নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলে এবার সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন ভারতের বিরোধী দলগুলোর নেতারা। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (এসআইআর) স্থগিত করা থেকে শুরু করে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া পর্যন্ত ১০টি দাবি জানিয়ে আদালতে আবেদন করেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। আবেদনে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কারণ প্রকাশ, স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন এবং নাম বাদ দেওয়ার আগে ভোটারদের নোটিস দেওয়া ও শুনানির সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। গত সোমবার দিল্লিতে বিরোধী জোট ইন্ডিয়া ব্লকের বিক্ষোভ মিছিল শেষে সুপ্রিম কোর্টে যান রাহুল গান্ধীসহ বিভিন্ন দলের নেতারা।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাহুল গান্ধী আদালতে পৌঁছাতে না পারায় তার পক্ষে আইনজীবী এস প্রসন্ন আবেদনটি জমা দেন। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে আবেদনটি ‘রাহুল গান্ধী বনাম ভারতের নির্বাচন কমিশন’ নামে তালিকাভুক্ত হয়েছে। বিক্ষোভ মিছিলে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী যাদবসহ বিভিন্ন দলের নেতারা।
রাহুল গান্ধীর ১০ দাবি হলো : এক. এসআইআর-সংক্রান্ত সব নথি আদালতে জমা দিতে হবে। প্রক্রিয়াটি শুরুর সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত সব নথি, বৈঠকের কার্যবিবরণী, চুক্তি ও আপত্তির তথ্য তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। দুই. এসআইআর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ এবং ২০২৩ সালের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্ত ও মেয়াদ) আইনের ১৮ নম্বর ধারা মেনে নেওয়া হয়েছে কি না তা যাচাইয়ের আবেদন করা হয়েছে। তিন. ভোটার তালিকা তৈরি ও সংশোধনের ক্ষেত্রে সংবিধান বা আইন লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। চার. এসআইআর-সংক্রান্ত আবেদন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে নির্বাচন কমিশনকে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, কমিশনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের লিখিত রেকর্ড রাখা এবং ২০২৩ সালের আইনের ১৮ নম্বর ধারা অনুসরণ নিশ্চিত করার আবেদন করা হয়েছে। পাঁচ. ভোটার তালিকায় নাম তোলার অনলাইন ফর্ম-৬ যেন ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিমালায় নির্ধারিত ফর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সেই নির্দেশ চাওয়া হয়েছে।
ছয়. সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন তদন্ত ও নিরীক্ষা কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। কমিটিতে প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের রাখার প্রস্তাবও রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এ কমিটি এসআইআরের সময় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও সংশোধনের ঘটনা তদন্ত করবে। সাত. ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া সবার নাম বুথভিত্তিক প্রকাশের নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, প্রত্যেক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার কারণ এবং তাদের বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক তথ্য প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে। আট. আইন অনুযায়ী নোটিস দেওয়া এবং শুনানির যুক্তিসঙ্গত সুযোগ না দিয়ে কোনো ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ না দেওয়ার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, পাঞ্জাবসহ যেসব রাজ্যে নির্বাচন সামনে রয়েছে, সেখানে আইন নির্ধারিত শেষ তারিখ পর্যন্ত যোগ্য ব্যক্তিদের ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
নয়. আবেদনে উত্থাপিত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সব রাজ্যে চলমান এসআইআর স্থগিত রাখার জন্য অন্তর্বর্তী নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। দশ. নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখা এবং প্রত্যেক যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় অন্য নির্দেশ দেওয়ার জন্যও আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। মামলার পরিস্থিতি বিবেচনা করে আদালত যে অতিরিক্ত নির্দেশ উপযুক্ত ও প্রয়োজনীয় মনে করবে, তা দেওয়ার অনুরোধ রয়েছে।
তবে, রাহুলের আবেদনে ১৪টি ত্রুটি পেয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তারা। এই আবেদনে আদালত ফি বাবদ ২২০ রুপি কম জমা দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়াও ৯জন আবেদনকারীর অনুমোদনপত্র না থাকা এবং কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের পরিচয়পত্রের অস্পষ্ট ফটোকপিকে ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই গতকাল মঙ্গলবার আবেদনটি শুনানি স্থগিত করা হয়। আবেদনটি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হওয়ার আগে ত্রুটিগুলো সংশোধন করতে হবে আবেদনকারীদের।