২২ লাখ মানুষের ভরসা, নিজেই সংকটে হাসপাতাল

২৫০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি ৪০০-এর বেশি রোগী, ১০৯ পদ শূন্য; বন্ধ এমআরআই সেবা

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০০ এএম

চায়ের রাজধানী, পাহাড় ও হাওরবেষ্টিত জেলা মৌলভীবাজারের সাতটি উপজেলার প্রায় ২২ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান ভরসা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর জেনারেল হাসপাতাল। তবে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্টসহ প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকটে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে রোগীদের দুর্ভোগ।

জানা গেছে, মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। হাসপাতালটির শয্যাসংখ্যা ২৫০ হলেও ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেন গড়ে ৪০০ জনের বেশি রোগী। বর্তমানে আবহাওয়া পরিবর্তন, ডেঙ্গু ও হামের উপসর্গসহ বিভিন্ন কারণে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। মাঝেমধ্যে দৈনিক ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যায়। ফলে অতিরিক্ত রোগীদের ওয়ার্ডের মেঝেতে আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

হাসপাতালটি ২৫০ শয্যা থেকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার সরকারি পরিকল্পনা থাকলেও এখনো এর কার্যক্রম শুরু হয়নি। এ ছাড়া বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগের রোগীদের প্রয়োজনীয় অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও এখানে করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি অচল থাকা এবং জনবলসংকটের কারণে রোগীদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

হাসপাতালটিতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) রয়েছে। করোনা মহামারির সময় এ দুটি ইউনিটে জেলার বিভিন্ন এলাকার রোগীরা চিকিৎসাসেবা পেলেও বর্তমানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবলের অভাবে সেগুলো প্রায় বন্ধ রয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ৪১২ জন জনবল থাকার কথা। বর্তমানে কর্মরত আছেন ৩০৩ জন। শূন্য রয়েছে ১০৯টি পদ। চিকিৎসকের ৮৪টি পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ৪৫টি। কর্মরত ৩৯ জন চিকিৎসকের মধ্যে একজন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। এ ছাড়া দুজন চিকিৎসক স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করেছেন।

নার্স ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারীর ১৯০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৬৯ জন। শূন্য রয়েছে ২১টি পদ। তৃতীয় শ্রেণির ৫৫টি পদের মধ্যে কর্মরত ৩৯ জন এবং শূন্য ১৬টি পদ। চতুর্থ শ্রেণির ২২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৯ জন। শূন্য রয়েছে ১৩টি পদ। এ ছাড়া চতুর্থ শ্রেণির আউটসোর্সিংয়ের ৬১টি পদের মধ্যে কর্মরত ৪৭ জন এবং শূন্য ১৪টি পদ। টেকনোলজিস্টদের ১৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৯ জন। শূন্য রয়েছে পাঁচটি পদ।

জনবল ও রিএজেন্টের সংকটে সপ্তাহে চার দিন আলট্রাসনোগ্রাফি, তিন দিন এক্স-রে এবং দুই দিন সিটি স্ক্যান সেবা চালু থাকে। তবে এমআরআই সেবা বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ। ডায়ালাইসিস সেবায়ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যের সংকট রয়েছে। ফলে অনেক রোগীকে বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে বেশি খরচে এসব পরীক্ষা ও সেবা নিতে হচ্ছে। হাসপাতালে নিয়মিত এসব সেবা চালু থাকলে রোগীরা তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসা নিতে পারতেন এবং তাঁদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ কমত।

হাসপাতালের অপর একটি সূত্র জানায়, ২০১৯ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে রক্ত পরীক্ষার জাপানি মেশিন, এমআরআই মেশিনসহ মোট ২৭টি যন্ত্র সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে এমআরআই মেশিনটি পরীক্ষা করে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ফিলিপসের টেকনিশিয়ানরা সেটিকে সম্পূর্ণ অকেজো ঘোষণা করেছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) মৌলভীবাজার জেলা শাখার সভাপতি ডা. সাদিক আহমেদ বলেন, মৌলভীবাজারবাসী দীর্ঘদিন ধরে একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনও হয়েছে। তবে এখনো কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। তিনি আরও বলেন, জেলা সদর হাসপাতালকে ২৫০ শয্যা থেকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার সরকারি পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে জেলার রোগীদের দুর্ভোগ কমবে। দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার পাশাপাশি জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি জানান তিনি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রণয় কান্তি দাস বলেন, হাসপাতালটি মূলত তিন শিফটে পরিচালিত হয়। ২৫০ শয্যার একটি হাসপাতালে যে পরিমাণ জনবল থাকার কথা, সেখানে ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি যন্ত্রপাতির সংকটও আছে। সীমিত জনবল নিয়েই তাঁরা নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে খুব শিগগিরই জনবলসংকট কেটে যাবে বলে তাঁরা আশাবাদী।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত