ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে নেই বাজারের প্রকৃত চিত্র

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪২ এএম

প্যাকেটের প্রতি কেজি চিনির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১১০ টাকা। কিন্তু মুদি দোকানগুলোতে চিনি কিনতে গেলে ভোক্তাকে দাম গুনতে হচ্ছে ১২০ টাকা। একই অবস্থা বোতলজাত সয়াবিন তেলের দামেও। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হলেও খুচরা বাজারে ২১০ টাকার কমে তেল বিক্রি হচ্ছে না। কারণ হিসেবে বিক্রেতারা জানিয়েছেন, সরবরাহকারীরা তেল-চিনি সরবরাহ করছেন সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যে, যেখানে বিক্রেতার কমিশন নামমাত্র। ফলে বাধ্য হয়েই বেশি দাম দিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে। রোজা উপলক্ষে সম্প্রতি নিত্যপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সরবরাহকারী, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে, রমজানকেন্দ্রিক বাড়তি চাহিদার পণ্যগুলোর বর্তমান ও সামনের দিনগুলোর অবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছে। সেই আলোচনা যেসব তথ্যকে সামনে রেখে করা হচ্ছে সেখানে বর্তমান বাজারের অস্থিরতার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে না।

এসব বৈঠকে তেল, চিনি, খেজুরসহ বেশ কিছু পণ্যের ওপর বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন বরাবরের মতোই বর্তমান বাজারদর, শুল্কস্তর, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে। গত সোমবার অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তেল ও চিনির বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাজারে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২০৪ টাকায়, অথচ বাজারে সুপার শপগুলো ছাড়া অধিকাংশ মুদি দোকানেই এই তেল ২১০ টাকার নিচে নেই। একইভাবে বলা হয়েছে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায়। অথচ বাজারে নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য থাকার পরও প্রতি কেজিতে বাড়তি ১০ টাকা গুনতে হচ্ছে ভোক্তাকে।

এর আগে বিভিন্ন দেশের দরের সঙ্গে তুলনা করে মাল্টাসহ বিভিন্ন ফলের বাজারদর দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। গত ৩ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল প্রতি কেজি মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ৩২০ টাকায়। অথচ সে সময় বাজারে মাল্টার দাম ছিল ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকা। সাধারণ মানের খেজুরের দাম কমিশন দিয়েছিল ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। অথচ গত এক বছরের বেশি সময় ধরে বাজারে ২৫০ টাকায় কোনো খেজুর বিক্রি হচ্ছে না।

বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, স্থানীয় বাজারে ভোজ্য তেল ও চিনির দাম স্থিতিশীল রয়েছে, যা ট্যারিফ কমিশনের উপস্থাপিত তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বলা হয় এবং গণ্যমাধ্যমে তা পাঠানো হয়।

অথচ অন্যান্য বছরের তুলনায় পণ্য দুটির আমদানি ও সরবরাহের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় বেশি। তবে বাজারের প্রকৃত চিত্র তুলে না ধরলেও কমিশন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতার তথ্য দিয়েছে। এ পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে এ জন্য, কোম্পানিগুলো যাতে এসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে নিতে পারে। বাজারেও ব্যবসায়ীরা তেল-চিনির সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন তুলে দিয়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে তারা মন্ত্রণালয়কেও তেলের দাম বাড়ানোর জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছে।

কমিশনের পর্যবেক্ষণে চিনিতে উচ্চহারে শুল্ক, তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে দামবৃদ্ধির প্রবণতাকে তুলে ধরে কোম্পানিগুলোর বাড়তি দাম পাওয়ার অধিকারকে নিশ্চিত করার মতো ইঙ্গিত থাকলেও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছেন। গত বুধবার ব্যবসায়ীদের এক বৈঠকে জানিয়ে দিয়েছেন, আপাতত ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরেই তেল চিনির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিশেষভাবে যোগসাজশ করে তাদের পক্ষে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠায় ট্যারিফ কমিশন। কমিশনের একটি চক্র এই কাজে জড়িত। এই চক্রের একজন সদস্যকে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন খুঁজে বের করেছিলেন, যিনি সরাসরি প্রতিবেদন তৈরির কাজটি করছেন দীর্ঘদিন ধরে।

এ চক্রের দৌরাত্ম্য থামাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য একাধিক উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। একাধিক সংস্থা দিয়ে তেল-চিনির প্রকৃত মূল্য কত হবে তা বের করার চেষ্টা করেছে মন্ত্রণালয়। তবে এখনো প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রকৃত মূল্যায়ন পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির-উদন্ডদৌলার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মোবাইলে কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। ফলে বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত