দেশের তরুণ সমাজ মাদকের বিষাক্ত ছোবলে এক মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি। শহর থেকে শুরু করে নিভৃতপল্লী সবখানেই বিষাক্ত মাদকের অবাধ মেলা। মাদকের এই সর্বগ্রাসী বিস্তারের সমান্তরালে দেশজুড়ে ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতি। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সামাজিক মহামারীর মূল উৎসে নজর দিতে হবে। ভেঙে দিতে হবে মাদকের বিশাল সিন্ডিকেট। কিন্তু সেক্ষেত্রে দেশে এখন দৃশ্যমান এবং কার্যকর মাদকবিরোধী অভিযান চোখে পড়ে না। বরং গত ৬ মাসে রাজধানীর বৈধ তারকা হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বারে লোকদেখানো অভিযান করে অ্যালকোহল উদ্ধার এবং হয়রানি এরই মধ্যে জনমনে প্রশ্ন তুলেছে।
মাদকের মরণকামড় শুধু প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে না, বরং দেশের অর্থনীতিকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দিচ্ছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাড (টঘঈঞঅউ) এবং অভ্যন্তরীণ অপরাধ অনুসন্ধান বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে শিউরে ওঠার মতো চিত্র সামনে আসে। হিসাব অনুযায়ী, শুধু মাদক চোরাচালান ও অবৈধ কেনাবেচার কারণে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪৮১ মিলিয়ন ডলার (দেশীয় মুদ্রায় যা ৫ হাজার ১৪৭ কোটি টাকারও বেশি) পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে চোরাইপথে পাচার হয়ে যাচ্ছে। মাদক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচারের বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম, আর এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে।
দেশের অভ্যন্তরীণ খুচরা বাজারে এই বাণিজ্যের গভীরতা আরও বহুগুণ বেশি ও ভয়ানক। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতি বছর প্রতিবেশী মিয়ানমারের সীমান্ত গলিয়ে কোটি কোটি পিস ইয়াবা ট্যাবলেট বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। বেসরকারি গবেষণা ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্র মতে, বাংলাদেশে সামগ্রিক ইয়াবা ও সিনথেটিক ড্রাগের বার্ষিক অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার প্রায় ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থের পুরোটাই হুন্ডি ও অবৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মাদক চক্র ও স্থানীয় গডফাদারদের পকেটে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক নীরব রক্তক্ষরণ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং অপরাধ বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন সময়ের সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশে বর্তমানে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭৫ লাখ থেকে ১ কোটি। এর মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই সরাসরি ইয়াবায় আসক্ত। এই বিশাল ভোক্তা গোষ্ঠী প্রতিদিন যে পরিমাণ ইয়াবা সেবন করে, তার বাজারমূল্য আঁতকে ওঠার মতো।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে শুধু ইয়াবার বার্ষিক অভ্যন্তরীণ ব্যবসার পরিমাণ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। কোনো কোনো বছর তা আরও ছাড়িয়ে যায়। এই বিশাল অঙ্কের কালো টাকা দেশের মূল অর্থনীতিকে গ্রাস করছে এবং এর মাধ্যমে গড়ে উঠছে অবৈধ অস্ত্রের সিন্ডিকেট, হুন্ডি ব্যবসা ও রাজনৈতিক অর্থায়ন।
অসমর্থিত ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য মতে, শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকা শহরেই প্রতিদিন বিভিন্ন রুট দিয়ে প্রায় ১৩ লাখ ইয়াবা এবং আইসের ছোট-বড় চালান প্রবেশ করে। এই বিশাল সরবরাহ চেইন সচল রাখতে দেশজুড়ে কাজ করছে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। দেশের ১৮টি জেলার অন্তত ১০৫টি সীমান্ত পয়েন্ট মাদক চোরাচালানের প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে টেকনাফ, উখিয়া ও শাহপরীর দ্বীপের নাফ নদী এবং ভারত সীমান্তের সাতক্ষীরা, যশোর ও কুমিল্লার সীমান্ত অন্যতম।
লক্ষ্যবস্তু যখন লাইসেন্সপ্রাপ্ত বার : মরণঘাতী মাদক যখন দেশের আনাচে-কানাচে পরিবারগুলোকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে, তখন তদারকি সংস্থাগুলোর মূল মনোযোগ গিয়ে পড়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন জায়গায়। গত ছয় মাসের অভিযানের তথ্য ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে এই হতাশাজনক চিত্র চোখে পড়ে।
এই ছয় মাসে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন নিবন্ধিত বার, ক্লাব ও পাঁচ তারকা হোটেলে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪২টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। বনানীর তারকা হোটেল আমারী, আন্তর্জাতিক চেইন হোটেল ঐড়ষরফধু ওহহ, গুলশানের জার্মান ক্লাব, মিডিয়া ক্লাব, র-ক্যানভাস, তেজগাঁওয়ের ফুয়াং ক্লাব রাজধানীর রুচিতা ও ব্লেজার ক্লাউসের মতো বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন বাহিনী, শুল্ক গোয়েন্দাসহ একাধিক এজেন্সি কর্র্তৃক একের পর এক ঝটিকা অভিযান চালানো হয়েছে। এই ৪২টি অভিযানের সিংহভাগেরই মূল লক্ষ্য ছিল অ্যালকোহল ও অনুমোদিত অ্যালকোহল বিক্রির লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন বা অতিরিক্ত মজুদের মতো প্রশাসনিক অনিয়ম ধরা। এসব অভিযানে সরকারের কেরু অ্যান্ড কোং এবং ক্রাউন বেভারেজ এর হান্টার, বিয়ার ও বৈধভাবে আমদানি করা অ্যালকোহল জব্দ দেখিয়ে সেগুলোকে মাদকবিরোধী অভিযানের বড় সফলতা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে রাজধানীর বড় কোনো ইয়াবা বা আইস সিন্ডিকেটের আস্তানায় বা মাদকের গডফাদারদের ডেরায় একটিও উল্লেখযোগ্য যৌথ অভিযান দৃশ্যমান হয়নি।
সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, মাদক যখন কোনো সমাজে মহামারি আকার ধারণ করে, তখন সেই সমাজের নৈতিক এবং পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। ইয়াবা বা মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সন্তান যখন মা-বাবাকে খুন করে, তখন বুঝতে হবে সমাজ কতটা পচে গেছে। রাষ্ট্র যদি মাদকের গডফাদারদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া বন্ধ না করে, তবে শুধু চুনোপুঁটি ধরে এই সামাজিক অবক্ষয় ঠেকানো সম্ভব নয়। তার মতে, একই সঙ্গে মাদক প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমোদিত বারে যেভাবে অভিযান চালাতে দেখা যায়, ইয়াবার মতো অবৈধ ও নিষিদ্ধ মাদকের বিরুদ্ধে সেভাবে অভিযান খুব একটা চোখে পড়ে না। সরকারকে এ বিষয়ে নজর বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মেজর (অব.) জাহাঙ্গীর হোসেইন বলেন, মরণঘাতী কেমিক্যাল ড্রাগের (ইয়াবা, আইস, হেরোইন ইত্যাদি) ভয়াবহতা আর হোটেল রেস্তোরাঁ বার-ক্লাবের অনুমোদিত বৈধ অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অ্যালকোহল কোনো নিষিদ্ধ পণ্য নয় বরং দেশে উৎপাদন হয় এবং আমদানিযোগ্য। সরকার দেশের একমাত্র অ্যালকোহল উৎপাদনকারী কারখানার মালিক। এর শতভাগ উৎপাদিত পণ্য হোটেল, ক্লাব, রেস্তোরাঁ ও বারগুলো বিক্রি করে সরকারকে শুল্ক, ভ্যাট পরিশোধ ইত্যাদির পাশাপাশি কেরু অ্যান্ড কোং বছরে অন্তত ৫০০-৬০০ কোটি টাকা লাভ করে থাকে। বৈধ হোটেল রেস্তোরাঁ বারগুলোকে প্রতিটি অ্যালকোহল পণ্য বিক্রির ওপর ৪৯ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক দিতে হয়। অর্থাৎ, ১০০ টাকা বিক্রি করলে সরকার ৪৯ টাকা পায়। তাই সরকারের রাজস্ব এবং পর্যটনের স্বার্থে বারগুলোকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, মুসলিমপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও পর্যটন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের স্বার্থে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোয় অ্যালকোহল সেবনের সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো রয়েছে। এর ফলে ওই সব দেশ পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষ স্থানে রয়েছে। তার মতে, অযথা বাংলাদেশে বৈধ বার বা হোটেলকে মাদক উদ্ধারের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়েছে। ফলে বৈধভাবে লাইসেন্স ফি ও ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে ব্যবসা করা দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চরম ব্যবসায়িক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বারবার এই ধরনের অভিযানে ঢালাওভাবে আগত অতিথিদের গ্রেপ্তার, মামলা দেওয়া এবং লাইভ ভিডিও প্রচারে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তারকা হোটেল ও ক্লাবগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে, যা দেশের পর্যটন শিল্প ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সরকারকে বিষয়টি ভাবতে হবে। কারণ এ খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকারেরও রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এগুলো কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা হয়রানিমূলক অভিযান নয়। বন্ডেড ওয়্যারহাউস বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে শুল্কমুক্ত বিদেশি মদ বিক্রির ক্ষেত্রে অনিয়ম, অবৈধ মজুদ কিংবা লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই শুধু আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তার মতে নিয়ম মেনে চলা বৈধ ব্যবসার ক্ষতি করা অধিদপ্তরের লক্ষ্য নয়।