‘পিপাসায় দম বের হয়ে যাচ্ছিল। বারবার পানি চেয়েছি, কিন্তু একফোঁটা পানিও দেয়নি। শেষ পর্যন্ত তাদের পায়ে ধরে বলেছি, আমাকে যদি মেরেই ফেলেন, লাশটা আমার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েন। মা অন্তত আমার লাশটা দেখে একটু শান্তি পাবেন।’ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যায় থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন আনিসুজ্জামান জামান (৩৫)। ডান পা ভাঙা। মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সাতটি সেলাই। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও আঘাতের চিহ্ন আনিসুজ্জামান জামানের। তার বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মরহুম জয়নাল আবেদীনের ছেলে। জামান বর্তমানে হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। জামানের অভিযোগ, চাকরি দেওয়ার কথা বলে ফেসবুক মেসেঞ্জারে পরিচয়। পরে তাকে ডেকে নিয়ে অপহরণ করা হয়। একটি নদীর তীরে নিয়ে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে তাকে লোহার পাইপ ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে মারধর করা হয়। টাকা না পেয়ে তার ডান পা ভেঙে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
গত ৫ অক্টোবর সোমবার সকালে চাকরির কথা বলে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার রসুলপুর এলাকায় গিয়েছিলেন জামান। তার ভাষ্য, সেখানে চার ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে এসে তার দুই হাত ধরে নাকের কাছে টিস্যু পেপারের মতো একটি বস্তু ধরেন। এরপর আর কিছু মনে নেই তার।
জামান বলেন, ‘আনুমানিক বেলা ২টা থেকে আড়াইটার দিকে জ্ঞান ফেরে। চোখ খুলে দেখি, চারদিকে খোলা মাঠ, পাশে নদী আর কাশবন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে লোহার পাইপ দিয়ে মারতে শুরু করে।’
এরপর তাকে তার মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে দেওয়া হয়। ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। জামান তাদের জানান, তার মায়ের কাছে এত টাকা নেই। তার মা জাহানারা বেগম ১২ বছর ধরে ব্লাড ক্যানসারে ভুগছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, আমার মা অসুস্থ, তার কাছে এত টাকা নেই। এ কথা শুনে তারা আমাকে আরও মারধর করে। পরে মাকে ফোন ধরিয়ে দেয়। আমি মাকে টাকা পাঠাতে বলি। জানতাম, মা এত টাকা দিতে পারবেন না। তারপরও বিপদে পড়েছি শুনে মা কোথা যেন সংগ্রহ করে ৫ হাজার টাকা পাঠান।’ মা তখন তাদের বলেছিলেন, ‘তোমরা আমার সহজসরল ছেলেটাকে ছেড়ে দাও।’ কিন্তু তারা ছাড়েনি। আরও টাকা চায়। এরপর লোহার পাইপ দিয়ে পিটিয়ে আমার পা ভেঙে দেয়। মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে।’
কিছুক্ষণ থেমে জামান বলেন, ‘ব্যথায় আমি বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলাম। পিপাসায় খুব কষ্ট হচ্ছিল। পানি চাইছিলাম, কিন্তু কেউ পানি দেয়নি।’ একপর্যায়ে নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে যায় তার। জামানের ভাষায়, ‘তাদের পায়ে ধরে বলেছিলাম, আমাকে যদি মেরেই ফেলেন, আমার লাশটা ঈশ্বরগঞ্জে আমার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েন। মা অন্তত আমার লাশটা দেখে শান্তি পাবেন।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, নির্যাতনের একপর্যায়ে জামান অচেতন হয়ে পড়েন। পরে রাত ৯টার দিকে জামানের জ্ঞান ফেরে। তখন তার ডান পা ভাঙা। মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত। হাঁটতে না পেরে হামাগুড়ি দিয়ে ধলেশ্বরী নদীর পাড় থেকে একটি রাস্তার কাছে যান তিনি। সেখানে চিৎকার করতে থাকেন। চিৎকার শুনে পথচারীরা তাকে উদ্ধার করেন। ঠিকানা জেনে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তাকে ময়মনসিংহে পাঠিয়ে দেন তারা। রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে ময়মনসিংহের টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছালে জামানের বড় বোন বদরুন্নেসা সালমা তাকে নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।
স্বজনরা জানান, জামানের বাবা জয়নাল আবেদীন মারা গেছেন। ১২ বছর ধরে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত মা জাহানারা বেগমকে নিয়ে কাশিপুর গ্রামের বাড়িতে থাকেন তিনি। তিন ভাইয়ের আলাদা সংসার। তিন বোনও স্বামীর সংসারে। ভাইবোনদের সহায়তায় মায়ের চিকিৎসা ও সংসার চলে। বেকার জামানের নিয়মিত কোনো আয় নেই। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, মায়ের দেখাশোনার কাজটিও মূলত জামানই করেন।
জামানের বড় বোন বদরুন্নেসা সালমা বলেন, ‘মানুষ মানুষকে এভাবে মারে! আমার ভাইটা খুব সহজসরল। টাকার জন্য তাকে মারতে মারতে অজ্ঞান করে ফেলেছে। একবার ৫ হাজার টাকা দেওয়ার পরও আরও টাকার জন্য মারধর করেছে। পা ভেঙে দিয়েছে, মাথায় সাতটি সেলাই লেগেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না। ভাইকে নিয়ে আমরা খুব চিন্তায় ছিলাম। থানায় জানালে যদি তাকে মেরে ফেলে এই ভয়ও ছিল। এখন আমরা ঘটনার বিচার চাই।’
ছেলের ওপর নির্যাতনের কথা শুনে কাঁদতে কাঁদতে জামানের মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘বাড়িতে জামানই আমাকে দেখাশোনা করে। ১২ বছর ধরে ক্যানসারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। আমার ছেলেটাকে যারা তুলে নিয়ে নির্যাতন করেছে, আল্লাহ যেন তাদের বিচার করেন।’ কথা বলেই ছেলের জন্য কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
এ বিষয়ে ঈশ্বরগঞ্জ থানার ওসি মো. সাজ্জাদ রোমন বলেন, ‘পুলিশ পাঠিয়ে খোঁজখবর নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’