থাপনা আর বিতর্কে মলিন এশিয়ান গেমস, জাপানের ভবিষ্যৎ আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন
জাপান ঐতিহ্যগতভাবে প্রধান আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টগুলোর এক বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য আয়োজক হিসেবে পরিচিত হলেও, আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস সেই ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের দাগ ফেলেছে। নজিরবিহীন সাংগঠনিক জটিলতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ মেগা ইভেন্টগুলোর আয়োজনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এবারের এশিয়ান গেমসে ভুলের ছড়াছড়ি ছিল চোখে পড়ার মতো। ক্রীড়াবিদদের ভুল ভেন্যুতে বাস করে পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে, দক্ষিণ কোরিয়ার হকি ম্যাচের সময় ভুলবশত উত্তর কোরিয়ার জাতীয় সংগীত বাজানোর মতো বিব্রতকর ঘটনাও ঘটেছে।
এছাড়া অলিম্পিক গেমসের চেয়েও বেশি—অর্থাৎ ১৭,০০০-এর অধিক ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তার জন্য পর্যাপ্ত বিছানার ব্যবস্থা না থাকায় চরম বিপাকে পড়েন অংশগ্রহণকারীরা। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল অভিযোগ করেছে, বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাদের একটানা ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত আটকে থাকতে হয়েছে। স্থানীয় আয়োজকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেনি দলগুলো। কোরিয়ান স্পোর্ট অ্যান্ড অলিম্পিক কমিটির সভাপতি রিও সিউং-মিন কড়া ভাষায় বলেন, "যদি আমাকে তাদের কাজের কোনো গ্রেড দিতে হয়, তবে তা হবে এফ।"
বিতর্কের মাঝেও সাফল্য দাবি ওসিএ-র
লজিস্টিক ও ব্যবস্থাপনার এমন বেহাল দশা সত্ত্বেও অলিম্পিক কাউন্সিল অফ এশিয়া (ওসিএ) দাবি করেছে গেমসটি সফল ছিল। রোববার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, রাজস্ব প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি, শক্তিশালী দর্শক উপস্থিতি এবং একঝাঁক বিশ্ব রেকর্ড প্রমাণ করে যে আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস সফল হয়েছে।
পদক তালিকার শীর্ষে থাকা চীন ৩৪১টি পদকের মধ্যে ১৬৯টি স্বর্ণ জিতে বিদেশের মাটিতে তাদের ইতিহাসের সেরা সাফল্য অর্জন করেছে। অন্যদিকে, ঘরের মাঠে হতাশ করেনি স্বাগতিক জাপানও। ১৯৯৪ সালের হিরোশিমা গেমসের পূর্ববর্তী রেকর্ড ভেঙে তারা মোট ২৬৯টি পদকের মধ্যে ৮৩টি স্বর্ণপদক নিজেদের করে নেয়।
ভবিষ্যৎ অলিম্পিক আয়োজন নিয়ে সংশয়
স্পোর্টস সাইকোলজির বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক হিরোকাজু আরাই এএফপিকে জানিয়েছেন, এই এশিয়ান গেমসের ছায়া থেকে জাপানকে দীর্ঘ সময় ধরে লড়তে হবে। তার মতে, "জাপান যদি আবার অলিম্পিক আয়োজনের জন্য বিড করে, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের ওপর আস্থা কমে যেতে পারে এবং জয়ী হওয়া কঠিন হবে। এছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই ধারণার জন্ম হতে পারে যে, এমন বিশৃঙ্খলা ঘটলে আমাদের অলিম্পিকের প্রয়োজন নেই।"
উল্লেখ্য, টোকিও অলিম্পিকের দুর্নীতির কলঙ্ক এবং মহামারীর কারণে এক বছর পিছিয়ে ২০২১ সালে দর্শকশূন্য মাঠে আয়োজনের দুঃস্মৃতি এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি। ঠিক এমন সময়ে এশিয়ান গেমসের এই অব্যবস্থাপনা জনগণের মাঝে পুরোনো ক্ষোভ নতুন করে উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর আগে জনগণের সমর্থনের অভাবে উত্তরাঞ্চলীয় শহর সাপ্পোরোতে শীতকালীন অলিম্পিক আয়োজনের পরিকল্পনাও বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল জাপান।
আয়োজকদের প্রতিক্রিয়া ও আত্মপক্ষ সমর্থন
জাপান অলিম্পিক কমিটির (জেওসি) সভাপতি এবং টোকিও অলিম্পিক আয়োজক কমিটির সাবেক প্রধান সেইকো হাশিমতো স্বীকার করেছেন যে গেমসে অনেক সমস্যা ছিল। তবে তিনি আশাবাদী যে, সাপ্পোরোর বিড ভবিষ্যতে আবার পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব এবং দেশটি ভবিষ্যতেও বড় বড় আন্তর্জাতিক ইভেন্ট আয়োজন করতে চায়।
তিনি বলেন, "আমাদের মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলোর কারণে আমরা তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছি—এ বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ সচেতন। এটি গেমসেরই একটি অংশ, তবে আগামী দিনের সুযোগগুলোকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের এই সমস্যাগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।"
তথ্যসূত্র: এএফপি