আয়নার সামনে বাঁ হাত তুলে ধরলে প্রতিফলিত ছবিটিকে ডান হাত বলেই মনে হয়। দেখতে হুবহু এক, উপাদানও এক, কিন্তু বাস্তবে এক হাতের তালুর ওপর আরেক হাতের তালু উপুড় করে রাখলে তারা কখনোই পুরোপুরি মেলে না। রসায়নের জগতেও এমন কিছু অণু রয়েছে, যাদের এই দর্পণ-প্রতিবিম্ব রূপ বিদ্যমান। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের বলা হয় ‘কাইরাল’ অণু।
আমাদের জীবদেহের সিংহভাগ মৌলিক উপাদান যেমন প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড কিংবা জিনগত কাঠামোর ডিএনএ-আরএনএ শর্করা এক নির্দিষ্ট কাইরাল রূপ দিয়ে গঠিত। এর ফলে কাইরাল অণুর তৈরি ওষুধ যখন শরীরে প্রবেশ করে, তখন তার একটি রূপ হয়তো কোষের গ্রাহকের সঙ্গে ঠিকঠাক খাপ খেয়ে রোগ নিরাময় করে, কিন্তু উল্টো রূপটি কোনো কাজ নাও করতে পারে, এমনকি ডেকে আনতে পারে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। ফলে আধুনিক ওষুধ শিল্পে দীর্ঘদিনের প্রধান লক্ষ্য ছিল কীভাবে গবেষণাগারে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে কেবল প্রয়োজনীয় কাইরাল রূপটি তৈরি করা যায়, বিপরীত রূপটির উৎপাদন ঠেকিয়ে রেখে। ফরাসি বিজ্ঞানী আঁরি কাগান এবং জাপানি বিজ্ঞানী কেনজো সোয়াইয়ের আবিষ্কার এই জটিল কাজটিকে বোঝার ক্ষেত্রে রসায়নকে যুগান্তকারী ভিত্তি এনে দিয়েছে।
আঁরি কাগানের মূল অবদানটি পরিচিত ‘নন-লিনিয়ার ইফেক্ট’ বা অ-সরলরৈখিক প্রভাব নামে। কাইরাল অণু সংশ্লেষণের জন্য বিজ্ঞানীরা বাইরে থেকে যে প্রভাবক ব্যবহার করেন, আগে ধারণা করা হতো সেই প্রভাবকের কাইরাল বিশুদ্ধতা এবং বিক্রিয়ায় উৎপন্ন পদার্থের কাইরাল বিশুদ্ধতা সবসময় একটি সরল অনুপাতে চলবে। সহজ কথায়, প্রভাবকের ভারসাম্য যতটা থাকবে, প্রাপ্ত উৎপাদেও ফলাফল ঠিক ততটাই মিলবে। কাগান প্রমাণ করলেন, এই সম্পর্কটি সবসময় সরলরেখায় চলে না। বিক্রিয়ার ভেতর প্রভাবকের কাইরাল অণুগুলো একা থাকে না; তারা নিজেরা পরস্পরের সঙ্গে জোড় বা দল তৈরি করে। এর ফলে বিক্রিয়ার গতি ও উৎপাদের মানে এক ধরনের অস্বাভাবিক প্রভাব দেখা দেয়। উপযুক্ত শর্ত তৈরি করতে পারলে দেখা যায়, সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ কাইরাল প্রভাবক ছাড়াও বিক্রিয়াটিকে প্রায় একমুখী করে কাক্সিক্ষত রূপটি বিপুল পরিমাণে তৈরি করা সম্ভব। কাগানের এই কাজের ফলে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো প্রভাবকের অণুগুলোর ভেতরের মিথস্ক্রিয়া বুঝতে পারলেন, যা রাসায়নিক শিল্পে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অণু তৈরির পথ সুগম করেছে।
কাগান যেখানে দেখিয়েছেন প্রভাবকের ভেতরকার জটিল পারস্পরিক সমীকরণ, কেনজো সোয়াইয়ের আবিষ্কার সেখানে যুক্ত করেছে এক সম্পূর্ণ নতুন ধারণা ‘অ্যাসিমেট্রিক অটো-ক্যাটালাইসিস’ বা স্বয়ংক্রিয় প্রভাবন। সাধারণত রাসায়নিক বিক্রিয়া চালানোর জন্য বাইরে থেকে কোনো না কোনো প্রভাবক জোগাতে হয়। সোয়াই এমন এক বিক্রিয়া উদ্ভাবন করেন, যেখানে তৈরি হওয়া উৎপাদ নিজেই সেই বিক্রিয়ার সবচেয়ে কার্যকর প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে শুরু করে।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো কাইরাল স্ববিবর্ধন। বিক্রিয়ার শুরুতে যদি একটি রূপের অণু সামান্যতম অনুপাতেও এগিয়ে থাকে, বিক্রিয়াটি যত সামনে এগোয়, উৎপাদ নিজেই নিজেকে প্রভাবক হিসেবে ব্যবহার করে সেই রূপটির সংখ্যা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। বিক্রিয়া শেষে দেখা যায়, সেই সামান্য প্রাথমিক বাড়তি রূপটিই পুরো উৎপাদের সিংহভাগ দখল করে নিয়েছে।
এই আবিষ্কারটি কেন বিজ্ঞানীদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ? প্রথমত, রসায়ন গবেষণাগারে ও শিল্পক্ষেত্রে কম উপাদান ব্যবহার করে একক কাইরাল অণু উৎপাদনের সম্ভাবনাকে এটি বহু দূর এগিয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, জীববিজ্ঞানের একটি মৌলিক প্রশ্ন কেন কোটি কোটি বছর আগের আদিম পৃথিবীতে জীবজগৎ কেবল বাঁ-হাতি অ্যামিনো অ্যাসিড আর ডান-হাতি শর্করাকে বেছে নিয়েছিল সেই একক কাইরালিটি বা ‘হোমোকাইরালিটি’ বোঝার তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে সোয়াইয়ের এই স্ববিবর্ধন প্রক্রিয়া একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক মডেল হিসেবে কাজ করে। এটি হয়তো জীবনের আদিম উৎসের চূড়ান্ত জবাব নয়, তবে প্রকৃতি কীভাবে খুব সামান্য কোনো ভারসাম্যহীনতা থেকে সময়ের পরিক্রমায় একটি সুনির্দিষ্ট রূপকে প্রভাবশালী করে তুলতে পারে, তার এক বাস্তবসম্মত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ।
কাগান ও সোয়াইয়ের গবেষণা আধুনিক বিজ্ঞানকে দেখিয়েছে, অণুর ক্ষুদ্র জগতের নিয়মগুলো সরল নয়; কিন্তু সঠিক নিয়মে তাদের চালনা করতে পারলে একমুখী ও নিরাপদ রাসায়নিক বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব।