রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানাধীন আব্দুল্লাহপুর থেকে চট্টগ্রামগামী একটি বাসে উঠে পথিমধ্যে অপহরণের শিকার হন মো. ফরহাদ (২৪)। এরপর তার ফোন নম্বর থেকেই পরিবারের সদস্যদের কাছে একের পর এক কল করে মুক্তিপণ দাবি করতে থাকে অপহরণকারীরা। ফরহাদকে উদ্ধারে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পাশাপাশি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের কাছেও সহায়তা চান পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু ফরহাদকে উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি পুলিশ। এভাবে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কেটে যায় তিন দিন। শেষ পর্যন্ত পুলিশের অভিযানে নয়, বন্দিদশা থেকে কৌশলে নিজের চেষ্টায় মুক্ত হন ফরহাদ।
ফরহাদের বাড়ি ভোলার মনপুরা উপজেলায়। উত্তরায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। গত কোরবানির ঈদে বিয়ে করা ফরহাদ স্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ জন্য কেনাকাটা করে সঙ্গে এক লাখ টাকা নিয়ে গত ১১ অক্টোবর দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আব্দুল্লাহপুর থেকে স্টারলাইন পরিবহনের একটি বাসে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। সেখানে তার বোনের বাসায় থাকা মাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। বাসে ওঠার পর মাকে ফোন করেছিলেন ফরহাদ। দুপুর আড়াইটার দিকে স্ত্রীর সঙ্গেও কথা হয়। কিন্তু বিকেল ৩টা থেকে তার ফোন বন্ধ পান পরিবারের লোকজন। পরে বাস কাউন্টারগুলোতে খোঁজ নিয়েও তার যাত্রার তথ্য পায়নি পরিবার। পর দিন ১২ তারিখ সকালে ফরহাদের নম্বর থেকে ফোন আসে বড় ভাই আব্দুস সাত্তারের কাছে। অপর প্রান্তের ব্যক্তি ফরহাদ তাদের কাছে আছে জানিয়ে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। কিছুক্ষণ পরপর ফোন করে টাকা চাওয়া হয়।
তিন থানায় ঘুরেও জিডি হয়নি : ফরহাদের ভাই সাত্তার জানান, উপায় না পেয়ে প্রথমে উত্তরখান থানায় যান তিনি। সেখান থেকে তাকে উত্তরা পশ্চিম থানায় যেতে বলা হয়। পশ্চিম থানায় গেলে আবার উত্তরা পূর্ব থানায় যেতে বলা হয়। উত্তরা পূর্ব থানায় গেলে পুলিশ জানায়, ‘টাকা আদায়ের জন্য আমার ভাই অপহরণের নাটক সাজিয়েছে, জিডি করার দরকার নেই, অপেক্ষা করে দেখতাম।’ সারাদিন তিন থানায় ঘুরেও জিডি করতে না পেরে পরিচিত এক পুলিশ কর্মকর্তা ও সাংবাদিকের সহায়তা চান সাত্তার। তারা ডিএমপির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পর উত্তরা পূর্ব থানার ওসির কাছে যান সাত্তার। পরে জিডি নেওয়া হয়। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় এসআই মঞ্জুরুল হককে। সাত্তার বলেন, ফরহাদের নম্বর থেকে বারবার মুক্তিপণ চাওয়ার বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তাকে দেখান। ১২ তারিখ রাতে এসআই তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করার কথা জানান। পরে জানান, চট্টগ্রামে আছেন; সেখান থেকে মুক্তিপণ চাওয়া হচ্ছে। ঢাকায় থেকে কীভাবে উদ্ধার করব। এদিকে অপহরণকারীদের ফোন আসতেই থাকে। সাত্তার জানান, পরে ওই সাংবাদিকের মাধ্যমে এসআরবি-১-এর সহায়তা চান তিনি। সেখানে জিডির কপি ও লিখিত আবেদন জমা দেন।
ওই সাংবাদিক জানান, ১২ তারিখে উত্তরা বিভাগের একজন এডিসির হস্তক্ষেপে জিডি হয়। পরে জিডির কপি ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওসমান গনি এবং উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার রেজাউল করিমকে পাঠিয়ে সহায়তা চাওয়া হয়। অতিরিক্ত কমিশনার খতিয়ে দেখতে উত্তরা বিভাগের ডিসিকে নির্দেশ দেন। ডিসিকে ফোন করলে তিনি ব্যস্ত থাকার কথা জানিয়ে ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
নিজের চেষ্টায় মুক্ত ফরহাদ : সাত্তার জানান, এরই মধ্যে ১৩ তারিখ সন্ধ্যার দিকে গ্রামের বাড়ি থেকে ফোন করে তাকে জানানো হয়, ফরহাদ অপহরণকারীদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে কুমিল্লার চান্দিনা থানার আওতাধীন একটি সড়কের পাশের দোকানে আশ্রয় নিয়েছেন। পরে উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশ চান্দিনা থানায় যোগাযোগ করে ফরহাদকে হেফাজতে নেওয়ার অনুরোধ জানায় এবং পরিবারের লোকজনকে সেখানে যেতে বলে। সাত্তার বলেন, ‘আমরা চান্দিনা থানায় যাই এবং মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে ফরহাদকে আমাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে ঢাকায় এনে হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়।’
ফরহাদ গতকাল বলেন, ‘সেদিন বাসটি নারায়ণগঞ্জ পার হওয়ার পর চালক ও সুপারভাইজার এক যাত্রীকে তোলেন। ওই ব্যক্তি তার পাশের আসনে বসেন। কিছুদূর যাওয়ার পর ওই যাত্রী বিরিয়ানির প্যাকেট খুলে আমাকে খেতে অফার করেন। কিন্তু আমি খাব না বলে জানিয়ে দিই। এরপর কী ঘটেছিল, তা মনে নেই। গভীর রাতে জ্ঞান ফিরলে নিজেকে একটি কক্ষে হাত-পা ও মুখ বাঁধা অবস্থায় দেখতে পাই। সেখানে চার-পাঁচজন আমার কাছ থেকে পরিবারের সবার নম্বর নেয় এবং সকালে বড় ভাইকে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করে।’ ফরহাদের অভিযোগ, তাকে বৈদ্যুতিক শক, বুকে ইনজেকশন এবং মারধর করা হয়। সঙ্গে থাকা এক লাখ টাকাও নিয়ে যায় তারা। ১১ তারিখ থেকে খেতে দেয়নি। অপহরণকারীরা কয়েক ঘণ্টা পরপর কক্ষে আসত এবং নির্যাতন করত। তারা একে অপরকে শফিক ও বাপ্পি নামে ডাকত। ১৩ তারিখ সন্ধ্যার আগে তারা কক্ষে এলে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকার ভান করেন। সাড়াশব্দ না পেয়ে তারা চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে যায়। পরে হাতের বাঁধন নাড়াচাড়া করতে করতে গিঁট খুলে ফেলি। এ সময় ওই রুমে কয়েকটি শাবল, বন্দুক ও লোহার রডসহ দেশীয় অস্ত্র দেখতে পাই। শাবল দিয়ে দরজায় আঘাত করতে থাকি। একটা পর্যায়ে দরজা খুলে গেলে দেখি, চারদিকে বনজঙ্গল। একটি পথ ধরে এক ঘণ্টা দৌড়ে পাকা সড়কে উঠি। পরে এক রিকশাচালকের সহায়তায় একটি দোকানে গিয়ে বাড়িতে ফোন করি।’
উত্তরা পূর্ব থানার ওসি মোরশেদ আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, তিনিই চান্দিনা থানার ওসিকে ফোন করে ফরহাদকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করেছেন। ফরহাদ নিজেই কৌশলে মুক্ত হয়েছেনÑ এ কথা জানানো হলে ওসি বলেন, ‘ফরহাদ অপহৃত হয়েছিলেন কি না, তা কীভাবে বুঝবেন; তারা তো থানায় আসেননি।’