প্রাচীন বঙ্গের শেকড় সন্ধানী জ্ঞানতাপস আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার ১০১তম জন্মবার্ষিকী মঙ্গলবার। বরেণ্য প্রত্নতত্ত্ববিদ, পুঁথিসাহিত্য বিশারদ, অনুবাদক ও ইতিহাসবিদ যাকারিয়ার জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীতে গ্রন্থ ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং যোগীর গানের আয়োজন করেছে ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি।
মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালার পরীক্ষণ থিয়েটার হলে এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। অনুষ্ঠানে আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার জীবন ও কর্ম নিয়ে বক্তব্য রাখবেন এবং স্মৃতিচারণ করবেন প্রত্নতত্ত্ববিদ, স্থপতি, ইতিহাসবিদ, ক্রীড়া সংগঠক ও তার পরিবারের সদস্যরা। অনুষ্ঠানটি আয়োজনে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী।
সংক্ষিপ্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর মঞ্চে যোগীর গান পরিবেশন করবেন নাটোরের বেলাল প্রামাণিক ও তার দল। বাংলার পুঁথিসাহিত্য সম্পাদনায় আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার ‘কবি শুকুর মামুদ বিরচিত গুপিচন্দ্রের সন্ন্যাস’ এবং ‘বাঙলা সাহিত্যে গাজী কালু ও চম্পাবতীর আখ্যান’ গ্রন্থ দুটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
যাকারিয়া রচিত প্রায় অর্ধশত গ্রন্থের মধ্যে ‘গুপিচন্দ্রের সন্ন্যাস’ই তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ, যার বিষয়বস্তু নাথ ধর্মের সাধন পদ্ধতি ও যোগীদের আখ্যানকাব্য। এ কারণেই যাকারিয়ার জন্মবার্ষিকীর আয়োজনে রাজধানীর দর্শকদের সামনে ঐতিহ্যবাহী এই দেশীয় শিল্পরীতির চর্চাকারী শিল্পীদের অংশগ্রহণে ‘যোগীর গান’ পরিবেশন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আয়োজকরা।
আয়োজক ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি জানিয়েছে— মুঘল, নবাবি, এমনকি কোম্পানি আমলেও নাথ গুরুদের জীবন ও দর্শনভিত্তিক আখ্যানকাব্য গীত ও নৃত্য সহযোগে পরিবেশনের রীতি বাংলায় বেশ জনপ্রিয় ছিল। তবে এখন নাথ-যোগীদের আখ্যানকাব্য পরিবেশনা বিরল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন মূলত নাটোর ও রাজশাহী অঞ্চলের কয়েকটি স্থানে যোগীর গানের চর্চা হয়ে থাকে। যোগীর গানের শিল্পীরা মূলত শ্রমজীবী মানুষ। তবে, সংগীত তাদের কাছে পেশা নয়-দর্শন চর্চার অংশ।
যোগীর গানের শিল্পী মো. বেলাল প্রামাণিকের বাড়ি নাটোর শহর থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে দিঘাপতিয়া গ্রামে। ২০ বছর যাবৎ তিনি যোগীর গান পরিবেশন করে আসছেন। যোগীর গানের বিখ্যাত শিল্পী প্রয়াত পঞ্চানন হালদার তার গুরু। বেলাল প্রামাণিক যোগীর গান ছাড়াও মাদারের গান পরিবেশন করে থাকেন।
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ১ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার দরিকান্দি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর প্রথমে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে অবিভক্ত বাংলার বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের সর্বশেষ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি অঙ্গনের পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে তাকে সচিব পদ থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ ফেব্রুয়ারি ৯৮ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার অধিকাংশ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে সরকারি চাকরি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর। তার দীর্ঘজীবন ছিল কর্মমুখর। আজীবন তিনি গবেষণাকাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে তিনি আমৃত্যু ঢাকার স্থাপত্য বিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হিসাবে কাজ করেছেন। ঢাকার আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষার শিলালিপির পাঠ, উচ্চারণ ও অনুবাদের সম্পাদনা কাজ সমাপ্ত করে গেছেন। যা এখন প্রকাশের অপেক্ষায় আছে।
বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম এবং বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত সর্ববৃহৎ মিউজিয়াম দিনাজপুর জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। বিভিন্ন সময়ে তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের সভাপতি, বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালনসহ সামাজিক কাজের নেতৃত্বদান করেছেন। কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে তাকে একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে দেয়া রাষ্ট্রপতি পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও পদক প্রদান করা হয়।
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার রচিত, অনূদিত ও সম্পাদিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: বাঙলাদেশের প্রত্নসম্পদ, বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচিতি, বাংলা সাহিত্যে গাযী-কালু ও চম্পাবতীর উপাখ্যান, গুপিচন্দ্রের সন্ন্যাস, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা, কুমিল্লা জেলার ইতিহাস, বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস, সিয়ার-উল-মুতাখ্খিরিন, তবকাত-ই-নাসিরী, মোযাফফর নামা ইত্যাদি।