জর্ডানে গির্জায় বন্দুকধারীদের হামলায় নিহত ৭

জানাজায় অংশ নিতে গির্জায় জড়ো হয়েছিলেন মানুষ। সেখানেই বন্দুকধারীদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত সাতজন। আহত হয়েছেন আরও ৪০ জন। এ ঘটনায় দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০০ এএম

জর্ডানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কারাক প্রদেশের হমুদ শহরে একটি গির্জায় বন্দুকধারীদের গুলিতে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৪০ জন। দেশটিতে এ ধরনের হামলার ঘটনা বিরল। নজিরবিহীন এ হামলায় হতবাক হয়ে পড়েছেন জর্ডানের মানুষ। খবর সিএনএন’র।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির জননিরাপত্তা সংস্থা জানায়, হামলাকারীদের এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। তাদের পরিচয়ও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, একটি জানাজায় অংশ নেওয়া খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করে সন্ত্রাসী হামলাটি চালানো হয়।

জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ এ হামলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘জর্ডানিদের রক্ত অমূল্য। যারা এই দেশের বিরুদ্ধে অপরাধ করবে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর হাতে ব্যবস্থা নেব।’

দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাফর হাসান বলেছেন, হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনতে সরকারের সব সংস্থা কাজ করছে। জর্ডানের সরকারি সংবাদ সংস্থা পেত্রার বরাতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

হামলার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারাকে যা ঘটেছে, তা অন্যদের ধর্মবিশ্বাস অস্বীকার করে অবিশ্বাসী ঘোষণা করার উগ্র সন্ত্রাসী মতাদর্শের ফল। সমাজকে এ ধরনের পথে এগিয়ে যেতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

দিনভর নতুন তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের সংখ্যা কয়েকবার সংশোধন করা হয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত আল-মামলাকা টেলিভিশনকে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, হামলাকারীদের একজনের হাতে ছিল একে-৪৭ কালাশনিকভ রাইফেল। কয়েক মিনিট ধরে গুলিবর্ষণ চলে।

সিএনএনকে আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, হামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে চলে। এ সময় বন্দুকধারীরা ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করছিলেন। গির্জার যে উঠানে বেশির ভাগ মানুষ দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখানেই হামলাকারীরা গুলি চালান।

ওই নারী বলেন, ‘এটি ছিল একটি হত্যাযজ্ঞ। আমি ভাবতেই পারিনি যে জীবিত অবস্থায় সেখান থেকে বের হতে পারব।’ প্রাণ বাঁচাতে তাঁকে অন্য শোকাহত ব্যক্তিদের সঙ্গে গির্জার বেদির পেছনে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, ‘যারা প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোক জানাতে জড়ো হয়েছিলেন, তাদের ওপরই হামলা চালানো হয়েছে। জর্ডানের কোথাও এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তা আমি কখনো কল্পনাও করিনি।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নিরাপত্তা ক্যামেরার ভিডিওতে তিনজন বন্দুকধারীকে রাস্তায় গুলি চালাতে দেখা যায়। পরে তাদের গির্জার দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়।

কারাকের ওই শহরে শত শত বছর ধরে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। শুক্রবার সেন্ট জর্জের গ্রিক অর্থোডক্স গির্জায় সম্প্রদায়ের এক সদস্যের মৃত্যুতে শোক জানাতে জড়ো হয়েছিলেন স্বজন ও পরিচিতজনেরা।

প্রত্যক্ষদর্শী তামের হালাসা আল-মামলাকা টেলিভিশনকে বলেন, গির্জার বাইরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে ছিলেন। এর মধ্যে একটি গাড়ি থেকে দুজন নেমে গুলি চালাতে শুরু করেন।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার সময় গির্জার ভেতরে কয়েক ডজন মানুষ ছিলেন। হালাসা বলেন, ‘গির্জার ভেতরে ও বাইরে মিলিয়ে আমরা ১৫০ জনের বেশি ছিলাম।’

হামলার নিন্দা, তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক

হামলার পর জর্ডান সরকারের মন্ত্রী ও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা এর তীব্র নিন্দা জানান। দেশটিতে ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এ ধরনের হামলা বিরল। জর্ডানের মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ।

প্রধানমন্ত্রী জাফর হাসান তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন। এ সময় সরকারি ও জনসাধারণের ব্যবহারের সব ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।

হামলার নিন্দা জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের বিভিন্ন পক্ষও। জর্ডানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানায়, কারাকের একটি গির্জায় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের প্রতি মার্কিন জনগণের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে জর্ডানের রাজার প্রতি সংহতি প্রকাশ করে দূতাবাস।

জেরুজালেমের লাতিন প্যাট্রিয়ার্কেট হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ও স্বজন, হমুদ শহরের বাসিন্দা এবং হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সবার প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।

ইসরায়েল, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, জর্ডান ও সাইপ্রাসে বসবাসরত ক্যাথলিকদের নেতৃত্বদানকারী এ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বলেছে, সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ এবং বিভেদ সৃষ্টির যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জর্ডানের জনগণের জাতীয় ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে।

ইরাক সরকারও হামলার নিন্দা জানিয়েছে। দেশটির বিবৃতিতে বলা হয়, এ হামলা প্রমাণ করে যে সন্ত্রাসবাদ একটি গভীর অশুভ শক্তি। ইরাকের জনগণও অতীতে এর শিকার হয়েছে এবং দৃঢ়তা ও শক্তির সঙ্গে এর মোকাবিলা করেছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সমাজের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে এবং সামাজিক শান্তি নষ্ট করে—এমন সব শক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায় এ ঘটনা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত