ভারতে কি তবে দক্ষিণের বসন্ত চূড়ান্ত রূপ পেতে যাচ্ছে?

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২৯ পিএম

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম দেশ ভারতের ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। ২০২৬ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্যকান্ত বেকার তরুণদের কোকরোচ বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করে যে মন্তব্য করেন, তা ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে অভিজিৎ দ্বীপ তরুণদের জন্য 'কোকরোচ জনতা পার্টি' নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন।

এর উদ্দেশ্য ক্ষমতায় যাওয়া নয়, বরং ক্ষমতাসীনদের ভুলের প্রতিবাদ করা। প্রথম দিকে শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েই জনগণের মধ্যে মূলত অসন্তোষ ছিল। ২০২৬ সালের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সেই ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ধীরে ধীরে তা রাজপথের আন্দোলনে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র ২৫ জুলাই পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

তবে সেই আন্দোলন থেমে থাকেনি। আন্দোলন নতুন গতি পায় যখন ভারতের নির্বাচন কমিশন নতুন ভোটার তালিকা প্রকাশ করে। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা SIR প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। রয়টার্সের ১০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ১৩ কোটি ভোটার সেই তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। শুধুমাত্র দিল্লিতেই প্রায় ৪৭ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন এবং ৩২ লাখ ভোটারকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে সেখানকার প্রায় অর্ধেক ভোটারই তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। উত্তর প্রদেশেও সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো কারণ উল্লেখ না করেই প্রায় ৮৫ হাজার ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়। এরপরই আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। এবারের আন্দোলন নির্বাচন কমিশনের এই স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে।

ভারতীয় আইন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি ও বিরোধী দলীয় নেতা-এই তিনজনের সমন্বয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ হয়। কিন্তু সেখানে প্রধান বিচারপতির বদলে সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগ করা সরকারি দলীয় এক মন্ত্রী। এভাবেই আইনকে তোয়াক্কা না করে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান জ্ঞানেশ কুমার। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাকি দুই নির্বাচন কমিশনার অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন যে তাদের অগোচরে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। খোদ ভেতরেই যখন এত আপত্তি, তখন স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও তরুণদের মধ্যে হতাশা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। রিলায়েন্সের অধীনে রয়েছে নেটওয়ার্ক-১৮-এর মতো বড় মিডিয়া গ্রুপ। ২০২২ সালে আদানি গ্রুপ এনডিটিভি কিনে নেয়। অর্থাৎ বড় সংবাদমাধ্যমের মালিকানা ক্রমেই অল্প কিছু গোষ্ঠীর হাতে চলে যাচ্ছে, যারা অধিকাংশ সময়ই সরকারপক্ষীয় বয়ান তুলে ধরে বলে আন্দোলনরত ভারতীয় তরুণরা দাবি করেন। সুইডিশ সংস্থা ভি-ডেম (V-Dem) ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হ্রাস ও সাংবাদিক হয়রানির কথা উল্লেখ করে মোদি সরকারকে "নির্বাচনভিত্তিক স্বৈরতন্ত্র" বলে অভিহিত করেছে।

ভারতের নির্বাচনী তহবিল নিয়েও তরুণদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। মোদি সরকারের ইলেক্টোরাল বন্ড ব্যবস্থায় কোম্পানি ও ব্যক্তিরা জনসাধারণের কাছে নিজ পরিচয় গোপন রেখে অনুদান দিতে পারতেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর অনুদানের তথ্য প্রকাশিত হলে দেখা যায়, মোট অর্থের অর্ধেক পেয়েছে বিজেপি।

সিজেপির শুরু করা এই আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষ যোগ দিলে মোদি সরকার আন্দোলনকে স্তিমিত করার জন্য কোকরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দ্বীপকে দিল্লির বিমানবন্দর থেকে এবং জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে গুরুগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে। ধ্রুব রাঠির মতো জনপ্রিয় ইউটিউবারের অংশগ্রহণ ও গ্রেপ্তারের খবর আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে। শুধু তাই নয়, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকেও গ্রেপ্তার করা হয়। 

সুতরাং আন্দোলন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে শুধু তরুণরা নয়, বিরোধী দলীয় নেতারাও এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করছেন। দিল্লির বিভিন্ন স্থানে চলাচলের বিধিনিষেধ, মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ, বিক্ষোভস্থলের আশপাশে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপও মোদি সরকার নিয়েছে-ঠিক যেমনটি ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই করেছিলেন স্বৈরাচারী হাসিনা।

বর্তমানে এই আন্দোলন বিশ্লেষণ করলে তিনটি সম্ভাব্য পথ পাওয়া যায়। ১. সরকার কিছু দাবি মেনে নেবে, সংস্কারের উদ্যোগ নেবে, একটি গোষ্ঠী সন্তুষ্ট হবে, ফলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যেতে পারে। ২. নেতৃত্বের উপর চাপ, সংগঠনের অভ্যন্তরীণ মতানৈক্য এবং দীর্ঘদিনের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে। ৩. এরপরও যদি আন্দোলন চলতে থাকে, তাহলে এটি তরুণদের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে বিরোধীদের বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত হবে-এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাম্প্রতিক বামপন্থী শিক্ষার্থী নেত্রী নেহা বোরার আন্দোলন ও নেতৃত্ব সেই বার্তাই দিচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই আন্দোলনের ফলে সরকার কতটা অপ্রস্তুত হতে পারে?
প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে চারটি দিক থেকে. প্রথমত, আন্দোলন কি দিল্লির বাইরেও বিস্তৃত হচ্ছে? দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থী ও তরুণ ভোটারদের সমর্থন কেমন? তৃতীয়ত, বিরোধী দলগুলো কি অভিন্ন কর্মসূচিতে একমত? চতুর্থত, ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কতটা স্বচ্ছতা দিতে পারবে?

ফলাফল যাই হোক না কেন, দক্ষিণ এশিয়ায় যে তরুণ্যের হাওয়া লেগেছে, তার উত্তাপ যে দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং সরকারগুলো তরুণদের দাবির প্রতি অনিচ্ছা সত্ত্বেও একমত হচ্ছে-এই বিষয়টি এই অঞ্চলে জবাবদিহিতাভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে আশা করা যাচ্ছে। 

 

লেখকঃ
মোহাম্মদ ঈসা ইবনে বেলাল, প্রভাষক, লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচলনা বিদ্যা বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় 

রামিসা আনজুম, শিক্ষার্থী,লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যাম্পাস এম্বাসেডর,  নীতি গবেষণা কেন্দ্র।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত