‘পায়ুপথে’ ইয়াবা বহন

পিসপ্রতি ‘ভাড়া’১০ টাকা

নানা কৌশলে পাচার হলেও এখন রাজধানীতে বেশিরভাগ ইয়াবাই আসছে পায়ুপথে। যাত্রাবাড়ী, গাজীপুর, জয়দেবপুর ও টঙ্গী এলাকার মাদক কারবারিদের বেশিরভাগই আশ্রয় নিচ্ছে এই কৌশলের। এ জন্য বাহককে প্রতি পিস ইয়াবার জন্য ‘ভাড়া’ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে ১০ টাকা করে।  মাদকটির পাচার প্রতিরোধে এই কৌশল ঠেকানোর ওপর জোর দিচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম।

গতকাল রবিবারও রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে পায়ুপথে ইয়াবা বহনচক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের পায়ুপথ থেকে এক হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।

ডিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, গাজীপুর, জয়দেবপুর ও টঙ্গী এলাকার বিভিন্ন মাদক কারবারি তাদের পায়ুপথে ইয়াবা পরিবহনে দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন, বিশেষ করে কক্সবাজার ও সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুর পর্যন্ত পায়ুপথে এক পিস ইয়াবা বহনের জন্য বাহককে ১০ টাকা করে দিয়ে থাকেন তারা।

ডিবির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের উপকমিশনার (ডিসি) মীর মোদাছছের হোসেন জানান, মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জিরো টলারেন্সের কারণে ব্যবসায়ীরা কৌশল বদলে এখন বাহকের পায়ুপথে বা কোলনে ভরে ইয়াবা নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। রবিবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে এমনই একটি গ্রুপকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের পায়ুপথ থেকে এক হাজার পিস ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। এরা হচ্ছে ইসমাইল হোসেন (২০), শামীম (১৮) ও শাহীন (২৩)।  গতকাল ভোরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে ডিবি পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে।

তিনি জানান, পায়ুপথে ইয়াবা বহনকারী চক্রের আরও বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে, যারা একইভাবে পৃথক বাসে ইয়াবার একাধিক চালান নিয়ে রাজধানীতে ঢুকেছে।

গ্রেপ্তারকৃত ইসমাইল হোসেন জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তার বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগের ইদুরপাড়া গ্রামে। তার বাবা তোতা মিয়া এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী। বাবা-মাসহ পরিবারের সবাই জানেন, তিনি গাজীপুর ও জয়দেবপুর রোডে গাড়ি চালান। প্রকৃতপক্ষে তিনি গাড়ি না চালিয়ে গাজীপুরের মাদক কারবারি ইব্রাহিমের মাদকের বাহক হিসেবে কাজ করছিলেন।

ইসমাইল জানান, ৩-৪ বছর আগে থেকেই গাজীপুরের বড়বাড়ি এলাকার একই জায়গায় বসবাসের সূত্রধরে ইব্রাহিমের সঙ্গে তার পরিচয়। তার কাছে কোনো কাজ দেওয়ার কথা বললে, ইয়াবা বহনের প্রস্তাব দেন। প্রতি পিস ইয়াবা বড়ি বহনের জন্য ১০ টাকা দেওয়া হতো। সেই হিসাবে এক হাজার ইয়াবা বড়ির জন্য ১০ হাজার টাকা পেয়েছেন একাধিকবার। সর্বশেষ ইব্রাহিমের নির্দেশনায় গত বৃহস্পতিবার ইসমাইল তার পরিচিত অপর এক রাজমিস্ত্রিকে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজারের রামুতে যান। সেখানকার এক কারবারির কাছ থেকে এক হাজার ইয়াবা বড়ি নিয়ে কলাতলী বিচের একটি হোটেলে ওঠেন। সেখানে একটি কক্ষে রাতে ইয়াবা বড়িগুলোর ছোট ছোট পোঁটলা তৈরি করেন। প্লাস্টিকের কাগজে মোড়ানো প্রতিটি পোঁটলায় ২০টি করে ইয়াবা বড়ি রাখেন। এভাবে ৫০ পোঁটলা তৈরি করে ইসমাইল নিজের পায়ুপথে একে একে তা ভরে রাখেন। এরপর রাতেই কক্সবাজার থেকে বাসযোগে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।

ডিবির উপকমিশনার মীর মোদাছছের হোসেন বলেন, রোগীকে যেভাবে সাপোজিটর দেওয়া হয়ে থাকে, ঠিক সেভাবেই ইসমাইল তার পায়ুপথে এতগুলো পোঁটলা ভরে ঢাকায় নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। ডিবি কার্যালয়ের বাথরুমে বসে তিনি ওই সব পোঁটলা পায়ুপথ থেকে বের করে দেন। তার বিরুদ্ধে রাজধানী ও গাজীপুরের বিভিন্ন থানায় ৫টি মাদক মামলা রয়েছে।

গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ইসমাইল জানান, এতগুলো পোঁটলা পায়ুপথে প্রবেশ, বহন ও বের করার সময় অনেক কষ্ট হয়, তারপরও টাকার জন্যই এভাবে কষ্ট স্বীকার করি। বাড়িতে সবাই জানে, আমি গাড়ি চালাই। কিন্তু এভাবে ইয়াবা বহনে যে টাকা পাই, তার থেকে কিছু টাকা বাড়িতে পাঠাই।

তার সহযোগী শামীম পুলিশের কাছে দাবি করেছেন, তার বাড়ি নওগাঁয়। পেশায় রাজমিস্ত্রি। ইসমাইল তাকে কক্সবাজার ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে যে ইয়াবা বহন করছিল, তা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে জানতে পারেননি।

সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনের সহকারী কমিশনার সোলায়মান বলেন, ইসমাইল রুট চেনানোর জন্যই তাকে (শামীম) নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তাকেই মূল বাহক হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্য ছিল।

ডিবির একাধিক কর্মকর্তা জানান, সাধারণত মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ইয়াবা বহনের পুরনো রুট। বর্তমানে ভারত থেকে সিলেট, কুমিল্লার রৌমারী, পটুয়াখালী ও সুন্দরবনের রুটও ব্যবহার করছে ইয়াবা কারবারিরা। বেশির ভাগ সময়ে ‘বাহক’ ধরা পড়লেও মূল কারবারিরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের অতিরিক্ত উপকমিশনার জসিম উদ্দীন বলেন, আগের চেয়ে ইয়াবার ব্যবহার ও ব্যবসা কমে গেলেও বর্তমানে রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, জয়দেবপুর ও টঙ্গী এলাকার মাদক করবারিরা ইয়াবা পরিবহনের ক্ষেত্রে পায়ুপথে বেশি ইয়াবা নিয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে মাদক কারবারিরা বিভিন্ন পেশার মানুষকে বেশি মুনাফার আশা দেখিয়ে বাহকের কাজে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করছে।