‘বাবা, আমাকে বাঁচাইতে আসো’ শেষ ভিডিওকলের পরই মৃত্যু

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৭ এএম

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে স্বামীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাবাকে ভিডিওকল করে আকুতি জানিয়েছিলেন জুমরাতুন নেছা বর্ষা (২৪)। ‘বাবা, আমাকে বাঁচাইতে আসো’ মেয়ের এমন চিৎকার শুনে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে বাসায় পৌঁছান মা-বাবা। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, বর্ষা আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি করছে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বর্ষার পরিবারের অভিযোগ, বর্ষাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার বাবা শেখ মনোয়ার হোসেন তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ বর্ষার স্বামী নাবিদ হোসাইনকে গ্রেপ্তার করেছে।

গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে এ ঘটনা ঘটে বলে পরিবারের বরাতে জানা গেছে। বর্ষার মা হাসিনা আক্তার বলেন, এটা আত্মহত্যা হতে পারে না। মেয়ের যদি আত্মহত্যা করারই হতো, তাহলে তো আমাদের ডাকত না। শেষ ভিডিও কলে মেয়ে চিৎকার করে বলছিল, বাবা আমাকে বাঁচাইতে আসো।

এ ঘটনায় তেজগাঁও থানায় হত্যা মামলা করেছেন বর্ষার বাবা শেখ মনোয়ার হোসেন। ঘটনার রাতে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকেই নাবিদকে পুলিশে ধরিয়ে দেয় বর্ষার পরিবার। তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুনিরুজ্জামান বলেন, যৌতুকের দাবিতে বিভিন্ন সময় বর্ষাকে মারধর করতেন তার স্বামী নাবিদ। বর্ষার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় বর্ষার বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। পরে হাসপাতাল থেকে নাবিদকে গ্রেপ্তার করা হয়।

নাবিদের পাশাপাশি তার মায়েরও বর্ষাকে বউ করে নেওয়ার আগ্রহ ছিল বলে জানান হাসিনা আক্তার। তিনি বলেন, নাবিদের মা নুরুন নাহার দুই দিন পরপরই ফোন করে বলতেন, কাবিনটা করিয়ে দেন। ছেলেমেয়ে একসঙ্গে ঘোরাফোরা করে, এটা তো খারাপ। কোনো অঘটন হইলে তো মুখ দেখানো যাবে না। কাবিন করায় রাখেন, অনুষ্ঠান পরে কইরেন। সে জন্যই ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর কাজি এনে ঘরোয়াভাবে নাবিদের মা-বাবা ও আমাদের উপস্থিতিতে বিয়ে দেওয়া হয়। পরে আর অনুষ্ঠান করা হয়নি। এবারের ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে একটা অনুষ্ঠান কইরা ছেলেকে আংটি, ফার্নিচার ইত্যাদি দেওয়ার কথা ছিল।

বিয়ের পর থেকেই নির্যাতনের অভিযোগ : পরিবার সূত্রে জানা যায়, উচ্চমাধ্যমিক শেষে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে তেজগাঁও কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলেন বর্ষা। কলেজে পড়ার সময় নাবিদের সঙ্গে তার পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরিবারের আপত্তি থাকলেও সম্পর্কের বিষয়ে অনড় ছিলেন তিনি। পরে ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর দুই পরিবারের উপস্থিতিতে তাদের কাবিন হয়। আগামী ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হওয়ার কথা ছিল।

বর্ষার মায়ের অভিযোগ, বিয়ের আগেই নাবিদ তার মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করে দেন। বিয়ের পর ব্যবসার কথা বলে শ্বশুরের কাছ থেকে একাধিকবার টাকাও নেন। টাকা না দেওয়া বা অন্য বিষয় নিয়ে প্রায়ই বর্ষাকে মারধর করতেন তিনি।

পরিবারের দাবি, ছয়-সাত মাস আগে নির্যাতনে বর্ষার মাথা ফেটে যায়। তখন তাকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্বামীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চাননি বর্ষা। পরে মা-বাবার কাছে চলে এলেও নাবিদের ফোন পেয়ে আবার ফিরে যেতেন।

হাসিনা আক্তারের ভাষ্য, নাবিদ বর্ষাকে সন্দেহ করতেন এবং অন্যদের সঙ্গে কথা বলায় বাধা দিতেন। নির্যাতনের পর মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে এলেও তিনি স্বামীর কাছে ফিরে যেতেন।

বর্ষার পরিবারের অভিযোগের বিষয়ে নাবিদের বাবা মঞ্জুর হোসেন ও মা নুরুন নাহারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে নাবিদ হোসাইনের বক্তব্যও জানা যায়নি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত