সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ওয়াসিম আব্বাসকে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যার ঘটনায় মামলার ধারা পরিবর্তনসহ সাত দফা দাবিতে গতকাল সোমবার পরিবহন ধর্মঘট পালন করে সিলেট বিভাগীয় পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। সিলেট বিভাগজুড়ে পরিবহন ধর্মঘট ও এর কারণে যাত্রীসহ জনসাধারণ দুর্ভোগের শিকার হন। ঢাকার বাইরে দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
সিলেট : সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ঘোরী মোহাম্মদ ওয়াসিম আব্বাসকে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যার ঘটনায় জড়িত বাসচালক জুয়েল আহমদ ও চালকের সহকারী মাসুক আলীর বিরুদ্ধে করা মামলার ধারা (হত্যা মামলার ধারা) পরিবর্তনসহ সাত দফা দাবিতে সিলেটে পরিবহন ধর্মঘট পালন করছে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন।
গতকাল সকাল থেকে এ ধর্মঘট শুরু হয়। এ কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় যাত্রীসাধারণকে। এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীরা সকালে দুর্ভোগে পড়েন। শিক্ষার্থীসহ অনেককেই হেঁটে গন্তব্যে যাতায়াত করতে দেখা যায়। পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘটে ক্ষোভ প্রকাশ করে ‘পরিবহন মালিক, শ্রমিকদের স্বেচ্ছাচারিতার’ বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানায় তারা। গতকাল পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সিলেটের কোনো টার্মিনাল থেকে বাস ছাড়েনি। এমনকি লেগুনা, সিএনজি অটোরিকশাও চলাচল করেনি। যাতায়াতের জন্য নগরীর ভেতরে রিকশাই ছিল একমাত্র ভরসা। দূরের যাত্রীরা রেলস্টেশনে গিয়ে ভিড় করেন। তবে ট্রেনে উপচেপড়া ভিড়ের কারণে অনেকে গন্তব্যে যেতে পারেননি।
সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন নেতারা গত শনিবার সিলেটে সংবাদ সম্মেলন করে সাত দফা দাবিতে পরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতির ঘোষণা দেন। শ্রমিক ফেডারেশনের দাবির অন্যতম হচ্ছেÑ গত ২৩ মার্চ মৌলভীবাজার থানায় করা দুর্ঘটনার মামলা দ-বিধির ৩০২-এর স্থলে ৩০৪ ধারায় পরিবর্তন করা। এছাড়া সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর ১০৫ ধারায় জরিমানার পরিমাণ ৫ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৫০ হাজার টাকা করা, এই আইনের ৮৪, ৯৮ ও ১০৫ ধারাকে জামিনযোগ্য করা, ৮৪ ও ৯৮ পৃথক ধারায় জরিমানা ৩ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৩০ হাজার টাকা করা এবং জটিল দুর্ঘটনা তদন্ত সাপেক্ষে ধারা নির্ধারণ এবং তদন্ত কমিটিতে শ্রমিক প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে তারা।
সিলেট বিভাগীয় পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি সেলিম আহমদ ফলিক জানান, ৩০ এপ্রিলের (আজ মঙ্গলবার) মধ্যে দাবি মানা না হলে রোজার পর অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট আহ্বান করা হবে।
সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের হাওর এলাকা তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট এলাকা থেকে আবদুর রহমান তার মাকে নিয়ে সিলেটে ডাক্তার দেখাতে যাবেন। সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে এসে বিপাকে পড়েন। সব ধরনের দূরপাল্লার বাস চলাচল গতকাল সকাল থেকেই বন্ধ। সিলেট যেতে না পেরে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করে মাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে যান তিনি। এ বিষয়ে আবদুর রহমান বলছিলেন, ‘শ্রমিকদের কর্মবিরতি জানা ছিল না, আইস্যা বিপদে পড়ছি। বাধ্য হয়েই বাড়ি ফিইড়্যা যাইতাছি।’
গতকাল সকাল-সন্ধ্যা পরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে সুনামগঞ্জে হাজার হাজার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েন। বিশেষ করে ভ্যাপসা গরমে বাস টার্মিনালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে শিশু ও বৃদ্ধরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসহ সিলেট-সুনামগঞ্জ আন্তঃজেলা সড়কসহ বিভিন্ন সড়কে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ ছিল। ছোট যানবাহন, এমনকি অটোরিকশা চলাচলেও বাধা প্রদান করে বাস শ্রমিকরা।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জে কর্মরত জুবেদা খাতুন নামে এক শিক্ষিকা বলেন, ‘বাসস্ট্যান্ডে এসেছিলাম কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য, কিন্তু এসে দেখলাম সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ।’ তবে কর্মবিরতির কারণ ও উদ্দেশ্য জানাতে পারেনি সুনামগঞ্জে ধর্মঘটে অংশ নেওয়া অনেক পরিবহন শ্রমিক।
সিরাজুল ইসলাম নামে আরেক যাত্রী বলেন, ‘গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলাম, ছুটি শেষে পরিবার নিয়ে হবিগঞ্জ যাব। এখানে (বাসস্ট্যান্ডে) এসে দেখলাম পরিবহন ধর্মঘট। বউ-বাচ্চা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এখানে বসে আছি। আমাদের দুর্ভোগ দেখার কেউ নেই।’ সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ছাত্র ফরিদ হোসেন বলেন, ‘একজন ছাত্রকে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে হত্যা করার পর পরিবহন শ্রমিকরা এখন ঘাতক বাসচালক, হেলপারের মুক্তি দাবি করছে, আজব এক দেশে বাস করছি আমরা।’
মৌলভীবাজার : মৌলভীবাজারে পরিবহন শ্রমিক ধর্মঘটে জনসাধারণ ও যাত্রীরা পড়েন চরম দুর্ভোগে। ধর্মঘটের কারণে ভোগান্তিতে পড়েন শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ। যানবাহন চলাচল বন্ধ করে পরিবহন সেবা না দেওয়াতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। সকালে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জেলার বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তারা বলেন, ‘ধর্মঘটের কারণে ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়েছি। কিন্তু এখনো কোনো গাড়ি পাইনি। অনিশ্চয়তায় আছি পরীক্ষা দিতে পারব কি না।’
হবিগঞ্জ : সিলেট বিভাগীয় পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা পরিবহন ধর্মঘটে হবিগঞ্জে কোনো যাত্রীবাহী বাস চলাচল করেনি। যান চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েন যাত্রীসাধারণ। বিশেষ করে এইচএসসি পরীক্ষার্থী, কর্মজীবী নারী-পুরুষ, রোগী ও তাদের স্বজনরা গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়ে বিপাকে পড়েন।