পুলিশের গাড়ি নিয়ে বিপাকে এআই ক্যামেরা

আপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ০৭:১৭ এএম

ঢাকার রাস্তায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, এমন কথা এখন গত। ঢাকা মহানগরে চলাচল করা গাড়ির চালকরা এখন সচেতন। তারাও ট্রাফিক আইন মান্য করতে শিখেছেন। এসব হয়েছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্যামেরার প্রভাবে। কারণ এআই বোঝে না কার কী পরিচয়। সড়ক বাতি অমান্য করলেই মামলা নোট করে পাঠিয়ে দেয় মালিকের ঠিকানায়। এই মামলা থেকে বাঁচতে শুরু হয়েছে এক নতুন প্রতারণা কৌশল। নম্বর প্লেট ঢেকে কিংবা ইঞ্জিন নম্বর ব্যবহার করে রাজধানীতে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে অনেক গাড়িকে।

ট্রাফিকের মাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাধারণত এখন আইন অমান্য করার প্রবণতা কিছুটা সরকারি গাড়ির চালকদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। তাদের গাড়িতে নম্বর প্লেটে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) রেজিট্রেশনকৃত নম্বর নয়, ইঞ্জিন নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ইঞ্জিন নম্বরে চলা গাড়ি নিয়ে বিপাকে পড়ছে এআই সিস্টেম। এ এক নতুন চ্যালেঞ্জ। তবে ইঞ্জিন নম্বরে সবচেয়ে বেশি চলাচল করে পুলিশের গাড়ি।

ট্রাফিক গুলশান বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গভীর রাতেও লাল, হলুদ ও সবুজ বাতি মেনে চলছেন চালকরা। রাস্তায় কোনো পুলিশ সদস্য না থাকার পরও সবার মধ্যে আইন মানার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

মোটরযান আইন অনুযায়ী, গাড়ি কেনার পর রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক। গাড়ির রেজিস্ট্রেশন মালিকানার বৈধতার প্রমাণপত্র। গাড়ি যে প্রক্রিয়ায়ই ক্রয় করা হোক না কেন, তা অবশ্যই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কর্তৃক নিবন্ধন করতে হবে। সাধারণত বাংলাদেশের যে কোনো মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন বিআরটিএর মাধ্যমে করতে হয়। তবে একমাত্র সেনাবাহিনীর (ডিফেন্স) নিজস্ব যানের রেজিস্ট্রেশন বিআরটিএ থেকে নিতে হয় না। সামরিক যান পরিচালনা সেনা সদর (এমটি পরিদপ্তর) নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করে থাকে। নিজস্ব ব্যবহারের গাড়িগুলোর রেজিস্ট্রেশন ‘মিলিটারি ভেহিকেল রেজিস্ট্রেশন’ করে থাকেন তারা। এ ছাড়া অন্য যেকোনো সরকারি-বেসরকারি সংস্থার গাড়ির ক্ষেত্রে নিয়মানুযায়ী বিআরটিএর মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু পুলিশের অধিকাংশ গাড়ি রেজিস্ট্রেশনভুক্ত নয়। তাদের গাড়ি চলে ইঞ্জিন নম্বর ব্যবহার করে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পুলিশের অপারেশনাল কার্যক্রমের জন্য যানবাহন রয়েছে ১১ হাজার ৯২৩টি। এর মধ্যে ৬ হাজার ৪৪৫টি মোটরসাইকেল এবং ৫ হাজার ৪৭৮টি পাজেরো, পিকআপ ও প্রাইভেট কার। গত দুই বছরে ৪৫৫টি যান পুড়ে যাওয়ায় এবং পুরনো অকেজো যানবাহনের কারণে বাহিনীতে প্রায় ৪ হাজার ৪৪৭টির ঘাটতি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি (৩ হাজার ৪৯৭টি) মোটরসাইকেলের। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পুলিশের প্যাট্রোল ডিউটিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় মোটরসাইকেল। পুলিশের ফোর্স ও মালামাল আনা-নেওয়ার জন্য ডাবল কেবিন পিকআপের চাহিদা বেশি রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের জরুরি অভিযান পরিচালনা করা হয়ে থাকে এমন গাড়ির সংকট ৫০৭টি।

চলতি মাসে পাইলট প্রকল্প শুরুর পর এরই মধ্যে এআই ক্যামেরায় ধারণ করা প্রযুক্তিতে দুই হাজারের বেশি মামলা দেওয়া হয়েছে। এ পদক্ষেপ নিয়ে ট্রাফিক বিভাগ আশাবাদী হলেও সড়কে শৃঙ্খলা আনা এবং যানজট সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে কি না, সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন গাড়িচালকরা। এক্সপ্রেসওয়েতে ক্যামেরা দিয়ে ওভারস্পিড শনাক্ত করে মামলা আরও আগে শুরু হলেও ঢাকায় এআই প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া শুরু হয়েছে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে।

কয়েকজন চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে সড়কে বহুমুখী সংকটের কথা। তাদের মতে, লাইসেন্সধারী এবং নিবন্ধিত যানবাহন কঠোর আইন ও নিয়ম-কানুনের বেড়াজালে আটকা পড়ছে। কিন্তু অনিবন্ধিতরা থেকে যাচ্ছে অনেকটা ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ সড়কে সমস্যার অন্যতম কারণ লাইসেন্সবিহীন চালক আর অনিবন্ধিত যানবাহন। বর্তমানে রাজধানী ঢাকার প্রধান সড়কের ১০টি পয়েন্টে এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ক্যামেরা ব্যবহার করে ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছে পুলিশ।

বাংলাদেশে সাধারণত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং মামলা দেওয়া হয়। হাতে লেখা সিøপ দিয়ে মামলা শুরু হলেও এরপর ধাপে ধাপে পজ মেশিন ব্যবহার থেকে এখন এআই বেইজড ই-প্রসিকিউশন সিস্টেম চালু হয়েছে। রাজধানীর শাহবাগ থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত এ সড়কে এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ শনাক্তের পর মামলা দেওয়া হয়। এখন পাঁচ ধরনের অপরাধ শনাক্ত করতে পরীক্ষামূলকভাবে এআই সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। গাড়ি শনাক্তের জন্য ১০৫টি ক্যামেরা ব্যবহার করছে ট্রাফিক বিভাগ।

এআই কোন কোন অপরাধ শনাক্ত করবে, সফটওয়্যারে সেগুলোর একটা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তার ভিত্তিতেই অপরাধ শনাক্ত করে মামলা দেওয়া হয়। এখন রেড সিগন্যাল ভায়োলেশন, জেব্রা ক্রসিং অতিক্রম, উল্টো পথে গাড়ি আসা, স্টপেজ ছাড়া গাড়ি থামানো বা অন্য যানবাহনের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা এবং বাম লেন ব্লক করে দাঁড়ালেই মামলা হচ্ছে। এ ছাড়া এআই ব্যবহার করে আরও কিছু ফিচার অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলছে। তার মধ্যে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলে কথা বলা ও সিট বেল্ট বাঁধার মতো বিষয় যুক্ত হচ্ছে।

ট্রাফিকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এআই ক্যামেরায় ধারণা করা ফুটেজ কালেক্ট (সংগ্রহ) করছে। সেটাকে আবার ম্যানুয়ালি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। কাজ করতে গিয়ে বাস্তব কিছু সমস্যা দেখা যায়। এর মধ্যে বিভিন্ন গাড়ির নম্বর প্লেট সঠিক অবস্থায় নেই, কিছু কিছু ভাঙা, কিছু অস্পষ্ট। ফোনে সরাসরি মেজেস দিলে অনেক ক্ষেত্রে ভুল হয়ে যেতে পারে। এ জন্য ম্যানুয়ালি দেখে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এরপর যেসব মামলা নিশ্চিত করা হচ্ছে সেই গাড়ির নিবন্ধিত সেলফোনে বার্তা পাঠানো হচ্ছে এবং একটি অভিযোগের নোটিস তার ঠিকানায় পাঠানো হচ্ছে। সেই চিঠিতে সশরীরে হাজির হয়ে মামলাটা নিষ্পত্তি করতে ১৫ দিনের সময় দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, যার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে, তার ২৫ সেকেন্ডের একটা ভিডিও প্রমাণ হিসেবে রাখা হচ্ছে। সশরীরে এসে দায় নিয়ে নিলে জরিমানা দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি হবে অথবা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আপিল করার সুযোগ থাকবে।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, শুরুর দিকে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ গাড়ি ওভারস্পিড করত। ক্যামেরার ফুটেজ থেকে মামলা দেওয়া শুরুর পর ধারাবাহিকভাবে এটি কমে এসেছে। বর্তমানে ২০-২৫টিতে নেমে এসেছে মামলার সংখ্যা। সড়কে আইন অমান্য করলে অপরাধের ধরন অনুযায়ী, ড্রাইভিং লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি চালকের লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা হয়েছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এআই ক্যামেরা এড়াতে যেসব চালক গাড়ির নম্বর প্লেট লুকিয়ে ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছে তাদের খোঁজ করা হচ্ছে। প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে তাদের গাড়ি ও ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারি স্টিকারযুক্ত যেসব গাড়ি নম্বর প্লেটে ইঞ্জিন নম্বর লাগিয়ে সড়কে চলছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ ইঞ্জিন নম্বর ব্যবহার করে একটা নিদিষ্ট সময় পর্যন্ত চলাচল করা যায়। এর পরে সেটা ব্যবহার অবৈধ।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিস্টেমের মধ্যে গলদ রেখে এআই দিয়ে শতভাগ সুফল পাওয়া যাবে না। এটা দিয়ে যারা সুফল পেয়েছে, তারা সিস্টেমের কারণেই পেয়েছে। এআই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এখন সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। কারোর মুখের দিকে না তাকিয়ে আইন প্রয়োগ করতে হবে।’

তিনি বলেন, ইঞ্জিন নম্বর দিয়ে সড়কে চলাচল করা গাড়ির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমানে সড়কে নম্বর প্লেটবিহীন গাড়ির দৌরাত্ম্য বেশি বাড়ছে। এআই সড়কের শেষ দাওয়া!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত