শিবালয়ে জেলেদের চাল কম দেওয়ার অভিযোগ, হেনস্তার শিকার সাংবাদিকেরা!

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নে মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় জেলেদের মধ্যে সরকারি চাল বিতরণে ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ইউনিয়ন পরিষদে চাল বিতরণের সময় কয়েকজন সুবিধাভোগীর চাল মেপে ২৫ কেজির পরিবর্তে ২২ কেজি পাওয়া যায়। এ ঘটনায় তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউপি প্রশাসক ও কয়েকজনের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও হেনস্তার অভিযোগ উঠেছে।

শিবালয় উপজেলার তেওতা ইউনিয়নে মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগীর তালিকায় থাকা জেলেদের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে এ ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জেলের মধ্যে সরকারি চাল বিতরণ করা হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার চাল বিতরণের সময় অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের আচরণে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার তেওতা ইউনিয়ন পরিষদ ভবন থেকে সুবিধাভোগীদের মধ্যে ২৫ কেজি করে সরকারি চাল বিতরণ করা হচ্ছিল। স্থানীয় পদ্ধতিতে বালতি দিয়ে চাল মাপার সময় ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ পেয়ে ঘটনাস্থলে যান স্থানীয় সাংবাদিকেরা। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর ইউপি প্রশাসক ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান ক্ষুব্ধ হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তিনি সাংবাদিকদের কাছে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেখতে চান। সাংবাদিকেরা নিজেদের পরিচয়পত্র দেখান এবং তাঁদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড নেই বলে জানান। এরপরও তথ্য দিতে রাজি না হওয়ার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় পর্যায়ে সরকার অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ইস্যু করে না—সাংবাদিকেরা এ কথা জানালে কয়েকজন ইউপি সদস্য ও স্থানীয় ব্যক্তি তাঁদের হেনস্তা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

সাংবাদিকেরা তথ্য জানতে চাইলে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড দেখাতে না পারার বিষয়টি তুলে ধরে মাহবুবুর রহমান উত্তেজিত হয়ে ভিডিও করার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সংবাদকর্মীরা ফোনে জেলা প্রশাসককে বিষয়টি জানান। কিছুক্ষণ পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। এরই মধ্যে চাল বুঝে পাওয়া অনেক সুবিধাভোগীকে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের সামনে থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুনরায় চাল বিতরণের নির্দেশ দেন।

সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহলের দাবি, এ ইউনিয়নে অতীতে কয়েকজন চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, স্থানীয় নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির ইন্ধনে মৎস্যজীবী নন—এমন অনেকের নাম সুবিধাভোগীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মতে, ইউনিয়নটিতে প্রকৃত জেলের সংখ্যা প্রায় ৩০০।

আলোকদিয়া গ্রামের মো. ইউনুছ আলী মোল্লা বলেন, তিনি গত তিন বছর ধরে জেলে কার্ডের বিপরীতে সরকারি চাল পেয়ে আসছেন। এবার তাঁর ২৫ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও পেয়েছেন ২২ কেজি। চাল দেওয়ার সময় কম থাকার বিষয়টি জানালে বিতরণকারীরা চালের পরিমাণ সঠিক বলে দাবি করেন।

গান্ধাইর গ্রামের শামিন মোল্লা বলেন, ২৫ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও তাঁকে ২২ কেজি দেওয়া হয়েছে। চাল নেওয়ার সময় কম থাকার কথা জানালে বিতরণকারীরা মেপে দেখতে বলেন। পরে মেপে দেখা যায়, চালের পরিমাণ ২২ কেজি। তাঁর দাবি, এভাবে আরও অনেক সুবিধাভোগী কম চাল পেয়েছেন।

নাম ও পদবি প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বিএনপির এক নেতা বলেন, চাল কম দেওয়ার অভিযোগ শুনে তিনি ঘটনাস্থলে যান। চাল বিতরণে নিয়োজিত কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, ইউপি সদস্যদের কথায় চাল কম দেওয়া হয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, এ ইউনিয়নে মাছ শিকার ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা পাঁচ থেকে ছয়শর বেশি নয়। দ্রুত যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত জেলেদের তালিকা তৈরি করা না হলে ভুয়া তালিকার মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় হতে পারে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাথী রানী নিয়োগী বলেন, উপজেলায় মোট ৪ হাজার ৭৩ জন সুবিধাভোগী জেলে রয়েছেন। এর মধ্যে তেওতা ইউনিয়নে তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৬০০ জেলের মধ্যে ১ হাজার ৪০০ জনকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতিতে চাল বিতরণের নিয়ম রয়েছে। বৃহস্পতিবার তেওতা ইউনিয়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার বিশেষ কারণে উপস্থিত থাকতে পারেননি। এ কারণে নতুন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চাল কম দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও তিনি জানান।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ইউপি প্রশাসক মাহবুবুর রহমানের কাছে চাল কম দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান, কোন জেলে কম চাল পেয়েছেন। এমন কেউ থাকলে ইউপি সদস্যদের উপস্থিতিতে তাঁকে ডেকে এনে বাকি চাল দিয়ে দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তাঁর দাবি, নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম চাল দেওয়ার সুযোগ নেই।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার বলেন, কোনো সুবিধাভোগী জেলে কম চাল পেয়ে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত