পুরনো কাজ নতুন দেখিয়ে ৮৭ কোটি টাকার প্রকল্প

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:১৯ এএম

সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগে (সওজ) শেষ হওয়া প্রকল্পকে নতুন দেখিয়ে ৮৭ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ সড়ক বিভাগাধীন বিভিন্ন সড়ক, সেতু ও কালভার্ট সমুহের জরুরী পুনর্বাসন ও পুনর্নির্মাণের  লক্ষ্যে ২২০০ কোটি টাকার সরকারি তহবিল থেকে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম জনদাবির মুখে এই অনিয়ম সামনে আনায় থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আনোয়ারপুর-ফতেপুর সড়ক, আলীপুর, নিয়ামতপুর, হরিপুর ও রঙ্গইয়ারচর ব্রিজসহ ৯টি প্রকল্পের কাজ আগেই শেষ হয়েছিল। কিন্তু সিলেটের অ্যাডিশনাল চিফ ফজলে রব্বে, তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী ড. আব্দুল আহাদ এবং এসডি আলাউদ্দিন সোহাগ টেবিল বৈঠকে বসে এসব সমাপ্ত কাজকে নতুন প্রকল্পের এস্টিমেটে যুক্ত করেন। ২০২৪ সালের মার্চে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘মো. বদরুল ইকবাল লিমিটেড’ কাজটি হাতিয়ে নেয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো চুক্তিকালীন মূল ঠিকাদার বদরুল ইকবাল অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকেই তিনি নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে একই প্রকল্পে মো. আজাদ হোসেনকে সাব-ঠিকাদার এবং শফিকুল ইসলামকে প্রতিনিধি নিয়োগ দেন, যা বড় আইনি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এভাবে একাধিক ভুয়া চুক্তি, জাল কাগজপত্র তৈরি এবং চেক জালিয়াতির মাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, আলোচিত সড়ক ও জনপথ (সওজ) প্রকল্পের টাকা উত্তোলনের চেকে অনিয়মের মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল তৎকালীন সিলেট বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ফজলে রব্বের হাতে। মো. আজাদ হোসেন ও সফিকুলের চুক্তি স্বাক্ষরকালে মূল ঠিকাদার বদরুল ইকবাল উপস্থিত ছিলেন না। বরং ফজলে রব্বের মধ্যস্থতাতেই এসব চুক্তি সম্পন্ন হয়।

জানা গেছে, বদরুল ইকবালের প্রতিনিধি আজাদ হোসেন প্রথম বিল প্রস্তুত করে জমা দেওয়ার পর সেই টাকা তোলেন সফিকুল। তৎকালীন সিলেটের এসি নাজমুল হুদার সময়ে আইপিসি-১ ও ২ এর বিল হিসেবে ৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা তোলা হয়। পরবর্তী সময়ে বদরুল ইকবাল ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা সাব-ঠিকাদার আজাদ হোসেনের মৌলভীবাজার ইউসিবি ব্যাংক শাখায় পাঠান।

আইপিসি-২ এর ব্লক, মাটি ভরাট ও ফাইলিংসহ অন্যান্য কাজের মোট ১০ কোটি ৯৯ লাখ টাকার বিলের বিপরীতে ৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা তোলার জন্য আজাদকে সিলেটে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তার ওপর মব (উত্তেজিত জনতা) সৃষ্টি করা হলে নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। একই দিন সিলেটে তার বিরুদ্ধে শফিকুল ইসলাম মামলা করেন এবং ঢাকা থেকে আজাদকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অভিযুক্ত সাব-ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধ অভিযোগগুলো সঠিক নয়। আমি সুষ্ঠুভাবে কাজ করছি সরকারি নীতিমাল অনুযায়ী।’ এদিকে মূল ঠিকাদার অস্ট্রেলিয়া থাকায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। সড়ক ও জনপথের তৎকালীন সিলেটের অ্যাডিশনাল চিফ ফজলে রব্বে বলেন, ‘কাজের এস্টিমেট সঠিকভাবেই করা হয়েছিল। অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নিইনি।’

সুনামগঞ্জের এই প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ৮৭ কোটি টাকার মধ্যে নামমাত্র কাজ করে ৩৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা উত্তোলন করা হলেও, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বাকি ৩৮ কোটি টাকা উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্ট া করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত