ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) স্থগিতের দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ তৃতীয় দিনে গড়িয়েছে। খবর দ্য হিন্দুর।
রবিবার (৪ অক্টোবর) নয়াদিল্লি ও মুম্বাইয়ে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। এদিন দিল্লিতে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের পর প্রায় ৫০০ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন উপলক্ষে ২ অক্টোবর থেকে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। এতে বিরোধী দলগুলোর নেতা, নাগরিক সমাজের কর্মী, যুব ও ছাত্র সংগঠনের সদস্যসহ হাজারো মানুষ অংশ নেন।
দিল্লিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
রবিবার নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভকারীরা মিছিল করে যন্তর মন্তরের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ অশোক রোডে ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকে দেয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে। দিল্লি পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ ঘটনায় ১১০ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে বিক্ষোভকারীদের দাবি, আটক ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৫০০।
কেন্দ্রীয় দিল্লি থেকে আটক ব্যক্তিদের ১০ থেকে ১৫টি বাসে করে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন এক নারী সাংবাদিকও, যিনি শনিবারের বিক্ষোভের খবর সংগ্রহের সময় এক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগ করেছিলেন।
পুলিশের এক কর্মকর্তার দাবি, রবিবারের বিক্ষোভে ১২ থেকে ১৫ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
বিক্ষোভ চলাকালে দিল্লিতে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের বেশ কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আটক বিক্ষোভকারীদের নিয়ে যাওয়া একটি বাসের পেছনের জানালা ভেঙে কয়েকজন বেরিয়ে আসছেন।
অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ) অভিযোগ করেছে, সংগঠনটির জাতীয় সভাপতি নেহা বোরাকে বিকেল ৫টার দিকে অশোক রোড থেকে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। তাকে তুলে নেওয়া পুলিশ সদস্যদের কারও গায়ে নামের ব্যাজ ছিল না বলেও অভিযোগ করে সংগঠনটি। পরে নেহা বোরাকে নরেলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া থানায় পাওয়া যায় এবং সেখান থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মুক্তির পর নেহা বোরার অভিযোগ, 'তারা মনে করে আমরা কুকুর, তেলাপোকা কিংবা এমন কোনো পোকামাকড়, যাদের তুলে গাড়িতে ছুড়ে ফেলা যায়, ৫০ কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে মারধর করা যায়। কিন্তু আজ আমরা দেখিয়ে দিয়েছি যে আমরা এই দেশের নাগরিক।'
তিনি আরও বলেন, 'ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করার এবং নির্বাচন কমিশন ও শাসক দল কীভাবে আমাদের ভোট নিয়ে কাজ করছে, তা জানতে চাওয়ার অধিকার আমাদের রয়েছে। নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলে বিক্ষোভ করার জন্য যদি বারবার আমাদের আটক করা হয়, তাহলে সেখানে ফিরে গিয়ে আমাদের প্রতিবাদের অধিকার পুনরুদ্ধার করাও আমাদের অধিকার।'
দিল্লির বিক্ষোভে অংশ নেন ৮৩ বছর বয়সী চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক সৈয়দ আখতার মির্জাও। হুইলচেয়ারে বসে তিনি বলেন, 'এই ছেলেমেয়েরা অনেক কিছু সহ্য করেছে। ইতিহাস তৈরি হচ্ছে, আর আমি তার অংশ হতে চাই।'
তিনি আরও বলেন, 'এই সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত, সাম্প্রদায়িক ও অপরাধমূলক। এই সরকারের চলে যাওয়া উচিত।'
মুম্বাইয়ে ঠাকরে-ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে মিছিল
এদিকে মুম্বাইয়ে সিইসির অপসারণ এবং চলমান এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে বড় ধরনের মিছিল বের হয়। শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) প্রধান উদ্ধব ঠাকরে এবং মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা (এমএনএস) প্রধান রাজ ঠাকরের নেতৃত্বে ‘বিরাট গর্জনা মোর্চা’ নামে এই মিছিলটি অনুষ্ঠিত হয়।
মেট্রো সিনেমা হল থেকে বৃহন্মুম্বাই মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের (বিএমসি) সদর দপ্তর পর্যন্ত মিছিলে কংগ্রেস এবং ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি-শরদচন্দ্র পাওয়ার (এনসিপি-এসপি)-এর নেতারাও অংশ নেন। আয়োজকদের দাবি, মিছিলে প্রায় ৬ হাজার মানুষ যোগ দেন।
মুম্বাইয়ের সমাবেশে উদ্ধব ঠাকরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হাতে থাকা একটি 'অস্ত্র' হিসেবে আখ্যা দেন। তার অভিযোগ, ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নিতে বিজেপি জ্ঞানেশ কুমারকে ব্যবহার করছে।
উদ্ধব বলেন, 'আপনারা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, কিন্তু রাজপথ আমাদের।' দেশজুড়ে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার ঘটনাকে তিনি ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার শামিল বলেও মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে এমএনএস প্রধান রাজ ঠাকরে সিইসির অপসারণের দাবি জানান এবং ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) বাতিল করে ব্যালট পেপারে ভোট ফেরানোর পক্ষে মত দেন।
এসআইআর প্রক্রিয়াকে 'অবৈধ' আখ্যা দিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে একই বছরের মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত ভোটারের সংখ্যা এত বাড়ল কীভাবে।
খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে কতজনকে বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের কাছে সেই তথ্যও দাবি করেন রাজ ঠাকরে।
তিনি বলেন, '২ কোটি মানুষ কি বাংলাদেশ থেকে এসেছে? বিস্তারিত তথ্য দিন। আমরা তাদের খুঁজে বের করব এবং দেশ থেকে বের করে দেব।'
এমএনএস প্রধান আরও দাবি করেন, ২০১৭-১৮ সালেই তিনি প্রথম ‘ভোট চুরি’র বিষয়টি বিরোধী নেতাদের নজরে এনেছিলেন এবং নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার ভাষ্য, সে সময় তিনি কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী এবং তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ কয়েকজন বিরোধী নেতার সঙ্গে দেখা করে নির্বাচন বয়কটের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
রাজ ঠাকরে বলেন, 'আমি তাদের বলেছিলাম, নির্বাচন বয়কট করুন। তা না হলে সত্যটা কখনোই সামনে আসবে না।'
নির্বাচন কমিশন প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল ভারত
সিইসির পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল মুম্বাই, আটক পাঁচ শতাধিক