একটি ফ্ল্যাটের নির্মাণ বা বিক্রি হলো না, ক্ষতি কি শুধু একজন আবাসন ব্যবসায়ীর? মোটেও নয়। একটি ফ্ল্যাটের নির্মাণ থেমে যাওয়া মানে থেমে যেতে পারে রডের অর্ডার, সিমেন্টের উৎপাদন, টাইলসের বিক্রি, কাচের সরবরাহ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবসা। কাজ হারাতে পারেন নির্মাণশ্রমিক। কমতে পারে ট্রাকের ভাড়া। কমতে পারে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ।
অর্থাৎ আবাসন খাতের দেয়ালে যখন ফাটল ধরে, তার কম্পন পৌঁছে যায় অর্থনীতির বহু প্রান্তে।
তাহলে প্রশ্ন—আবাসন খাত বাঁচলে আসলে কত শিল্প বাঁচবে?
বাংলাদেশের আবাসন বাজারে এখন এক ধরনের নিঃশব্দ স্থবিরতা বিরাজ করছে। চাহিদা আছে, কিন্তু ক্রয়ক্ষমতা চাপে। প্রকল্প আছে, কিন্তু বিনিয়োগে সতর্কতা। ফ্ল্যাট আছে, কিন্তু অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা অপেক্ষায়।
উচ্চ সুদের হার, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, কর ও নিবন্ধন ব্যয় এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে আবাসন ব্যবসার সমীকরণ কঠিন হয়ে উঠেছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার আবাসিক ফ্ল্যাট বিক্রির গতি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে একটি বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন—মানুষ কি ফ্ল্যাট কিনতে চাইছে না, নাকি কিনতে পারছে না?
একটি ভবনকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ইট, বালি, সিমেন্ট আর রডের সমষ্টি। কিন্তু অর্থনীতির চোখে একটি ভবন আসলে একটি বিশাল সাপ্লাই চেইন। রড আসে স্টিল কারখানা থেকে।
সিমেন্ট আসে কারখানা থেকে। বালি-পাথর আসে সরবরাহকারীর কাছ থেকে। এরপর টাইলস, স্যানিটারি পণ্য, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, রং, বৈদ্যুতিক তার, সুইচ, লিফট—একটির পর একটি শিল্প যুক্ত হয়। আর এসব পণ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেয় পরিবহন খাত। অর্থাৎ একটি আবাসিক প্রকল্প মানেই একসঙ্গে বহু খাতে অর্থের প্রবাহ।
আবাসন খাতের মন্দার প্রথম বড় অভিঘাত পড়ে নির্মাণসামগ্রীর বাজারে। নতুন ভবন কম হলে রডের চাহিদা কমে।
কমে সিমেন্টের চাহিদা। কমে ইট, বালি, পাথর ও অন্যান্য উপকরণের বিক্রি। আর যখন চাহিদা কমে যায়, তখন উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও কারখানা অনেক সময় পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে না। এর ফলে শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়—ছোট সরবরাহকারী থেকে পরিবহন ব্যবসায়ী পর্যন্ত সবাই চাপের মুখে পড়ে। অর্থাৎ আবাসনের মন্দা শুরু হয় একটি ভবন থেকে, কিন্তু তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে একটি শিল্পশৃঙ্খলে।
এবার আসা যাক সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গায়—মানুষের জীবনে। একটি ভবন নির্মাণে শুধু প্রকৌশলী বা স্থপতিই কাজ করেন না।
সেখানে কাজ করেন রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, টাইলস মিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি এবং অসংখ্য শ্রমিক। নির্মাণকাজ কমলে তাদের আয়ও কমে যায়। আর আয় কমলে কমে বাজারে মানুষের খরচ। এখানেই আবাসন খাতের সংকট একটি বড় মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্টে রূপ নেয়।
একজন শ্রমিক কম আয় করলে শুধু তার পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না—যে দোকান থেকে তিনি বাজার করেন, যে পরিবহনে যাতায়াত করেন, যে সেবা নেন—সেখানেও চাহিদা কমে।
আবাসন খাতের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হলো ব্যাংক। মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশ গৃহঋণের ওপর নির্ভর করে ফ্ল্যাট কেনেন। কিন্তু ঋণের সুদ যত বাড়ে, মাসিক কিস্তিও তত ভারি হয়। ফলে সম্ভাব্য ক্রেতা হিসাব করেন—
আজ ফ্ল্যাট কিনব, নাকি অপেক্ষা করব?
আর এই অপেক্ষাই বাজারের জন্য বড় সংকেত। কারণ একজন ক্রেতা ঋণ নিলে সেই অর্থ যায় ডেভেলপারের কাছে। ডেভেলপার সেই অর্থ ব্যয় করেন নির্মাণে। নির্মাণ কোম্পানি অর্থ দেয় শ্রমিক ও সরবরাহকারীদের। আর সরবরাহকারীরা আবার সেই অর্থ ব্যয় করেন নিজেদের ব্যবসায়। অর্থাৎ গৃহঋণের অর্থ অর্থনীতির ভেতরে ঘুরে বহুবার কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করে।
গল্প এখানেই শেষ নয়।
একটি পরিবার যখন নতুন ফ্ল্যাটে ওঠে, তখন শুরু হয় আরেক অর্থনৈতিক চক্র। প্রয়োজন হয় খাট, সোফা, ডাইনিং টেবিল, পর্দা, ফ্রিজ, টেলিভিশন, এসি, লাইটিং, ইন্টারনেট। অর্থাৎ আবাসন খাত সচল হলে শুধু নির্মাণ শিল্প নয়—ফার্নিচার, ইলেকট্রনিকস, হোম ডেকর, ইন্টারনেটসহ ভোক্তাপণ্য খাতও লাভবান হয়। তাই আবাসন খাতকে অনেকটা অর্থনীতির স্পন্দনশীল হৃৎপিণ্ডের মতো দেখা যায়, এখানে অর্থের প্রবাহ বাড়লে তার ঢেউ অন্য বাজারেও পৌঁছায়।
তাহলে প্রশ্ন—সমস্যার মূল কোথায়?
একক কোনো জায়গায় নয়। একদিকে নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় চাপ। গৃহঋণের খরচ বেশি। ডলারের অস্থিরতা আমদানিনির্ভর কাঁচামালের খরচ বাড়ায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নীতিগত ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা।
ফলে বাজারে তৈরি হয়েছে বিপজ্জনক কয়েকটি বিষয়—ক্রেতা অপেক্ষা করছেন। ডেভেলপার অপেক্ষা করছেন। বিনিয়োগকারী অপেক্ষা করছেন। আর অর্থনীতিতে এই অপেক্ষা যত দীর্ঘ হয়, অর্থের প্রবাহ তত ধীর হয়ে যায়। তাহলে সবচেয়ে বড় সংকট কী?
আবাসন খাতকে বাঁচাতে শুধু ফ্ল্যাটের দাম কমানোর কথা বললেই হবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত নীতি।
প্রথমত—সাশ্রয়ী গৃহঋণ। দ্বিতীয়ত—মধ্যবিত্তের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হাউজিং ফাইন্যান্স। তৃতীয়ত—রেজিস্ট্রেশন ও করব্যবস্থায় যৌক্তিকতা। চতুর্থত—নির্মাণসামগ্রীর সরবরাহ ও খরচ কমানোর উদ্যোগ। পঞ্চমত—জমি ও প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নীতির ধারাবাহিকতা।
কারণ আবাসনে আজ বিনিয়োগ করে আগামীকাল লাভ পাওয়া যায় না। এটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসা। তাই বিনিয়োগকারীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু করছাড় নয়—ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চয়তা।
আবাসন খাতকে চাঙা করতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার দাবিও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। বিশ্লেষকদের যুক্তি- অর্থ যদি দেশের বাইরে চলে যাওয়ার বদলে দেশে বিনিয়োগ হয়, তাহলে আবাসনসহ সংশ্লিষ্ট শিল্পে অর্থের প্রবাহ বাড়তে পারে।
একটি অর্থনীতির শক্তি শুধু তার জিডিপির সংখ্যায় মাপা যায় না। মাপা যায়—কত মানুষ কাজ করছে, কত কারখানা চলছে, কত উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করছেন এবং কত পরিবার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী।
আবাসন খাত তাই শুধু ইট-পাথরের গল্প নয়।
এটি রড-সিমেন্টের গল্প। এটি শ্রমিকের মজুরির গল্প। এটি ব্যাংকের ঋণের গল্প। এটি ফার্নিচার, সিরামিক, কাচ, ইলেকট্রিক্যাল ও পরিবহন শিল্পের গল্প। সর্বোপরি এটি অর্থনীতিতে আস্থার গল্প।
আবাসন খাতের চাকা থেমে গেলে তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে বহু শিল্পে।
আর সেই চাকা আবার ঘুরতে শুরু করলে তার সঙ্গে ঘুরতে পারে অর্থনীতির আরো বহু চাকা। কারণ একটি ভবনের ভিত শক্ত হলে শুধু ভবন দাঁড়ায় না—তার সঙ্গে দাঁড়ায় একটি অর্থনীতির বহু স্তম্ভ।