ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল হলেও ভোটের দিন প্রচারণা এবং ভোটকেন্দ্রের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক জোট অ্যালায়েন্স ফর ফেয়ার ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (এএফইডি)।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নির্বাচনের দিন সকালে একজন প্রার্থীর সমর্থকেরা ভোটকেন্দ্রের আশপাশে দলীয় প্রতীকসংবলিত প্রচারসামগ্রী বিতরণ করেন। পরে এসব সামগ্রী রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ ছাড়া পর্যবেক্ষণ করা ২৪ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে চলাচলে অক্ষম ব্যক্তিদের সহায়তা ছাড়া প্রবেশের সুযোগ ছিল না।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) ঢাকায় প্রকাশিত এক প্রাথমিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরে এএফইডি। গত ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে সংস্থাটি ৫২ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে ১২৬টি ভোটকেন্দ্রে পর্যবেক্ষণ চালায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যবেক্ষণ করা ৯৯ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটারদের সারি সুশৃঙ্খল ছিল। ৯৮ শতাংশ কেন্দ্রে নিরাপত্তাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল এবং ৯৬ শতাংশ কেন্দ্র সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরুর জন্য প্রস্তুত ছিল। তবে একটি কেন্দ্রে সন্দেহজনক জাল ভোটের ঘটনা এবং ভোটকেন্দ্রের ভেতরে শারীরিক সহিংসতার একটি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ৮ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটার স্লিপ বিতরণের বুথ থেকে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ৭২ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটারদের দলবদ্ধভাবে একই যানবাহনে আসতে দেখা গেছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থীদের পক্ষ থেকে পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এসব ক্ষেত্রে ভোটারদের কোনো শর্ত ছাড়াই পরিবহন সুবিধা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা যাচাইয়ের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
এএফইডির মতে, ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে প্রচারণা ও ভোট চাওয়ার ওপর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৭৯ অনুচ্ছেদে বিধিনিষেধ রয়েছে। তাই এসব অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ৯৮ শতাংশ কেন্দ্রে ভোটের গোপনীয়তা রক্ষার উপযোগী পরিবেশ থাকলেও কিছু কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে ভোট দেওয়ার দৃশ্য দেখা যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
এদিকে পর্যবেক্ষণ করা কেন্দ্রগুলোর কোথাও নারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ছিলেন না। যদিও ভোটগ্রহণের অন্যান্য দায়িত্বে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল। বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও অন্তঃসত্ত্বা ভোটারদের অগ্রাধিকার দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে ৯৫ শতাংশ কেন্দ্রে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, উপনির্বাচনে ভোট পড়েছে ৬৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে ভোটের হার ছিল ৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ ভোটার উপস্থিতি কমেছে ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ। তবে বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের আগের দুটি উপনির্বাচনের তুলনায় ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ভোটের হার বেশি ছিল।
ভোট গণনার ক্ষেত্রেও সামগ্রিকভাবে সুশৃঙ্খল পরিবেশের কথা জানিয়েছে এএফইডি। ৯৫ শতাংশ কেন্দ্রে বৈধ ও অবৈধ ভোট আলাদা করার প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল এবং ৯৬ শতাংশ কেন্দ্রে ফলাফল প্রদর্শন করা হয়েছে। গণনার সময় এজেন্টদের পক্ষ থেকে দুটি অভিযোগ পাওয়া গেলেও পর্যবেক্ষকেরা কোনো হস্তক্ষেপ, ভয়ভীতি বা হয়রানির ঘটনা দেখেননি।
এএফইডির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, নির্বাচনের দিন প্রচারণা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ সব প্রার্থীর জন্য সমানভাবে কার্যকর করতে হবে। পর্যবেক্ষণে পাওয়া অভিযোগগুলো যাচাই করে কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানানো উচিত।
সংস্থাটির চেয়ারপারসন তালেয়া রহমান নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দুই প্রার্থীর সৌহার্দ্যপূর্ণ যোগাযোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি সব পক্ষকে সহিংসতা ও ভয়ভীতি পরিহার করে নির্বাচনী অভিযোগ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির আহ্বান জানান।
প্রতিবেদনে নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অভিযোগকারী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে এএফইডি।
উল্লেখ্য, দেশের ৩০টি নাগরিক সমাজের সংগঠন নিয়ে গঠিত এএফইডি ২৯ অক্টোবরের উপনির্বাচনে ১২৬টি ভোটকেন্দ্রে ৫২ জন পর্যবেক্ষক মোতায়েন করেছিল।