আচরণবিধি লঙ্ঘন করে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী মিছিলে অংশ নিচ্ছেন; তারা গলায় পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে নেচে-গেয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। এ রকম একটি মিছিল গত সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে বের হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) গিয়ে শেষ হয়। ইচ্ছা না থাকলেও ‘চাকরি রক্ষার জন্য’ মিছিলে গিয়েছিলেন বলে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কেউ কেউ জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি কর্মচারী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কোনোভাবেই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন না। এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’
গত পরশু সকাল ৯টা থেকে রাজধানীর ৯টি হাসপাতালের কয়েক হাজার চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে জড়ো হতে থাকেন। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে দুপুর পৌনে ২টায় শোভাযাত্রা শুরু হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শোভাযাত্রা উদ্বোধন করেন। ঢাকা-১৩ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাদেক খান তার সঙ্গে ছিলেন। তারা নৌকাকে বিজয়ী করতে চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তা চান। শোভাযাত্রার ব্যানারে বড় হরফে লেখা ছিল ‘আমরা নিরপেক্ষ নই, স্বাধীনতার পক্ষে।’ শোভাযাত্রায় চিকিৎসক ও নার্সরা ‘এপ্রোন’ পরে অংশ নেন। অনেকের গলায় সরকারি হাসপাতালের পরিচয়পত্রও ঝুলতে দেখা যায়।
শোভাযাত্রাটি আসাদগেট, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাবরেটরি হয়ে বেলা সাড়ে ৩টায় বিএসএমএমইউর সামনে গিয়ে শেষ হয়। এতে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ছাড়াও বিএসএমএমইউ, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, শিশু হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স এবং জাতীয় বাতজ্বর ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেন।
ওইদিন এসব হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ খোলা ছিল; চালু ছিল হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কক্ষও। কিন্তু চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্বাচনী মিছিলে যাওয়ায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়; রোগীরা ভোগান্তির শিকার হন।
কিডনি হাসপাতালের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরিজীবী। আমি কোনোভাবেই এ ধরনের মিছিলে অংশ নিতে পারি না। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানোর পরও তারা বলেছে, চাকরি করতে হলে মিছিলে যেতেই হবে। শেষ পর্যন্ত হয়রানির হাত থেকে বাঁচার জন্য মিছিলে অংশ নিই।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নন। রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে কাজ করতে চাইলে তাদের আগে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে। শৃঙ্খলাবিধি ভঙ্গের আপরাধে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলেই দিন দিন তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এটা সম্ভব নয়। আমাদের দেশে গণতন্ত্র নেই বলে এটা হচ্ছে।’
১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের বা রাজনৈতিক দলের কোনো অঙ্গ-সংগঠনের সদস্য হতে বা অন্য কোনোভাবে তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন না অথবা বাংলাদেশে বা বিদেশে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে বা কোনো ধরনের সহায়তা করতে পারবেন না।
একই আইনের আরেকটি ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী বাংলাদেশ অথবা অন্য কোথাও কোনো আইনসভার নির্বাচনে অংশ নিতে বা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে বা অন্য কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করতে বা প্রভাব খাটাতে পারবেন না।