গবেষণাগারের নিভৃত টেবিলে দশকের পর দশক একনিষ্ঠভাবে বসে থাকা গবেষকের দৃষ্টি সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না। বিজ্ঞানের বড় বাঁকগুলো প্রায়ই আসে এমন কিছু প্রশ্ন থেকে, যা সমসাময়িকদের কাছে হয়তো অবান্তর বা প্রান্তিক মনে হয়েছিল। আধুনিক রসায়নের মানচিত্রে ফরাসি বিজ্ঞানী আঁরি কাগান এবং জাপানি বিজ্ঞানী কেনজো সোয়াই ঠিক সেই ঘরানার দুই গবেষক। তাদের কাজ কেবল গবেষণার প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে নাড়া দেয়নি, বরং অজৈব রাসায়নিক বিক্রিয়া ও জৈবিক শৃঙ্খলার মধ্যকার অদৃশ্য সাঁকোটিকে স্পষ্ট করেছে।
১৯৩০ সালে প্যারিসে জন্ম নেওয়া আঁরি কাগানের শিক্ষাজীবন গড়ে উঠেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ফরাসি একাডেমিক আবহে। ১৯৫৮ সালে কোলেজ দ্য ফ্রঁস থেকে জঁ জাকের অধীনে ডক্টরেট শেষ করার পর তিনি জৈব রসায়নের গভীরের দিকে নজর দেন। ১৯৬৮ সালে তিনি যোগ দেন প্যারিস-সুদ বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমানে প্যারিস-স্যাকলে)। সে সময় অণুর ত্রিমাত্রিক বিন্যাস বা স্টেরিওকেমিস্ট্রি নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বাড়ছিল, কিন্তু পরীক্ষাগারে নির্দিষ্ট একটি গঠন তৈরি করা ছিল অত্যন্ত দুঃসাধ্য। কাগান বুঝতে পেরেছিলেন, অণুকে নিজের মতো রূপ নিতে বাধ্য করতে হলে প্রভাবকের নকশায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।
১৯৭১ সালে কাগান উদ্ভাবন করেন ‘ডিআইওপি’ (উওঙচ) নামের একটি দ্বি-দন্তী কাইরাল ফসফিন লিগ্যান্ড। এটি ছিল এমন এক কাঠামো, যা প্রথাগতভাবে পাওয়া যায় এমন প্রাকৃতিক উপাদান টার্টারিক অ্যাসিড থেকে খুব সহজে সংশ্লেষণ করা যেত। ডিআইওপির সাফল্য বিশ্বজুড়ে রসায়নবিদদের দেখাল যে সমগোত্রীয় ক্যাটালাইসিসে জটিল জৈব কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু কাগানের আসল বিজ্ঞানী-সত্তা উন্মোচিত হয় আশির দশকে। তখন ল্যাবরেটরিতে তিনি লক্ষ্য করেন, প্রভাবকের উপাদান ও উৎপন্ন পণ্যের গঠনের মধ্যকার ফলাফল সবসময় সরাসরি মেলে না। অধিকাংশ গবেষক এমন ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারের বিচ্যুতি বলে বিষয়টিকে এড়িয়ে যেতেন। কাগান তা না করে বিষয়টি নিয়ে গভীরে নামেন এবং বের করে আনেন ‘নন-লিনিয়ার ইফেক্ট’। কাগান প্রমাণ করেন, প্রভাবকের অণুগুলো বিক্রিয়ার ভেতরে স্বাধীনভাবে থাকে না; তারা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জটিল ডাইমার বা বহুপাক্ষিক রূপ তৈরি করে। ফলে গাণিতিক নিয়মের বাইরে গিয়ে বিক্রিয়ার গতিপথ পুরোপুরি বদলে যায়। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের মতো করে রাসায়নিক বিক্রিয়াকে নিখুঁত গাণিতিক সমীকরণ ও মেকানিজমে বিশ্লেষণ করার এই দক্ষতাই কাগানকে তার সময়ের অন্যতম দূরদর্শী তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
কাগান যখন ফ্রান্সে অণুর আচরণকে গাণিতিক নিয়মে বাঁধছিলেন, জাপানের তরুণ রসায়নবিদ কেনজো সোয়াই তখন সম্পূর্ণ নিজস্ব এক ভাবনার জগৎ তৈরি করছিলেন। ১৯৫০ সালে জন্ম নেওয়া সোয়াই ১৯৭৯ সালে টোকিও বিশ^বিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার শিক্ষক ছিলেন জাপানের জৈব রসায়নের পুরোধা তেরুয়াকি মুকাইয়ামা। মুকাইয়ামার গবেষণাগারে কাজ করার দিনগুলো সোয়াইয়ের ভেতরে একটি শৃঙ্খলা তৈরি করে দিয়েছিল প্রতিষ্ঠিত পাঠ্যবইকে চ্যালেঞ্জ করা এবং রাসায়নিক উপাদানের ক্ষুদ্রতম পরিবর্তনকে তীক্ষè দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করা। ১৯৮১ সালে টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হয়ে সোয়াই নিজের স্বাধীন গবেষণাগার গড়ে তোলেন।
সোয়াইয়ের আগ্রহ ছিল একটি গভীর ধারণাগত প্রশ্নে : একটি অণু কি বিক্রিয়ার ভেতর নিজেই নিজের জন্মের পথ প্রশস্ত করতে পারে? রসায়নে বাইরে থেকে প্রভাবক দেওয়ার নিয়মটাই ছিল চিরন্তন। কিন্তু সোয়াই খুঁজছিলেন স্বয়ংক্রিয়তা। দীর্ঘ দেড় দশকের নিরবচ্ছিন্ন ও সূক্ষ্ম পরীক্ষার পর ১৯৯৫ সালে তিনি প্রকাশ করেন তার ঐতিহাসিক আবিষ্কার, যা আজ ‘সোয়াই বিক্রিয়া’ নামে খ্যাত। পাইরিমিডিন অ্যালকোহল তৈরির প্রক্রিয়ায় তিনি প্রমাণ করেন, উৎপন্ন কাইরাল অণুটি নিজেই বিক্রিয়ায় প্রভাবকের ভূমিকা পালন করছে। তার এই অটো-ক্যাটালাইসিস পদ্ধতিতে গবেষকরা দেখলেন, শুরুতে থাকা সামান্যতম কাইরাল ভারসাম্যহীনতা বিক্রিয়া চলাকালে নিজে থেকেই বহুগুণ বিবর্ধিত হয়ে ওঠে। সোয়াইয়ের ল্যাবের কাজ ছিল অবিশ্বাস্য রকমের সংবেদনশীল; সামান্য আলোর উপস্থিতি কিংবা স্ফটিকের সংস্পর্শ কীভাবে বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তা তিনি বছরের পর বছর নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন।
আঁরি কাগান ও কেনজো সোয়াই দুজনের গবেষণার ভূগোল ও সংস্কৃতি আলাদা হলেও তাদের বৈজ্ঞানিক দর্শনে একটি স্পষ্ট মিল ছিল। দুজনেই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে সেই সূক্ষ্ম ব্যতিক্রমগুলোকে খুঁজেছেন, যা অন্যরা হয়তো বাতিল করে দিত। কাগান রসায়নবিদদের শিখিয়েছেন প্রভাবকের ভেতরের জটিল পারস্পরিক ক্রিয়া বুঝতে; আর সোয়াই দেখিয়েছেন কীভাবে একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া নিজে থেকেই নিজের গঠনকে বিবর্ধিত করতে পারে। সমকালীন রসায়ন আজ যে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কাইরাল অণু সংশ্লেষণ করতে পারছে, তার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে এই দুই বিজ্ঞানীর দীর্ঘ, একনিষ্ঠ গবেষণার পথ ধরে।