দেশে শুরু হতে যাচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। আবহমান বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক প্রীতির মেলবন্ধনে এ উৎসব উদযাপিত হয়ে এলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোর কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এবং চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রতিবারের মতো এবারও নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা দেখছে না বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ।
পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, আগামী ১৬-২১ অক্টোবর হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। পূজা ঘিরে কঠোর নিরাপত্তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পূজার পূর্বপ্রস্তুতি শুরু করে প্রতিমা বিসর্জনসহ কয়েকটি ধাপে নিরাপত্তা দেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রতিটি মন্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের বডিওর্ন ক্যামেরা সংযুক্ত থাকবে। সাদা পোশাকের পুলিশ থাকবে ছদ্মবেশে। নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর দিকে কড়া দৃষ্টি রাখা হবে। পূজার অনুষ্ঠান নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে গতকালও বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সব ইউনিটকে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুরো নিরাপত্তার বিষয়টি তদারকি করবে পুলিশ সদর দপ্তর।
পূজার নিরাপত্তার বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির দেশ রূপান্তরকে বলেন, পূজা উপলক্ষে পুলিশের প্রতিটি ইউনিটকে নিজ নিজ নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে বলা হয়েছে। পূজার সময় সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানো হতে পারে, এ বিষয়ে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। মন্ডপে দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যরা বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করবে। একই কথা বলেছেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদযাপনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে প্রতিটি পূজামণ্ডপ সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। মণ্ডপে নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবকরাও পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকবে।
উৎসাহ-উদ্দীপনায় প্রস্তুতি : পূজা উদযাপন পরিষদ ও বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সারা দেশে উৎসাহ-উদ্দীপনায় পূজার প্রস্তুতি চলছে। তবে ঢাকাসহ বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক মণ্ডপেই নিরাপত্তার বিষয়ে আলোচনা আছে। গত কয়েক বছরের পূজামণ্ডপকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা, সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়া এবং বিশেষ কিছু রাজনৈতিক অস্থিরতা সাধারণ পুণ্যার্থী ও আয়োজকদের মনে ‘কিছুটা শঙ্কা’ তৈরি করেছে। বিশেষ করে তুলনামূলক নির্জন এলাকায় থাকা মন্ডপগুলো নিয়ে বেশি চিন্তিত। তবে এই শঙ্কাকে ছাপিয়ে স্বস্তির জায়গা তৈরি করছে প্রশাসনের ব্যাপক নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ। পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি, আনসারসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ আয়োজকদের আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে। প্রতিটি জেলা ও থানায় খোলা হয়েছে বিশেষ কন্ট্রোল রুম। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হয়েছে। পূজা ঘিরে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে না।
ঝুঁকিপূর্ণ ৩২২৫টি মণ্ডপ নিয়ে ভাবনা : চলতি বছর ঢাকায় ২৫৮টিসহ সারা দেশে ৩২ হাজার ৯৫টি পূজামণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২২৫টি মণ্ডপকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং অতীত ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুর্গাপূজার সুযোগ নিয়ে নাশকতার ষড়যন্ত্র করেছে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো। তবে আমরা সতর্ক আছি। মণ্ডপ ও হিন্দুদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ নজরদারি করা হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার চালালেই নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা। গত বছরও দুর্গাপূজার সময় বিভিন্ন মন্দির ও হিন্দুদের কিছু বাড়িঘরে হামলার চেষ্টা করেছিল দুর্বৃত্তরা।
গুজব ভোগানোর আশঙ্কা : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, কোনো প্রত্যক্ষ গোলযোগের চেয়েও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব অনেক বেশি মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। কোনো একটি মণ্ডপের দৃশ্য বিকৃত করে বা ভিত্তিহীন খবর রটিয়ে মুহূর্তের মধ্যে মানুষের আবেগকে উসকে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি করে দুর্বৃত্তরা। এই কারণে এবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘গুজব প্রতিরোধ’। পুলিশ সদর দপ্তর, এসআরবি, পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট বিশেষ সাইবার মনিটরিং টিম গঠন করেছে। ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে পূজাকে কেন্দ্র করে কোনো উসকানিমূলক পোস্ট, ভিডিও বা ছবি শেয়ার করা হচ্ছে কি না, তা ২৪ ঘণ্টা নজরদারি করা হচ্ছে। কোনো তথ্য বা ছবি ভাইরাল হলে তা দ্রুত যাচাই করে মূলধারার গণমাধ্যম ও পুলিশের অফিশিয়াল পেজগুলোর মাধ্যমে সত্য তুলে ধরার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গুজব রটনাকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থার আওতায় আনার জন্য ডিজিটাল সিকিউরিটি ও সাইবার ক্রাইম ইউনিটগুলোকে হাই-অ্যালার্টে রাখা হয়েছে।
পুলিশের নির্দেশনায় যা বলা হয়েছে : পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনায় বলা হয়, ধর্মীয় এসব আচার অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি পালন করা যাবে না। রাজনৈতিক কোনো বক্তব্য বা দাবি উপস্থাপন করা যাবে না। সামাজিক মাধ্যমে যেকোনো গুজব বা প্রচারিত ঘটনায় তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। সামাজিক মাধ্যম নজরদারির আওতায় আনতে হবে। আইনশৃঙ্খলার বাহিনীর সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। রাস্তার পাশে বা অরক্ষিত স্থানে মূর্তি রাখা যাবে না। কোনো বিরোধপূর্ণ স্থানে পূজামণ্ডপ তৈরির অনুমতি দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে মসজিদ বা মাদ্রাসার পাশে পূজামণ্ডপ স্থাপনের জায়গা না দেওয়া, যেসব স্থায়ী পূজামণ্ডপের পাশে মসজিদ রয়েছে, সেগুলোতে নামাজের সময় গান-বাজনা বন্ধ রাখতে হবে। পরিচ্ছন্ন স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দিতে হবে। পূজা উদযাপন পরিষদকে এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশ দিতে হবে। প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, নিজস্ব জেনারেটরের ব্যবস্থা, দিন ও রাতে পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া ও আর্মব্যান্ড পরতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মন্ডপ বিসর্জনের সময় বিশৃঙ্খলা এড়াতে ঘাটের সংখ্যা বাড়াতে হবে। রাত ৮টার মধ্যে মন্ডপ বিসর্জন নিশ্চিত করতে হবে।
দশমীর দিনে বিশেষ ডুবুরির দল : পুলিশের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, দুর্গাপূজার সময় নিরাপত্তায় আকাশে হেলিকপ্টারও থাকার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দশমীর দিন থাকবে বিশেষ ডুবুরির দল। এমন জায়গায় পূজামণ্ডপ করা যাবে না, যেখানে গাড়ি প্রবেশ করতে পারে না। পূজা উদযাপন পরিষদের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরাও আমাদের দিক থেকে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য মণ্ডপগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছি। সব মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা লাগাতে বলা হয়েছে। পূজায় যাতে কোনো সহিংসতা বা হামলার ঘটনা না ঘটে সেজন্য সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি, পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে পূজা নিয়ে বৈঠক করেছি। সবাই আমাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন। আশা করছি, এবার শান্তিপূর্ণভাবেই শারদীয় দুর্গোৎসব পালিত হবে।
প্রযুক্তির আওতায় নিরাপত্তা : এবারের দুর্গাপূজার নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান সংযোজন হলো বিস্তৃত প্রযুক্তির ব্যবহার। বিশেষ করে সব মণ্ডপ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বে নিয়োজিত সদস্যদের জন্য ‘বডিওর্ন ক্যামেরা’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অধীনস্থ থানাগুলোকে একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে। গত মঙ্গলবার ডিএমপি কমিশনারের সভাপতিত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে কেউ যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে, সে বিষয়ে ৫০টি থানার পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছে। পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলোর তৎপরতার ওপর কঠোর নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে। প্রতিটি থানার ওসিকে নিজ এলাকার সব পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং আয়োজক কমিটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে বলা হয়েছে।