বিশ্ব ডাক দিবস আজ

ঈশ্বরগঞ্জে চায়ের স্টল-খোলা আকাশের নিচে চলে ডাকঘর সেবা

  • ঈশ্বরগঞ্জে ৬ শাখা ডাকঘরের নেই স্থায়ী কার্যালয়, ভোগান্তিতে ডাককর্মী ও গ্রাহক
আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৪ এএম

কখনও চায়ের স্টলে, কখনও মুদির দোকানে, আবার কখনও খোলা আকাশের নিচে বসেই চিঠিপত্র বিতরণ ও দাপ্তরিক কাজ সারছেন পোস্টমাস্টাররা। স্থায়ী কার্যালয় না থাকায় এভাবেই চলছে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ছয়টি শাখা ডাকঘরের কার্যক্রম।

এতে একদিকে যেমন ডাককর্মীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, অন্যদিকে সেবা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) উপজেলার উচাখিলা বাজারের সবজি মহালের একটি চায়ের স্টলে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। সেখানে একটি শপিংব্যাগ থেকে একগাদা চিঠিপত্র বের করে গ্রাহকের ঠিকানা দেখছিলেন উচাখিলা শাখা ডাকঘরের পোস্টমাস্টার শহিদুল হক (৪৪)।

শহিদুল হক বলেন, ‘গত পাঁচ বছর ধরে চায়ের স্টলে, মুদি দোকান কিংবা খোলা আকাশের নিচে আমি অফিস করছি। ২০২২ সালে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েই ইউনিয়ন পরিষদের একটি কক্ষে থাকা উচাখিলা শাখা ডাকঘরের অফিসটি উঠিয়ে দেন ইউপি চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল হাসান খান সেলিম। এরপর থেকেই এভাবে ভ্রাম্যমাণ অফিস চালিয়ে যাচ্ছি। শুধু আমিই নই, আমার মতো আরও অনেকেই এভাবে অফিস করেছেন। আমাদের দাবি, একটি স্থায়ী অফিস স্থাপন করে উচাখিলা শাখা ডাকঘরসহ অন্যান্য ডাকঘরের  কার্যক্রম চালু করা হোক। এতে সাধারণ জনগণের যেমন হয়রানি কমবে, তেমনি সরকারের রাজস্বও বাড়বে।’

শহিদুল হক আরও বলেন, ‘আমাদের যে সামান্য ভাতা দেওয়া হয়, তা দিয়ে এই সময়ে পেট চালানোই দায় হয়ে গেছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

সরেজমিন দেখা গেছে, উচাখিলা ইউনিয়ন পরিষদের একটি কক্ষে এখনও লেখা রয়েছে—‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশ ডাক বিভাগ, উচাখিলা শাখা ডাকঘর (ঈশ্বরগঞ্জ, ময়মনসিংহ)’। তবে কক্ষটি তালাবদ্ধ। ২০০৯ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পোস্টমাস্টারের চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ওই কক্ষে অফিস করছিলেন শহিদুল হক। তবে দুই বছর ধরে কক্ষটি আনসার সদস্যরা ব্যবহার করছেন।

ইউনিয়ন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, কক্ষটি আনসার সদস্যদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ইউপি চেয়ারম্যান দেশের বাইরে থাকায় এ সম্পর্কে জানতে চাইলে উচাখিলা ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো. আবু সাঈদ বলেন, ‘আগে এখানে পোস্ট অফিস ছিল, এখন আর নেই। ইউনিয়ন পরিষদে পোস্ট অফিসের কোনো কক্ষ বরাদ্দ নেই। এর চেয়ে বেশি আমি আর কিছু বলতে পারছি না।’

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা পোস্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে, কাগজে-কলমে উপজেলায় মোট ১৪টি শাখা ডাকঘর (পোস্ট অফিস) রয়েছে। উপজেলা পোস্ট অফিসসহ ঈশ্বরগঞ্জে মোট পোস্ট অফিসের সংখ্যা ১৫টি।

বিধি অনুযায়ী, প্রতিটি শাখা ডাকঘরে একজন পোস্টমাস্টার, একজন বিলিকারী ও একজন রানার থাকার কথা। কিন্তু বিভিন্ন শাখা ডাকঘরে পদ শূন্য থাকায় কোথাও কোথাও একজন রানারকেই পোস্টমাস্টারের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। আবার কোথাও জনবল সংকটে ডাকসেবা ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলার নাহরা শাখা ডাকঘরে পোস্টমাস্টার ও পিয়নের পদ শূন্য রয়েছে। চরজিথর শাখা ডাকঘরেও পোস্টমাস্টারের পদ শূন্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলার ১৪টি শাখা ডাকঘরের মধ্যে নওশতী বাজার, ভোলার আলগী, বড়জোড়া, নাহরা, বড়হিত এবং সৈয়দ ভাকুরী মল্লিক বাড়ীসহ সাতটি শাখা ডাকঘরে স্থায়ী অফিস রয়েছে। জাটিয়া শাখা ডাকঘরের কার্যক্রম চলে ইউনিয়ন পরিষদের একটি কক্ষে। অন্যদিকে চরজিথর, কুল্লাপাড়া, উচাখিলা, গাফুরিয়া, তারুন্দিয়া ও কোনাপাড়াসহ ছয়টি শাখা ডাকঘরের কোনো অফিস নেই। এসব পোস্ট অফিসের মাধ্যমে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০টি চিঠিপত্র বিলি করা হয়।

নামমাত্র ভাতায় মানবেতর জীবন

অফিস সংকট ও নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নামমাত্র ভাতায় পোস্টমাস্টার, বিলিকারী ও রানাররা ডাকসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমান সময়ে এই সামান্য ভাতার টাকায় সংসার চালাতে গিয়ে তাদের মানবেতর দিন কাটাতে হচ্ছে।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা পোস্ট অফিসে কর্মরত পোস্টাল অপারেটর সুকুমার নাগ বলেন, ‘শাখা ডাকঘরের পোস্টমাস্টারের ভাতা ৪ হাজার ৪৬০ টাকা, বিলিকারীর ভাতা ৪ হাজার ৩৫৪ টাকা এবং রানারের ভাতা ৪ হাজার ১৭৭ টাকা।’

বিশ্ব ডাক দিবস আজ

আজ ৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক দিবস। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও প্রতি বছর ৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক দিবস পালিত হয়। মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও ব্যবসায় ডাকসেবার গুরুত্ব এবং বিশ্বব্যাপী সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ডাক বিভাগের অবদান সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে দিবসটি পালন করা হয়। তবে বিশ্ব ডাক দিবসেও ঈশ্বরগঞ্জের উচাখিলা ইউনিয়ন শাখা ডাকঘরসহ ছয়টি শাখা ডাকঘরের স্থায়ী কার্যালয় না থাকায় চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ডাককর্মীরা।

উচাখিলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ট্রেড ইন্সট্রাক্টর ও স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘উচাখিলা ইউনিয়ন পরিষদে দীর্ঘদিন ধরে পোস্ট অফিস দেখে আসছি। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে চায়ের স্টল ও খোলা আকাশের নিচে পোস্টমাস্টারকে অফিস করতে দেখছি। এটা অত্যন্ত দুঃখ ও লজ্জাজনক। এতে সাধারণ জনগণের ভোগান্তি হচ্ছে এবং পোস্টমাস্টারকেও ডাকসেবা দিতে বেগ পোহাতে হচ্ছে।’

এ বিষয়ে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা পোস্টমাস্টার মো. আক্তারুজ্জামান মিজান বলেন, ‘শাখা ডাকঘর কিংবা পোস্ট অফিসগুলোর অধিকাংশেরই স্থায়ী অফিস নেই। কেউ বাড়িতে, কেউ দোকানে, আবার কেউ ভাড়া নিয়ে অফিস চালাচ্ছেন। প্রাচীনকাল থেকেই স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যরা পোস্ট অফিস দেখভাল করে আসছেন। এতে সাধারণ জনগণের কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছে। বিষয়টি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা করবেন।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত