বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে কাগজ শিল্পে ধস

বন্ধ হয়ে গেছে ৫০ কারখানা

রপ্তানি পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত আমদানি হওয়া কাগজ, বোর্ড, বস্ত্রসহ নানা পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি হওয়ায় টিকতে পারছে না দেশি শিল্প। বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পেরে লোকসান গুনছেন ৭০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে ওঠা কাগজ শিল্প। বন্ড সুবিধায় আমদানি হওয়া সস্তা কাগজের দাপটে টিকতে পারছেন না দেশীয় উৎপাদকরা। টানা লোকসানের কারণে এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৫০টি কাগজকল। অন্যগুলোও চলছে ধুঁকে ধুঁকে। একই অবস্থা বস্ত্র খাতেরও।

৭০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা বেসরকারি বস্ত্র খাতের মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পোশাক ঢাকাসহ সারা দেশের কোন কোন এলাকায় বিক্রি হচ্ছে, তার তালিকা তুলে ধরে চিঠি লিখে প্রতিকার চেয়ে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর কাছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের কাছেও আবেদন করে প্রয়োজনে পোশাক খাতের বন্ড সুবিধা বাতিল করার কথাও বলেছেন তারা। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর বাক্য উচ্চারণ করা হলেও তা থামছে না। প্রধানমন্ত্রীর       

 

 উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান পোশাক মালিকদের এক অনুষ্ঠানে বন্ড সুবিধার পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি বন্ধ করতে বলেছেন। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াও সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করার কথা বলেছেন। এসব হুঁশিয়ারি দমাতে পারেনি অবৈধ পণ্যের ব্যবসায়ীদের। ঢাকার নয়াবাজার, ইসলামপুর, ইপিজেড এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই ট্রাকে ট্রাকে নামছে বন্ড সুবিধার পণ্য। দেশে উৎপাদিত পণ্যের চেয়ে দাম কম হওয়ায় বিক্রিও হচ্ছে দেদার। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরা এই অপবাণিজ্যের বিরুদ্ধে কথা বললেও মাঠ পর্যায়ে তা ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা জানান, মুদ্রণ ও প্যাকেজিং শিল্পে ব্যবহৃত উন্নতমানের কাগজ এখন বাংলাদেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। দেশি কাগজকলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা দেশের মোট চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। বিদেশে কাগজ রপ্তানিও করছে বাংলাদেশ। দেশে উৎপাদিত কাগজ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ প্রিন্টিং প্রেসসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশগুলোতে রপ্তানি হচ্ছে দেশের কাগজ। চলতি অর্থবছরও ১৬৮ কোটি টাকার কাগজ রপ্তানি করেছে মিলগুলো। তা সত্ত্বেও সরকার বিভিন্ন খাতের জন্য বন্ড সুবিধায় কাগজ আমদানির সুযোগ দিয়ে রেখেছে, যার বড় অংশই খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে। এতে কাগজশিল্প রুগ্ণ হয়ে পড়ছে। সংকুচিত হচ্ছে কর্মসংস্থান; রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। 

রাজধানীর নয়াবাজারসহ বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তৈরি পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন রপ্তানি খাতে ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের টিস্যু কাগজ, ডুপ্লেক্স বোর্ড, নন-কার্বন রিকোয়ার্ড (এনসিআর) আর্ট কার্ডসহ বিভিন্ন ধরনের কাগজের দরকার হয়। দেশের মিলগুলোও এসব কাগজ ও বোর্ড উৎপাদন করে। কিন্তু রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে অসাধু গার্মেন্টস মালিকরা বাড়তি মুনাফার আশায় খোলাবাজারে তা বিক্রি করে দিচ্ছে। মানে ভালো না হলেও দেশি কাগজের তুলনায় দাম কম হওয়ায় বন্ড সুবিধার ওইসব পণ্য কিনে নেন স্থানীয় অন্যান্য খাতের ব্যবসায়ীরা।

নয়াবাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সব দোকানেই বিপুল মজুদ রয়েছে শুল্কমুক্ত কাগজের। প্রতিটি দোকানই প্রকাশ্যেই বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। তবে রাত ১১টার পর এসব কাগজ আনা-নেওয়া করেন ব্যবসায়ীরা। বন্ডের কাগজ খোলাবাজারে বিক্রির নেপথ্য হিসেবে নয়াবাজারের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ পেপার মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও মেসার্স এ হোসেন ট্রেডার্সের মালিক আবুল হোসেনকে দায়ী করেছেন। তার নেতৃত্বেই বন্ড সুবিধার কাগজ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল হোসেন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বন্ড সুবিধায় আমদানি হওয়া কাগজ নয়াবাজারে বিক্রি হয় না, এ কথা আমি বলতে পারব না। অন্য সবার দায়িত্ব তো আমি নিতে পারব না। অন্যরা বিক্রি করে কি না, সে বিষয়ে আমি কিছু বলব না। তবে আমি বিক্রি করি না।’

 

বন্ড সুবিধার কাগজ অবৈধভাবে যাতে অন্য সদস্যরা বিক্রি না করতে পারেন, ‘সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে সে বিষয়ে আপনার দায়িত্ব রয়েছে।’ এমন বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘কে বিক্রি করে, না করে- সে বিষয়ে আমার কোনো দায়িত্ব নেই। যাদের স্বার্থ আছে, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারে।’ 

বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) সচিব নওশেরুল আলম জানান, দেশে ছোট-বড় কাগজকল রয়েছে ১০৬টি, যেগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ছয় লাখ টন। এটি চাহিদার আড়াই গুণেরও বেশি। ৭০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বন্ড সুবিধার কাগজের কাছে বাজার হারিয়ে ধসে পড়ছে শিল্প। অসম প্রতিযোগিতায় হেরে এরই মধ্যে ৫০টি কল বন্ধ হয়ে গেছে। বেকার হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন সরাসরি জড়িত ১৫ লাখ শ্রমিক।

 

এ সব বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে আগামী বাজেটে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বন্ডের পণ্য যাতে খোলাবাজারে না যায়, সে বিষয়ে সদস্যদের সতর্ক করতে বলা হয়েছে পোশাক খাতের মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে।

কাগজের মতোই বন্ড সুবিধার পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি হওয়ায় উৎপাদিত সুতা ও কাপড় বিক্রি করতে পারছে না বস্ত্র খাতের মিলগুলোও। গত ২৩ এপ্রিল বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে লিখেছেন, বিটিএমএর সদস্য মিলগুলো ৭০০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেছে, যা দেশের বেসরকারি উদ্যোগে একক কোনো খাতের মধ্যে সর্বোচ্চ। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা কাপড় ও সুতা, বিদেশি শাড়িসহ বিভিন্ন পোশাক ঢাকার ইসলামপুর, নারায়ণগঞ্জের টানবাজার, আড়াইহাজার, বাবুরহাট, মাধবদী, নরসিংদী, গোপালদী, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জসহ অন্যান্য স্থানে বিক্রির কারণে দেশি মিলগুলোর উৎপাদিত সুতা ও কাপড় প্রকৃত মূল্য পাচ্ছে না। এতে মিলগুলোর সুতা ও কাপড় বিক্রি অনেকটাই কমে গেছে। এর প্রভাবে এসব এলাকায় থাকা দুই লাখেরও বেশি পাওয়ার লুমের অর্ধেকেরও বেশি বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে স্পিনিং ও উইভিং মিলের ওপর। ক্রমাগত লোকসানের মুখে মিলগুলোর আর্থিক কাঠামো অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তিনি লিখেছেন, যেভাবে বিদেশ থেকে শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধায় আসা সুতা ও কাপড় যেভাবে খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে, তাতে দেশি সুতা ও কাপড়ে ভ্যাট বসানো হলে তা আর বিক্রি করা সম্ভব হবে না। আমদানি করা সুতা ও কাপড়ের বাস্তব ও গ্রহণযোগ্য ট্যারিফ ভ্যালু নির্ধারণ এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউজের মাধ্যমে আমদানি করা সুতা ও কাপড়ের মোড়কে ‘নট ফর সেল’ লেখা বাধ্যতামূলক করার কথা বলেছেন তিনি।

এর আগে সালমান এফ রহমানের কাছে করা আবেদনে বিটিএমএ বলেছে, বাংলাদেশের বস্ত্র খাতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে, তাতে বন্ড সুবিধায় কাপড় আমদানির সুযোগ বন্ধ করা হলেও তৈরি পোশাক খাতের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না।