লোকসান পুষিয়ে নিতে আগাম আলু চাষে ব্যস্ত কৃষকরা

গত বছর আলুর ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আশা, এবার ভালো ফলন ও দাম মিললে ফিরবে লাভ।

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম

গত বছরের লোকসান পুষিয়ে নিতে দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলিতে আগাম জাতের আলু রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। আলু চাষের উপযোগী আবহাওয়া থাকায় ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারে ন্যায্যমূল্য পেলে এবার লাভের আশা করছেন তারা।

তবে সার, বীজ, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা চিন্তিত কৃষকরা। এদিকে আগাম জাতের আলু চাষে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।

প্রতি বছর অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে হিলির খট্টামাধবপাড়া এলাকায় আগাম জাতের আলুর আবাদ শুরু হয়। আগাম জাতের আমন ধান কাটার পর জমি ফেলে না রেখে সেখানে বাড়তি ফসল হিসেবে আলু চাষ করেন কৃষকরা। উর্বর মাটি ও উপযুক্ত আবহাওয়ার কারণে এ অঞ্চলে আলুর ফলন ভালো হয়। পাশাপাশি আগাম আলু বাজারে ওঠায় তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায়। ফলে প্রতিবছরই এ অঞ্চলে আলু চাষ বাড়ছে।

তবে গত বছর আলুর ভালো দাম না পাওয়ায় লোকসানে পড়েন চাষিরা। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার আগাম জাতের আলু চাষে ব্যস্ত তারা। কেউ জমি প্রস্তুত করছেন, আবার কেউ প্রস্তুত করা জমিতে আলু রোপণ করছেন।

খট্টামাধবপাড়া গ্রামের কৃষক মাহফুজুর রহমান বলেন, আগাম জাতের ধান কাটার পর সেই জমিতে আলু চাষ করা হচ্ছে। আলু চাষের জন্য মাটি প্রস্তুত করে বীজ রোপণ করা হচ্ছে। আগাম জাতের আলুতে প্রতি বিঘায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ মণ ফলন পাওয়া যায়। এ আলু বাজারে আগে ওঠায় দামও ভালো পাওয়া যায়, ফলে কৃষকরা লাভবান হন।

কৃষক মাহবুব হোসেন বলেন, আগাম জাতের আলু চাষ করে কৃষকরা বেশ লাভবান হন। এ কারণে ধান কাটার পর এলাকার সবাই মিলে আলু চাষে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার সার, বীজ, শ্রমিকের মজুরি ও জমি চাষের খরচ বেড়েছে। উৎপাদন খরচ বেশি হলেও ভালো ফলন ও দাম পাওয়া গেলে এবার লাভের আশা করছেন তারা।

কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, গত বছর আলু চাষ করে ভালো দাম না পাওয়ায় লোকসান হয়েছে। এ অঞ্চলে আগাম জাতের ধান কাটার পর জমিতে আলু রোপণ করা হয়। আলু তোলার পর একই জমিতে ভুট্টা চাষ করা হয়। এবার বীজ, সার ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেশি হবে। তবে আলুর দাম মণপ্রতি দুই হাজার টাকার বেশি হলে কিছুটা লাভ হতে পারে।

কৃষক ইব্রাহিম বলেন, গত বছর আলু চাষ করে কৃষকদের ব্যাপক লোকসান হয়েছে। তখন প্রতি মণ আলুর দাম ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। এত কম দামে আলু বিক্রি করতে গিয়ে কৃষকদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। বর্তমানে সার, তেল, জমি চাষ ও ওষুধের দাম বেশি হলেও উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কৃষকদের দুর্ভোগ বাড়ছে। গত বছর পাঁচ থেকে ছয় বিঘা জমিতে আলু চাষ করে তাঁর এক থেকে দেড় লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।

কৃষক সিদ্দিক হোসেন বলেন, ধান কাটার পর জমি ফেলে না রেখে তারা সেখানে আলু চাষ করেন। দুই মাসের মধ্যে আলু তোলা যায়। এরপর একই জমিতে অন্য ফসল চাষ করা হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও আলু রোপণ শুরু হয়েছে। বাজারে ভালো দাম পেলে কৃষক লাভবান হন, অন্যথায় লোকসান গুনতে হয়।

কৃষক সেলিম হোসেন বলেন, এ বছর এলাকার বেশির ভাগ কৃষকই আলু চাষে আগ্রহী। তবে গত বছরের তুলনায় বীজের দাম বেড়েছে। গত বছর যে আলুর বীজের দাম ছিল ৮০০ টাকা, এবার তা বেড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। এতে আলু চাষ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ভালো দাম পেলে কৃষক লাভবান হবেন, আর ন্যায্যমূল্য না পেলে এ পেশার প্রতি তাঁদের আস্থা কমে যাবে।

শ্রমিক জাকিরুল ইসলাম বলেন, ধান কাটার পর কোথাও আলু রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, আবার কোথাও চলছে আলু লাগানোর কাজ। এতে তাদের কাজ বেড়েছে। এরপর আলু তোলার কাজ শুরু হবে। সব মিলিয়ে প্রায় দুই মাস আলু চাষের কাজে ব্যস্ততা থাকবে। কাজ বাড়ায় আয়-রোজগারও ভালো হচ্ছে, যা দিয়ে পরিবারের খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে।

শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ধান কাটার পর প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আলুর আবাদ শুরু হয়েছে। তারা এখন আলু রোপণের কাজ করছেন। এ কাজ আরও ১৫ দিন চলবে। এরপর আলু তোলার কাজ শুরু হবে। বছরের পর বছর কৃষিশ্রমিকের কাজ করে যে আয় হয়, তা দিয়েই তাদের জীবনযাপন চলে।

হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে উপজেলায় আগাম জাতের আলু চাষ শুরু হয়েছে। প্রতি মৌসুমেই এ অঞ্চলে আগাম আলুর আবাদ হয়। খট্টামাধবপাড়া ইউনিয়নে গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৮০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলু রোপণ সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কৃষকরা উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতিবছর এ আলুর চাষ করেন। এ জাতের আলুর জীবনকাল কম। মাত্র ৫০ থেকে ৫৫ দিনের মধ্যে আলু তোলা যায় এবং ফলনও ভালো হয়। আগাম আলুর ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা প্রতি মৌসুমেই এ জাতের আলু চাষ করেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করে চাষাবাদ করলে এবারও কৃষকরা ভালো ফলন পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত