চট্টগ্রামে ব্যাটারি রিকশা খাচ্ছে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় যখন অস্থির নগরবাসী, তখন অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চট্টগ্রাম নগরী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অনুমোদনহীন হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা। অনিরাপদ কাঠামোর এসব যান্ত্রিক রিকশা অহরহ পড়ছে দুর্ঘটনায়। এর আগে ট্রাফিক পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে নগরীর বিভিন্ন অলিগলিতে সীমিত পরিসরে এসব যান চলাচল করলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর পরিমাণ বেড়েছে। এমনকি এখন পুলিশের সামনে দিয়েই চলছে এসব রিকশা। কারণ হিসেবে জব্দ করা রিকশা এবং এর ব্যাটারি ও মোটর রাখার জায়গাসংকটকে দায়ী করেছেন নগর পুলিশের শীর্ষ ট্রাফিক কর্মকর্তা।

অন্যদিকে ব্যাটারিচালিত এসব রিকশার জন্য প্রতিদিন অবৈধভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ। চট্টগ্রাম ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক-মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী নগরীতে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। বৈদ্যুতিক মোটরচালিত এসব রিকশার প্রতিটির ব্যাটারি চার্জ দিতে প্রতিদিন খরচ হয় ৫ ইউনিট করে বিদ্যুৎ। সে হিসেবে প্রতিদিন খরচ হয় ৫০ হাজার ইউনিট বা কিলোওয়াট (৫০ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎ। আর বিপুল পরিমাণ এই বিদ্যুতের প্রায় পুরোটাই অবৈধপথে ব্যবহার করা হয় বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী। গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর জামালখান, চেরাগী পাহাড়, আন্দরকিল্লা, জেল রোড, পাথরঘাটা, খাতুনগঞ্জ, আছাদগঞ্জ, চাকতাই, আসকার দিঘির পাড়, চকবাজার ডিসি রোড, বাদশা চেয়ারম্যানঘাটা, বাকলিয়া সৈয়দ শাহ রোড, আবদুল লতিফ হাট, বহদ্দারহাট খাজা রোড, খতিবের হাট, মুরাদপুর-অক্সিজেন রোড, বায়েজিদ বোস্তামী রোড ও চান্দগাঁও সিঅ্যান্ডবি এলাকাসহ নগরীর প্রায় সর্বত্রই ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে।

এসব রিকশাচালকরা চলছে নিজেদের ইচ্ছেমতো। তাদের বেশিরভাগই আনাড়িÑ এসব রিকশা চালানোর কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই তাদের। কাজের সন্ধানে নগরীতে এসেই এসব যান চালাতে নেমে পড়েছে। প্রচলিত অযান্ত্রিক রিকশা চালানো কষ্টসাধ্য বলে তারা যান্ত্রিক এই যান চালানোর দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু একে তো পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই, তার ওপর ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা না থাকায় এসব চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে অহরহ। চালকরা জানায়, এসব যান্ত্রিক রিকশায় শুধু সামনের চাকায় ব্রেক বসানো আছে। ফলে তাৎক্ষণিক ব্রেক ধরা সম্ভব হয় না। কোনো কারণে হঠাৎ ব্রেক কষতে গেলেই রিকশা যায় উল্টে। আহত হয় যাত্রীরা। এ ছাড়া অন্য যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়েও অনেক সময় চালকরা দুর্ঘটনা ঘটায়।

আন্দরকিল্লা থেকে বহদ্দারহাট যাওয়ার পথে কথা হয় এমনই একটি যানের চালক সুমন মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অনুমোদন না থাকলেও পেটের দায়ে আমরা সড়কে এসব গাড়ি চালাচ্ছি। এজন্য মালিককে দৈনিক দিতে হয় ৩০০ টাকা। এ ছাড়া ব্যাটারি চার্জ দিতে খরচ হয় ৪০ টাকা। চার ঘণ্টা চার্জ দিলে আট ঘণ্টা চালানো যায়।’

ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নগরীর সিরাজউদ্দৌলা সড়ক থেকে বাকলিয়া এবং পাহাড়তলী আমবাগান থেকে ওয়্যারলেস কলোনি পর্যন্ত এলাকায় ২০-২৫টি ব্যাটারি চার্জের গ্যারেজ গড়ে তোলা হয়েছে। এর কোনোটি বস্তির মধ্যে, আবার কোনোটি রাস্তার পাশের দোকানের পেছনে। একইভাবে হালিশহর, ছোটপোল, পাহাড়তলী আমবাগান ও কর্নেলহাট এলাকায় অনেক রিকশার মালিক নিজের ঘরের সংযোগ থেকে একাধিক রিকশায় চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন।

চট্টগ্রাম ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক-মালিক সমিতির কার্যকরী সদস্য মো. রহিম কোম্পানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে ৮ থেকে ১০ হাজার রিকশা নগরীর বিভিন্ন জায়গায় চলছে মামলা ও আটকের ঝুঁকি নিয়েই।’

নগর পুলিশের ট্রাফিক পরিদর্শক (উত্তর) সুভাষ চন্দ্র দে বলেন, ‘দরিদ্র রিকশাচালকদের রিকশা জব্দ হোক, এটা পুলিশ চায় না। কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পুলিশ অভিযান চালাতে বাধ্য। কিন্তু চালকরা যদি স্বেচ্ছায় নিজেরাই ব্যাটারি ও মোটর রিকশা থেকে খুলে ফেলেন, তাহলে তাদের গাড়ি জব্দ করা হবে না।’

অনুমোদনহীন এসব রিকশা চলাচল বন্ধে পুলিশের ব্যর্থতার কারণ জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) কুসুম দেওয়ান বলেন, ‘ব্যাটারি রিকশার বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানে নামলেও তা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। কারণ জব্দ করা রিকশা রাখার স্থান সংকুলান হচ্ছে না। জব্দকৃত ব্যাটারি ও রিকশা নিয়ে বিপাকে আছি আমরা।’

কুসুম দেওয়ান জানান, নগর ট্রাফিক পুলিশের হেফাজতে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার রিকশা জব্দ রয়েছে। এর বাইরে কমপক্ষে ৭ হাজার ব্যাটারি ও মোটর জব্দ রয়েছে। এসব ব্যাটারি ও মোটর ধ্বংসের জন্য ট্রাফিক বিভাগ থেকে চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে আবেদন করা হলেও এখনো অনুমতি মেলেনি। তাই নতুন অভিযানে জব্দ করা রিকশা, ব্যাটারি ও মোটর কোথায় রাখা হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় আছেন তারা।

এদিকে পিডিবির চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন বলেন, ‘ব্যাটারি রিকশায় আনুমানিক যে ৫০ হাজার ইউনিট বা কিলোওয়াট (৫০ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে তা সম্পূর্ণ অবৈধভাবেই হচ্ছে। ব্যাটারি রিকশায় যে বিদ্যুৎ খরচ হয় তা আলাদা করে তো হিসাব করা হয় না। এর কারণে নগরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহে হয়তো কোনো ঘাটতি হচ্ছে না, কিন্তু সরকারের অর্থ অপচয় তো হচ্ছে।’