মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। পূজার এই আয়োজনকে ঘিরে মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে নানা প্রস্তুতি। পাশাপাশি পূজামণ্ডপে ঢাক বাজানোর জন্য ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রী দল খুঁজছেন আয়োজকেরা। এই ব্যস্ততাকে কেন্দ্র করেই কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে বসেছে দুই দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট। ঢাকের বাদ্য আর সানাইয়ের সুরে পুরান বাজার এলাকায় বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেল থেকে শুরু হওয়া এই হাটে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জড়ো হয়েছেন দুই শতাধিক বাদকদল। বিক্রমপুর, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শিল্পীরা সঙ্গে এনেছেন ঢাক, ঢোল, কাঁসি, সানাই, করতাল, খঞ্জনি, মন্দিরা ও বাঁশিসহ নানা ধরনের বাদ্যযন্ত্র। দুই থেকে তিন দিন ধরে চলবে এই আয়োজন।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) পুরান বাজারের হাট ঘুরে দেখা যায়, প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে বাদ্যযন্ত্রীদের ব্যস্ততা। কোথাও ঢাকের তালে চলছে বাদ্য পরিবেশনা, কোথাও সানাইয়ের সুরে থমকে দাঁড়াচ্ছেন দর্শনার্থীরা। অন্যদিকে, দল বেঁধে বাজনা শুনছেন পূজা আয়োজকেরা। পছন্দের বাদকদল নির্বাচন, পারিশ্রমিক নিয়ে দরদাম এবং চুক্তি—সব মিলিয়ে হাটজুড়ে চলছে কর্মচাঞ্চল্য।
তবে নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। মূলত দুর্গাপূজার বিভিন্ন মণ্ডপে বাদ্য পরিবেশনের জন্য ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রী দল নির্বাচন করা হয় এই হাট থেকে। শিল্পীরা নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরেন। আর পূজা আয়োজকেরা তাঁদের বাজনা শুনে এবং দরদাম মিলিয়ে পছন্দের দল চূড়ান্ত করেন।
দলের সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্রের ধরন ও শিল্পীদের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে চুক্তির অর্থের পরিমাণ। ঢাকিদের জনপ্রতি পারিশ্রমিক চাওয়া হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ঢাক, কাঁসর ও সানাইসহ পূর্ণাঙ্গ বাদ্যযন্ত্রী দল নিতে খরচ পড়ছে এক লাখ টাকারও বেশি।
বিক্রমপুর থেকে আসা ঢাকি পরিমল দাস বলেন, ‘ফোনে অনেকে যোগাযোগ করেছিলেন, কিন্তু আসিনি। এই হাটে না এলে মন মানে না। অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, এই আনন্দটাই আলাদা। ৩০ হাজার টাকা চেয়েছি। দরদাম চলছে, কমবেশি করে চলে যাব।’
কুমিল্লা থেকে ১০ সদস্যের দল নিয়ে এসেছেন কাজল মণিঋষি। পুরো দলের জন্য এক লাখ ২০ হাজার টাকা চুক্তিমূল্য চাইলেও এখনো দরদাম চলছে। কাজল মণিঋষি বলেন, ‘লাখের কম হলে বাজাতে যাব না।’
ঢাকের হাটের আকর্ষণ শুধু দুর্গাপূজার আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ঢাক-ঢোল ও সানাইয়ের সুর উপভোগ করতে এখানে ভিড় করছেন বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষ। ফলে এই আয়োজন হয়ে উঠেছে স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ।
স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এই হাট এখন আর কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের আয়োজন নয়। ঢাক-ঢোলের সুর শুনতে সবাই আসেন। এটি এখন আমাদের এলাকার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ।’
কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, হাটে ক্রেতা-বিক্রেতারা যাতে নির্বিঘ্নে কেনাবেচা করতে পারেন, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সচেতন রয়েছে। হাটের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, ঢাক-ঢোলের হাট লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শতবর্ষী এই মেলার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশের টহল দল সক্রিয় রয়েছে।