স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বহু মানুষ

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৭ এএম

সম্প্রতি জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ফার্মাসিস্ট মো. মাহমুদুল হকের রুমে বসে একজন ওষুূধ খাওয়ার জন্য প্যাকেট খুলছিলেন। তখন মাহমুদুল হক জিজ্ঞেস করলেন, যেহেতু তিনি বাইরে থেকে এসেছেন, তার হাত ধোয়া কি না? তিনি না বোধক উত্তর দিলেন। তখন হাত ভালোভাবে সাবান দিয়ে ধুয়ে তারপর ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু কেন? বিষয়টি জানতে চাইলে মাহমুদুল হক বলেন, যেহেতু তিনি বাইরে থেকে এসেছেন। তার হাত দিয়ে কতকিছুই তো স্পর্শ করেছেন। সেসব কিছুতে জীবাণু থাকতে পারে। সেজন্য হাত না ধুয়ে কোনো খাবার খাওয়া যেমন ঠিক না; তেমন ওষুধও। তিনি বলেন, যেকোনো কিছু খাওয়ার আগে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিলে নানা ধরনের রোগ থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

হাত ধোয়ার গুরুত্ব এখনো দেশের অনেক মানুষ বোঝেন না। আবার অনেকে জানলে-বুঝলেও তাড়াহুড়ো কিংবা অবহেলা করে হাত ধুয়ে নেন না। আবার ধোয়ার ইচ্ছে থাকার পরও সুবিধা না থাকায় অনেকে হাত ধুতেও পারেন না। আর এই হাত না ধোয়ার কারণেই প্রতিদিন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন অসংখ্য মানুষ। এমন বাস্তবতায় আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে বিশ^ হাত ধোয়া দিবস। ২০০৮ সালে বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসের উদ্যোগ শুরু করে গ্লোবাল হ্যান্ডওয়াশিং পার্টনারশিপ। ওই বছরের ১৫ অক্টোবর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একযোগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়।

দিবসটির প্রেক্ষাপটে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বার্তা শুধু হাত ধোয়ার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করলেই হবে না, ঘর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, গণপরিবহনকেন্দ্র ও হাসপাতাল পর্যন্ত সাবান ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, সঠিক সময়ে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ কমাতে পারে। বিপরীতে, হাত ধোয়ার সুযোগের অভাব এবং এ বিষয়ে অবহেলা বাড়িয়ে দিতে পারে প্রতিরোধযোগ্য রোগের ঝুঁকি।

মানুষের হাত প্রতিদিন নানা ধরনের জীবাণুর সংস্পর্শে আসে। শৌচাগার ব্যবহারের পর, শিশুর মল পরিষ্কার করার সময়, কাঁচা খাবার ধরলে কিংবা দূষিত কোনো বস্তু স্পর্শ করলে হাতে রোগজীবাণু লাগতে পারে। পরে সেই হাত দিয়ে খাবার তৈরি বা খাওয়া কিংবা চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করার মাধ্যমে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে পারে। হাত না ধুয়ে অন্য বস্তু স্পর্শ করলেও জীবাণু এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মল দ্বারা দূষিত হাত ও খাবারের মাধ্যমে ডায়রিয়া, কলেরা এবং কিছু পরজীবীজনিত অন্ত্রের সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

বাংলাদেশে ঠিক কত মানুষ নিয়ম মেনে সাবান দিয়ে হাত ধোয় না, তার হালনাগাদ তথ্য জানা যায়নি। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) অনুযায়ী, দেশের মাত্র ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের বাড়িতে পানি ও সাবান বা ডিটারজেন্টসহ হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ, ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের বাড়িতে এ ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় পরিচালিত পুরনো গবেষণায় শৌচাগার ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং খাবার তৈরির আগে হাত পরিষ্কারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে।

কোভিড-পরবর্তী ঢাকার ১৩টি হাসপাতালের টয়লেটের পরিস্থিতি জানতে একটি সমীক্ষা চালায় আইসিডিডিআরবি। তাতে দেখা গেছে, ২ হাজার ৪৫৯টি টয়লেটে একসঙ্গে সাবান-পানি ছিল না। তার মানে এসব টয়লেট ব্যবহারের পর হাত জীবাণুমুক্ত করার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এ ছাড়া বিভিন্ন রেস্তোরাঁয়ও সব সময় সাবান থাকে না। এসব তথ্য বলছে, হাত ধোয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সঠিক সময়ে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব সঠিক হাতের স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতের মাধ্যমে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের সর্বশেষ বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালেও বিশ্বের ১৭০ কোটি মানুষ বাড়িতে হাত ধোয়ার মতো মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি সেবা থেকে বঞ্চিত ছিল। তাদের মধ্যে ৬১ কোটি ১০ লাখ মানুষের হাত ধোয়ার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। অর্থাৎ, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী উপায়গুলোর একটি জানা থাকলেও বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে তা চর্চার ন্যূনতম সুযোগ নেই।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, হাত ধোয়ার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাত জীবাণুমুক্ত না থাকলে হাতের মাধ্যমে বহু জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। হাত ধোয়ার অভ্যাস করা গেলে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।

ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, সাবান ও পানি দিয়ে হাতধোয়ার মাধ্যমে ডায়রিয়ার ঘটনা প্রায় ৩০ শতাংশ এবং তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ প্রায় ১৭ শতাংশ কমানো সম্ভব। সংস্থা দুটির হিসাব অনুযায়ী, হাতের স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার মাধ্যমে বছরে প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার মৃত্যু প্রতিরোধের সম্ভবনা রয়েছে।

ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, হাতের স্বাস্থ্যবিধি শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় নয়। হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী রোগীকে স্পর্শ করার আগে-পরে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সময় হাত পরিষ্কার না করলে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে। স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট সংক্রমণ রোগীর ভোগান্তি, চিকিৎসার সময় ও ব্যয় বাড়াতে পারে। পাশাপাশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলাকেও কঠিন করে তুলতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সাবান, পানি, হাত শুকানোর উপকরণ ও হ্যান্ড রাবের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একইভাবে স্কুল, বাজার, বাস ও রেলস্টেশনসহ জনসমাগমপূর্ণ স্থানে হাত ধোয়ার উপযোগী ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। শুধু দিবস উপলক্ষে প্রচার চালিয়ে থেমে গেলে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসবে না; নিয়মিত নজরদারি, অর্থায়ন এবং দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। মানুষকে সচেতন করতে হবে। স্কুলে স্কুলে শেখাতে হবে। মানুষকে জানাতে হবে এর ক্ষতিকর দিকগুলো।

ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের নির্দেশিকা অনুযায়ী, দৈনন্দিন জীবনে পাঁচটি সময়ে হাতের স্বাস্থ্যবিধির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এগুলো হলো খাবার তৈরি করার আগে, খাওয়ার আগে বা অন্যকে খাওয়ানোর আগে, শৌচাগার ব্যবহারের পর বা মলের সংস্পর্শে আসার পর, কাশি-হাঁচি বা নাক পরিষ্কারের পর এবং হাত দৃশ্যত ময়লা হলে।

সাবান ও পরিষ্কার প্রবাহমান পানি দিয়ে হাতধোয়ার সময় হাতের তালু, পিঠ, আঙুলের ফাঁক, বুড়ো আঙুল এবং নখের চারপাশ ভালোভাবে ঘষে অন্তত ২০ সেকেন্ড পরিষ্কার করতে হবে। এরপর পানি দিয়ে সাবান ধুয়ে ফেলতে হবে এবং পরিষ্কার তোয়ালে বা উপযুক্ত পদ্ধতিতে হাত শুকিয়ে নিতে হবে। হাতধোয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণত ৪০ থেকে ৬০ সেকেন্ড সময় লাগে।

শুধু পানি দিয়ে হাত ধোয়ার তুলনায় সাবান ও পানি ব্যবহার বেশি কার্যকর। কারণ, সাবান হাতের তেলচিটে ময়লা ও জীবাণু আলগা করে এবং হাত ঘষার মাধ্যমে সেগুলো দূর করতে সাহায্য করে। যেখানে সাবান ও পানি নেই, সেখানে হাত দৃশ্যত ময়লা না হলে অন্তত ৬০ শতাংশ অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড রাব ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে হাত দৃশ্যত ময়লা থাকলে সাবান-পানিতে ধোয়া উপযুক্ত।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, হাতধোয়ার অভ্যাস অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, সংক্রমণ কম হলে কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজনও কমে। তবে হাত ধোয়া একাই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের সমাধান নয়; সঠিক রোগনির্ণয়, প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে ওষুধ গ্রহণও জরুরি।

আইসিডিডিআরবির ওই সমীক্ষার উদাহরণ টেনে জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, হাসপাতালের টয়লেটে সাবান থাকে না। এটা দুঃখজনক। বলা হয় চুরি করে নিয়ে যায়। কিন্তু চুরি যাতে ঠেকানো যায়, সেই ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। একজন হাসপাতালের টয়লেট ব্যবহার করল, আর সাবান দিয়ে হাত ধুতে পারল না। তাহলে কী হবে? তিনি যেখানে যেখানে যাবেন, তার ওই হাত সব জায়গায় জীবানু ছড়াতে থাকবে।

তিনি বলেন, পরিষ্কার হাত সংক্রমণ প্রতিরোধের কার্যকর উপায়, কিন্তু সবার জন্য সেই সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। সাবান ও পানির সহজলভ্যতা, সঠিক সময়ে হাতধোয়ার অভ্যাস এবং জনপরিসরে স্বাস্থ্যবিধির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিরোধযোগ্য বহু অসুস্থতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। হাতধোয়া হোক প্রতিদিনের অভ্যাস, আর পরিচ্ছন্নতার সুযোগ হোক সবার অধিকার।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত