‘অন সরিষা কাঁকুড় নাড়ি
যা রে পোক ধানকে ছাড়ি
এতে আছে শুকতা
ধান ফলবে মুকতা
এতে আছে কেঁউ
ধান হবে সাত বেঁউ
এতে আছে হলদি
ধান ফলবে জলদি।’
গ্রামীণ লোকছড়া
পল্লীবাংলার গ্রামীণ জীবনে আশি^ন এক আশীর্বাদের মাস। বিশেষ করে এ মাসে কৃষকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এ মাসে আমন ধানের গাছগুলো গর্ভবতী হয়। এ অবস্থায় ধানক্ষেতে নানারকম পোকামাকড় ও রোগের উপদ্রব হয়। বৃষ্টি কমে যাওয়ায় অনেক সময় ধানক্ষেত শুকিয়ে যায়। এতে ধানগাছের কুশির গর্ভে থাকা ধানের অস্ফুট দানার ক্ষতি হয়। অতীতে আমন ধানই ছিল সারা বছরের খাদ্যের নিরাপত্তা। যে কারণে আরবি শব্দ ‘আমানত’ থেকে এ ধানের নাম হয়েছে ‘আমন’। ধান ফসলের সুরক্ষার জন্য গ্রামীণ হিন্দু সমাজের কৃষকরা তাই নলসংক্রান্তির উৎসব পালন করেন। এটি এক ধরনের প্রকৃতিপূজা। আশি^ন মাসের সংক্রান্তি বা শেষ দিনে এই উৎসব হয়। এ সময়ে আমনের ক্ষেতে ফুল আসতে শুরু করে। সেদিন ধানক্ষেতের আইলে বা নির্দিষ্ট স্থানে নলখাগড়া গাছ পুঁতা হয়। তার সঙ্গে পুঁতা হয় কেঁউ ও হলুদ গাছ। নলের মাথায় ঝুলানো হয় শোলার কদম ফুল। এই শোলার কদম ফুলের মাধ্যমে লক্ষ্মীদেবীর আরাধনা করা হয় যেন পোকা-মাকড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ফসল রক্ষা পায়। এ জন্য খুলনার দাকোপ ও বটিয়াঘাটায় দেখেছি এ উৎসবকে বলা হয় ‘লক্ষ্মীর সাধ’। ধানকে সাধাভক্ষণ করানো হিসেবেও তা পালন করা হয়। এ সময় তারা ধান ফসলের সুরক্ষার জন্য মুখে মুখে একটি লোকছড়া কাটেন। সে ছড়ার মধ্যেই দেখা যায় কেঁউগাছের মাহাত্ম্য। লোকবিশ^াস, ধানক্ষেতে কেঁউগাছ থাকলে ধানের ফলন হবে সাতগুণ।
কেঁউয়ের বাংলা ও অন্যান্য স্থানীয় নাম কেমুক, কেও, কেওমূল, কুস্তা, টিয়াটুই; ইংরেজি নাম Crepe ginger Malay ginger I White costus. প্রাথমিকভাবে ডেনিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ইয়োহান গেরহার্ড কোনিগ Banksea speciosa প্রজাতি নামে এর বর্ণনা দেন, এবং পরবর্তীকালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটিকে বিভিন্ন নামে পুনঃনামকরণ করা হয়। বর্তমান উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Hellenia speciosa ও গোত্র কোস্টেসী নির্ণীত হয়েছে। এটি একটি কন্দজাতীয় বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ, যা ২ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এ গাছের শুধু একটি সারিতে সর্পিলাকারে পাতাগুলো সজ্জিত থাকে। পাতা চর্মবৎ, মসৃণ ও চকচকে সবুজ। সেপ্টেম্বরে গাছে ফুল ফোটে ও ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকে। লাল রঙের পুষ্পমঞ্জরিতে একটির পর একটি করে সাদা রঙের ফুল ফোটে। ফুলের গড়ন ঘণ্টাকৃতি, ফুলের মাত্র দুটি পুরুষকেশর থাকে, একটি কার্যকরী, অন্যটি পাপড়ির মতো। আসল পাপড়িগুলো সাদা ও ছোট। পাপড়ি ঝরে যাওয়ার পর পুষ্পমঞ্জরির লাল বৃতিগুলো পুষ্পদ-ে রয়ে যায়। রাইজোম বা কন্দ দ্বারা এ গাছের বংশবৃদ্ধি ঘটে। ঔষধি গাছ ও আগাছা। স্যাঁতসেঁতে জঙ্গল, জলাশয়ের ধারে, নিচু জমিতে এ গাছ সাধারণত দেখা যায়। শরৎশেষে সাভার গেলে এ বুনো উদ্ভিদের বেশ দেখা মেলে। শরতের শেষে এক সকালে গিয়েছিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাসের ঝোপঝাড়ে অনেক স্থানেই ফুটে আছে কেঁউ ফুল।
প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থের কেঁউয়ের নাম পাওয়া যায়। বিশেষত কামসূত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, শারীরিক ও যৌন আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য প্রাচীনকালে চোখের পাতায় প্রসাধনী হিসেবে এর গুঁড়ো করা কন্দ বা নির্যাস ব্যবহার করা হতো। এজন্যই কি এর এক নাম হয়েছে কেমুক? ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় আয়ুর্বেদে জ্বর, ফুসকুড়ি, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, বাত ও অন্ত্রের পরজীবীর চিকিৎসায় এর কন্দ ব্যবহারের শত শত বছরের ইতিহাস রয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ও মালয়েশীয় ঐতিহ্য রয়েছে কেঁউয়ের। মালয়ের আঞ্চলিক লোক চিকিৎসায়, এই উদ্ভিদটি উচ্চ জ্বর, বসন্ত রোগের চিকিৎসায় ও রেচক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এ ছাড়াও, যখন কেউ প্রেতাত্মা দ্বারা আবিষ্ট বলে মনে করা হতো, তখন বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান বা প্রতিকার হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হতো। মিজোরাম ও দক্ষিণ ভারতের মতো অঞ্চলে, এই উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশবিশেষ করে কন্দ ও কান্ডের রসমূত্রনালির সমস্যা, কিডনির সমস্যা এবং চোখের জ্বালা নিরাময়ে দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আধুনিক ভেষজবিজ্ঞানেও কেঁউয়ের ব্যবহার রয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে কেঁউয়ের রাসায়নিক উপাদান প্রোজেস্টেরনের মতো হরমোন ও স্টেরয়েডের বাণিজ্যিক সংশ্লেষণে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এটি এশিয়ার উদ্ভিদ, এখন আর শুধু বাংলাদেশেই না, এর আকর্ষণীয় গাঢ় লাল মঞ্জরিপত্র এবং কুঁচকানো সাদা, ক্রেপ-কাগজের মতো ফুলের কারণে বুনোফুল হলেও অন্য অনেক দেশে বিশেষত ক্যারিবিয়ান, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ও আমেরিকার কিছু অংশের বাগানগুলোয় কেঁউ একটি শোভাময়ী ভূদৃশ্য উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এমনকি উদ্ভিদ প্রজননবিদরা এর কিছু নতুন বাহারি বিচিত্র জাতও উদ্ভাবন করেছেন।
লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ