তরুণীদের কপালে টিপ, ঠোঁটে টানা রঙের লিপস্টিক, চুলের বেণীতে শোভা পাচ্ছে ফুলের মালা। অপর দিকে তরুণরাও এসেছেন সেজেগুজে। বিশাল মাঠজুড়ে মেলায় শুধু তরুণ-তরুণীরা ঘুরছেন, কেনাকাটা করছেন। পাশাপাশি জীবনসঙ্গী খুঁজছেন। আর এরই মধ্যে যদি জীবনসঙ্গী পছন্দ হয়ে যায় তাহলে পরিবারিকভাবে ধুমধামে দেওয়া হয় বিয়ে। এমনকি বিয়ের জন্য যাবতীয় জিনিসপত্রের পসরাও সাজিয়ে রাখেন বিক্রেতারা। এমনই ব্যতিক্রমধর্মী মেলার দেখা মিলল দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গণে। প্রায় দুইশ বছর ধরে মাঠ প্রাঙ্গণে আদিবাসীদের এই মিলনমেলাটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। যা এক সময় ‘বউ মেলা’ নামে পরিচিত ছিল।
প্রতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজা বিসর্জনের পরদিন ব্যতিক্রম ধর্মীয় এই মেলার আয়োজন করা হয়। তবে বৃহস্পতিবার গোলাপগঞ্জে বিশাল হাট বসার কারণে মেলাটি শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকে বিদ্যালয়ে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারীসহ আশপাশের জেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা আসতে শুরু করেন। সময় যত বেড়ে যায় ততই বাড়ে লোকজনের সমাগম। দিনব্যাপী এই ব্যতিক্রমধর্মী মেলায় কয়েক হাজার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ আসেন। প্রতি বছর কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই হাজার হাজার মানুষ মেলায় উপস্থিত হন। মেলায় আশপাশের জেলার বিভিন্ন গ্রামের বউ, শাশুড়ি, ননদ, জা ও ঝিরা একত্র হন। মেলা থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তরুণ-তরুণীরা জীবনসঙ্গী বেছে নেন। পরে পরিবারিকভাবে দুই পরিবারের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে বিয়ে হয়।
প্রায় দুইশ বছর ধরে বীরগঞ্জের গোলাপগঞ্জে উপজেলা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির আয়োজনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের এই মিলনমেলাটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। পৌরাণিক কাহিনি রয়েছে, এই মেলায় এসে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা তাদের পছন্দের মানুষকে খুঁজে পরিবারের কাছে তা জানাতেন। পরে দুই পরিবারের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করা হতো। যারা এই মেলায় নিজেরা জীবনসঙ্গী পছন্দ করতেন পরবর্তী বছর মেলায় তাদের নাম-পরিচয় তুলে ধরা হতো। এখনো এই মেলায় অনেকে পরিবারের সম্মতিতে পছন্দের পাত্রপাত্রীকে নিয়ে এসে বিয়ে দিয়ে থাকেন।
প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী ব্যতিক্রমী এই মেলায় এসে জীবনসঙ্গী খুঁজতে পেরে খুশি তরুণ-তরুণী ও তাদের পরিবার। পাশাপাশি এ ধরনের মেলা ভবিষ্যতে চালু করার অনুরোধ তাদের। যুবক হরেন্দ্র রায় বলেন, ‘এই মেলার বিষয়ে অনেকদিন ধরে শুনছি। কিন্তু কোনো দিন আসা হয়নি। এবার পরিবারসহ এসেছি। মেয়েকেও নিয়ে এসেছি। যদি এখানে ছেলে পছন্দ হয় তাহলে কথা বলব। যেহেতু মেয়েকে বিয়ে তো দিতে হবে। মেলাটা দেখে খুব ভালো লাগল।’
তরুণী রাইসা হাসদা বলেন, ‘আমরা পুরো পরিবার মেলায় এসেছি। মেলার বিষয়ে অনেকের মুখে অনেক কথা শুনেছি। কিন্তু আজ বাস্তবে দেখা হলো। খুব ভালো লাগল।’ তরুণী স্বপ্না টুডু বলেন, ‘এখানে অনেক রকমের মানুষ আসে। অনেক বছর ধরে এখানে আসা হয়। এখানে এলে অনেক আত্মীয়-স্বজনেরও দেখা পাওয়া যায়। তাই এখানে প্রতি বছর আসি।’
বীরগঞ্জ আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি জসিম হেমরম বলেন, ‘আমরা দাদা-দাদি, নানা-নানির কাছ থেকে এই মেলার বিষয়ে শুনে আসছি। এই মেলা প্রায় ২০০ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এটি আগে মিলনমেলা নামে পরিচিত ছিল না। আগে দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরের দিন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। তবে এই বছর গোলাপগঞ্জে হাট বৃহস্পতিবার হওয়ায় শুক্রবার এই মেলা অনুষ্ঠিত হলো। ২০ বছর আগে এই মেলার নাম ‘বউ মেলা’ থেকে মিলনমেলা করা হয়। বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী ভারত থেকেও অনেকে মেলায় আসেন। একপ্রকার মিলনমেলায় পরিণত হয়। তাই মেলাটির নাম মিলনমেলা রাখা হয়েছে। মেলায় তরুণ-তরুণীরা তাদের জীবনসঙ্গী পছন্দ করেন। পরে তারা পারিবারিকভাবে বিয়ে করেন।’