প্রচ্ছদ রচনা

নজরুলের কাব্যভাষার প্রধান কয়েকটি দিক

সংস্কৃত ও বাংলা ভাষার গাম্ভীর্য, হিন্দুস্তানি ভাষার চপলতা এবং আরবি ও ফারসি শব্দভাণ্ডারের শক্তিশালী অনুষঙ্গ, ধ্বনি, সুর, উচ্চারণভঙ্গি ও সাংস্কৃতিক আবহকে একত্রিত করে নজরুল বাংলা কাব্যে নতুন এক ভাষাসৌন্দর্যের জন্ম দিয়েছিলেন। এই প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলামের কবিভাষার স্বাতন্ত্র্য, বৈপ্লবিক চরিত্র ও তার ভাষার বহু সাংস্কৃতিক নির্মাণ প্রক্রিয়া বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে

আপডেট : ২৫ মে ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম

নান্দনিক বিবেচনায় নজরুলের কাব্যভাষার অন্যতম প্রধান বিশিষ্টতা এর সমকাললিপ্ততা। হাসান হাফিজুর রহমান লক্ষ করেছেন, নজরুল বাংলা কাব্যের হাতে বর্তমানকে তুলে দিয়েছেন। নজরুল-কাব্যের পঠন-পাঠনে সাধারণভাবে একে বিষয়গত দিক থেকেই বিবেচনা করা হয় এবং হাসান হাফিজুর রহমানও অনেকটা সেভাবেই দেখেছেন। বিষয়ের দিক থেকে ‘অকাব্যিক’ হওয়া সত্ত্বেও অর্থাৎ স্থান-কালের সমসাময়িকতায় ভর দেওয়া সত্ত্বেও নজরুলের কবিতা কাব্যিক আবেগ তৈরি করে—এ বাস্তবতাকে তিনি দেখেছেন ‘প্যারাডক্স’ হিসেবে। তিনি যদি একে নন্দনতাত্ত্বিক বর্গ হিসেবে বিবেচনা করতেন, তাহলে হয়তো অন্যতম সাফল্য হিসেবেই দেখতে পেতেন।

নজরুলের কাব্যভাষা গভীরভাবে এবং বহুমাত্রিক অর্থে সমকালীন। বাখতিনীয় পরিভাষা মোতাবেক, এর ভাষা উপন্যাসিত বা নভেলাইজড; এ অর্থে যে, কবিভাষার অসামান্য বিশেষত্ব রক্ষা করেও সময় এবং স্থানের বিচিত্র স্বরের সংস্থানে তা আগ্রহ ও সাফল্য দেখিয়েছে। অন্যদিকে ওয়াল্টার বেনজামিনের কথা ধার করে বলতে পারি, এ সমকালীনতার প্রধান বৈশিষ্ট্য ‘জনতার উত্থান’। সিনেমার নন্দনতত্ত্ব তালাশ করতে গিয়ে বেনজামিন লক্ষ করেছেন, ‘মননশীল ও গভীর অনুধ্যানী’ ব্যক্তির বিপরীতে ইউরোপীয় সমাজে যে ‘জনতার উত্থান’ ঘটছিল, সিনেমা বস্তুত তারই অনুকূল শিল্পমাধ্যম। নজরুলের কবিভাষা ও রূপকল্প সম্পর্কেও প্রায় অনুরূপ বলা চলে। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রত্যক্ষতা, রুশ বিপ্লবের আঁচ আর মুসলমান জনগোষ্ঠীর মূলধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্তির মধ্য দিয়ে যে নতুন জনতার আবির্ভাব ঘটেছিল ‘সমকালে’, এ কাব্যভাষায় পাওয়া যায় তার তীব্রতম নান্দনিক প্রকাশ।

অন্যদিকে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় লক্ষ করেছেন, নজরুল প্রথম বাঙালি কবি যিনি বিশুদ্ধ ক্রোধকে কবিতায় রূপান্তরিত করেছেন। প্রধানত সমকালকে যথার্থ ও ন্যায্য ভাষায় পরিস্ফুট করার স্বার্থেই নজরুলের কাব্যভাষা ক্রোধকে অবলম্বন করেছিল। বাংলা কবিতার পূর্বতন ভাষা ছিল মুখ্যত শান্ত-সমাহিত। তাতে সম্ভাবনার আবাহন ছিল; ছিল আদর্শ অবস্থার প্রস্তাবনা। কিন্তু পরিবর্তিত বাস্তবতায় দরকারি হয়ে উঠেছিল পেশল অজাচার আর অসংযমের বেহিসাবি প্রকাশ। নজরুলের কবিভাষার গুরুত্বপূর্ণ একাংশে বীররস আর বীভৎস রসের যৌথতায় ভেঙে পড়েছিল ভিক্টোরীয় সুমিতির বন্ধন। বাংলা কাব্যভাষা তাতে সম্পূর্ণ নতুনরূপ পরিগ্রহ করল। মুজফ্ফর আহমদ লিখেছেন : 
আমাদের বাংলা ভাষা চিরদিন নজরুল ইসলামের নিকট ঋণী থাকবে। আমাদের ভাষা মিষ্ট। আমাদের ভাষা সুকোমল। শ্রেষ্ঠ গীতিকবিতা আমাদের ভাষায় রচিত হতে পারে এই ছিল আমাদের ধারণা। আমাদের ভাষায় জোর নেই, সংগ্রামশীলতা নেই, এই ধারণা আমাদের মধ্যে বদ্ধমূল ছিল বলেই আমরা স্লোগান দিতাম হিন্দুস্তানিতে। নজরুল ইসলামের অভ্যুদয়ের পর আমরা বুঝেছি যে, বাংলা ভাষাও জোরালো, সংগ্রামশীল ও অসীম শক্তিশালিনী। ... নজরুলের সামরিক শিক্ষা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মিশে যাওয়ায় তার কলম হতে এত জোরালো ভাষা বের হওয়া সম্ভব হয়েছে।

নজরুলের কাব্যভাষা হাজির করেছে বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও প্রায় একমাত্র বিপ্লবী ইমেজ। বিপ্লব একটি রাজনৈতিক ও দার্শনিক বর্গ। এর বাইরে বিপ্লবী মুহূর্তের কিছু পূর্বশর্ত থাকে; থাকে ঘটমানতা ও বিপ্লব-পরবর্তী আশাবাদ। এর প্রতিটি অঙ্গই নজরুলের কাব্যভাষার বদান্যতায় কাব্যিক ইমেজে প্রকাশিত হয়েছে। ছাঁচাছোলা বিপ্লবী ইমেজের সঙ্গে নজরুল নিপুণভাবে যুক্ত করেছেন ব্রিটিশ-বিরোধী লড়াইয়ের সম্ভাব্য পরম রূপ, আর বিপ্লবের নৈতিক-দার্শনিক ভিত্তি। সমালোচকরা এ দুটি দিক বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন, কিন্তু সাধারণভাবে আবশ্যিক নজরুলীয় বর্গ হিসেবে ‘বিপ্লব’ গত একশ বছর প্রায় অনুল্লিখিতই থেকে গেছে। ‘বিদ্রোহ’ বর্গটার ওপর অধিকতর জোর পড়া এর অন্যতম কারণ।

‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার একাংশ এ নিরিখে পাঠ করা যাক। কবিতাটি বস্তুত সর্বাত্মক বিপ্লবের প্রস্তাবনা। এখানে ধ্বংস ও সৃষ্টির কথা আছে; মানুষের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা আছে; আছে সে পরিবর্তনের নৈতিক-দার্শনিক প্রস্তাব। কবিতা থেকে একটা অংশ উদ্ধৃত করা যাক :
ঐ সে মহাকাল-সারথি রক্ত-তড়িত-চাবুক হানে,
রণিয়ে ওঠে হ্রেষার কাঁদন বজ্র-গানে ঝড়-তুফানে!
খুরের দাপট তারায় লেগে উল্কা ছুটায় নীল খিলানে!
গগন-তলের নীল খিলানে।
অন্ধ কারার বন্ধ কূপে
দেবতা বাঁধা যজ্ঞ-যূপে
পাষাণ-স্তূপে!
এই তো রে তার আসার সময় ঐ রথ-ঘর্ঘর—
শোনা যায় ঐ রথ-ঘর্ঘর।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্‌।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর্‌॥

‘রণিয়ে ওঠে হ্রেষার কাঁদন বজ্র-গানে ঝড়-তুফানে’ পঙ্‌ক্তিটি পরীক্ষা করলে বিপ্লবী ইমেজ হিসেবে কবিতাটি পড়ার গভীরতর তাৎপর্য উন্মোচিত হবে। ‘রণিয়ে ওঠে’ এক পরিকল্পিত শ্রুতি-ইমেজ, যা যুদ্ধের বিশদ ছবি প্রকাশ করে। অন্যদিকে রণলিপ্ত অশ্বের ‘কাঁদন’ কথাটা প্রসারিত তাৎপর্য পায়, যদি বিপ্লবী ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে কাজ-করা নৈতিক-দার্শনিক পটভূমির কথাটা মনে রাখি। ‘বজ্র-গান’ ও ‘ঝড়-তুফান’ দুটিই যুদ্ধ, ধ্বংস ও বিশৃঙ্খলার স্মারক—সেও বিপ্লবের সাধারণ চিত্র। পরের ছবিতে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড অসীম বিস্তৃতি পায়। আকাশে উল্কাপাতের নতুন কার্যকারণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আর তাকে নীল আকাশের পটভূমিতে স্থাপন করে কবি সাধারণ ছবিকে উন্নীত করেন বিপ্লবের চিত্রকল্পে। পুরো ছবিটি অঙ্কিত হয় মহাকালের সক্রিয়তায়। তার রথযাত্রার প্রকট আওয়াজ কানে আসার সময় সমাগত; কারণ সবচেয়ে আশা-জাগানিয়া ক্ষেত্রগুলোও আজ অন্ধকারের পাষাণস্তূপে বন্দি। রথে আসীন মহাকালের চিত্রকল্পে রবীন্দ্রনাথের রাজার প্রতিধ্বনি পাওয়া অসম্ভব নয়। তবে ওই সাম্য যদি কল্পিত হয়ও, দুয়ের ফারাকটাই তাতে বড় হয়ে ওঠে। সদৃশ ইমেজের মধ্যে প্রকটিত হয় ‘ইভোল্যুশনে’র সঙ্গে ‘রেভল্যুশনে’র ফারাক।

বহিরঙ্গে নজরুলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার সংগীতময়তা। শব্দালঙ্কার, অন্ত্য ও মধ্যমিল, নৃত্যপর ছন্দের কুশলী বিন্যাস আর ধ্বন্যাত্মক শব্দের দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রতুলতা সে ভাষার প্রধান অবলম্বন। অন্তরঙ্গেও কবিতাগুলোর প্রধান অবলম্বন সুর, আর সুরের পৃষ্ঠপোষকতায় জমে ওঠা গতি। অনেক কবিতায় সুরের অধীনেই কবি শব্দ-সঞ্চয় করেছেন। অর্থের তুলনায় সুরই সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে। সুরের উচ্চ নিনাদে বীররসের সংগতি রক্ষার খাতিরে তিনি আমদানি করেছেন বাংলা কবিতার নতুন শব্দস্বভাব যা, সৈয়দ আলী আহসানের ভাষায়, ‘বাংলা কবিতার বহুদিনকার অলস শব্দসুষমার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ’। সৈয়দ আলী আহসান আরও লিখেছেন :
শব্দকে কাজী নজরুল ইসলাম একটি প্রবল স্রোতধারার প্রবাহের মতো ব্যবহার করেছেন যে ভঙ্গিকে ইডিথ সিটওয়েল পর্বত-শিখর থেকে নিম্নভূমিতে গড়িয়ে পড়ার ভঙ্গি বলে আখ্যাত করেছেন। একটি প্রবল প্রবাহে যেমন কোনো বিশেষ অঞ্চল অথবা উপলখণ্ড অথবা ভঙ্গুর তরঙ্গচূর্ণ কোনোটাই বিশেষভাবে চোখে পড়ে না, চোখে পড়ে শুধু একটি তীব্র যাত্রা, তেমনি নজরুল ইসলামের ‘অগ্নি-বীণা’য় কোনো বিশেষ শব্দ, কোনো চরণ অথবা কোনো স্তবক বিশেষ মূল্য লাভ করেনি। বিচ্ছিন্নভাবে কোনোটাই আমাদের শ্রুতিগোচর অথবা নয়নগোচর হয় না। কিন্তু প্রতিটি কবিতায় স্রোতধারার মতো একটি প্রবল গতি আমরা লক্ষ করি। একটি কবিতায় সমগ্রভাবে এ গতিটি আমাদের শ্রুতি এবং অনুভূতিতে জাগে।

এ বর্ণনায় নজরুলকাব্যের শব্দ-স্বভাবের খুব নিগূঢ় কিছু বিশিষ্টতা উন্মোচিত হয়েছে। তবে গতি ও প্রবাহের দিকে নজর দিতে গিয়ে এখানে ইমেজ ও অর্থগত তাৎপর্য বাদ পড়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ কাব্য একই সঙ্গে চিত্রাত্মক ও ধ্বন্যাত্মক। চিত্র ও চিত্রকল্পের ভেতর দিয়ে শ্রুতি-প্রধান বোধি ও অনুভূতি সঞ্চার করাই এর লক্ষ্য। এ বাস্তবতা শ্রবণেন্দ্রিয়ের সঙ্গে কবিতার পুরনো সখ্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়। ছাপাখানার আধিপত্যের মধ্যে শিল্পভোগের ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়ের যে রূপান্তর ঘটেছে, অর্থাৎ শ্রুতির পরিবর্তে যেভাবে দৃষ্টির প্রাধান্য স্থাপিত হয়েছে, তার ইতিহাস মনে রাখলে আধুনিক কবিতায় চিত্রকল্পের প্রাধান্যের ব্যাপারটিও বোঝা যাবে, আর ভিন্ন আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কান-নির্ভর কবিতার তাৎপর্যও আন্দাজ করা যাবে। নজরুলের সফল কবিতাগুলোর কাব্যভাষায় এ দুইয়ের সর্বোত্তম সমন্বয় ঘটেছিল।

এ কারণেই কবিতাগুলো ব্যক্তিগত পাঠের পাশাপাশি সামষ্টিক উপভোগেরও শিল্প। ব্যক্তিগত পাঠের সাহিত্য সাহিত্যের একটি ধরন মাত্র এবং অবশ্যই প্রভাবশালী ও উপযোগী ধরন, যা বিকশিত হয়েছে শিল্পবিপ্লবোত্তর উৎপাদন-সম্পর্কের বিশেষ স্তরে। কিন্তু এর বাইরেও কবিতার আছে অসংখ্য ধরন, ব্যবহার ও উপযোগিতা। নজরুলের কাব্যভাষা মুখ্যত কাজ করেছে সামষ্টিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে, কবিতার উচ্চারণরীতিতে এনেছে সেই বিশিষ্টতা, যার দৌলতে দশের কথা দশকে সহসাই স্পর্শ করে যায়। পুরো ব্যাপারটি আমাদের পূর্ব-কথিত ‘জনতার উত্থানে’র সঙ্গে নিগূঢ়ভাবে সম্পর্কিত।

নজরুল-কাব্যের শব্দভাণ্ডারের মূল বনিয়াদ গড়ে উঠেছে সংস্কৃত-বাংলার আনুকূল্যে। অভিধাটি রবীন্দ্রনাথের। এ ভাষারীতির যে প্রতাপশালী সংস্কৃতি কলকাতায় উনিশ শতকে গড়ে উঠেছিল, তার প্রতি নজরুল প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সময়টা ছিল সমঝোতার। সুরটা ছিল সমন্বয়বাদী। নজরুল এ আবহে গভীরভাবে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ-সূত্রে। মনে রাখা দরকার, কলকাতার হিন্দু-মধ্যবিত্ত সংস্কৃতিতে নজরুল প্রাথমিক প্রবেশাধিকার আদায় করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে; আর তার অনেকগুলো গ্রন্থনাম রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকেই নেওয়া। তবে সংস্কৃত-বাংলায় তার গভীর অধিকার জন্মেছিল আসলে আরও আগেই—কিশোরকালের লেটোদলের নিবিষ্ট চর্চা থেকে। হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতির বিপুল নামশব্দ নজরুলের সামগ্রিক কাব্যভাষার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেগুলোকে বিপ্লব-বিদ্রোহের অসংযমী শৃঙ্খলায় বিন্যস্ত করার অভাবনীয় সাফল্য পরবর্তীকালের; কিন্তু ওই ভাষার সঙ্গে তার নিবিড় পরিচয় অনেক আগের।

মুসলমান-সমাজের সাহিত্যপ্রয়াসী তরুণ হিসেবে এ ভাষার সঙ্গে নিবিড় পরিচয় অর্জনের ক্ষেত্রে এবং চর্চার ক্ষেত্রে তার বস্তুত কোনো বাধাই ছিল না। কারণ গুরুত্বপূর্ণ মুসলমান লেখকরা নজরুলের আগের প্রজন্ম থেকেই প্রমিত বাংলায় এবং ক্ষেত্রবিশেষে বঙ্কিমীয় ও রাবীন্দ্রিক তৎসমবহুল বাংলায়—লেখালেখি করতেন। এ ধারা শুরু করেছিলেন মীর মশাররফ হোসেন আর এ ধরনের সমন্বয়-প্রয়াসী বাংলার আবহেই নজরুল বড় হয়েছেন। তিনি এর সঙ্গে নতুনভাবে যোগ করেছেন প্রধানত হিন্দুস্তানি বাংলা বা দোভাষী পুঁথির কিছু কার্যকর স্বভাব। বস্তুত সংস্কৃত-বাংলার সঙ্গে হিন্দুস্তানি-মিশ্রিত বাংলার কাব্যিক যোগসাধনই সম্ভবত নজরুলের কবিভাষার সবচেয়ে ঈর্ষণীয় পাটাতনটা তৈয়ার করেছিল।

তার কবিতায় আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে তত্ত্বতালাশ যথেষ্ট হলেও হিন্দুস্তানির প্রভাব ও ভূমিকা সম্পর্কে আলাপ দেখা যায় না। হিন্দুস্তানি ভারতবর্ষের একসময়কার অত্যন্ত প্রভাবশালী লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা; অন্যদিকে আরবি-ফারসি একদিকে ‘বিদেশি’, আর অন্যদিকে মুখ্যত কেতাবি। হিন্দুস্তানি না বলে উর্দু-হিন্দির কথা বললেও ভারতীয় ভাষার কথাই বলা হয়। কিন্তু আমাদের প্রায় যাবতীয় ডিসকোর্সে আলাপটা হিন্দুস্তানি বা হিন্দি-উর্দুর বরাতে না হয়ে আরবি-ফারসির ভিত্তিতে যে হয়, তার পেছনে উনিশ শতকের জটিল সাংস্কৃতিক রাজনীতি মুখ্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। ভারতীয় মুসলমানদের ‘বিদেশি’ বলার ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক ‘সুবিধা’র সঙ্গে এই পুরো প্রকল্প অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। এ বিষয়ের অধিকতর বিস্তার বর্তমান প্রসঙ্গের জন্য জরুরি নয়। বিষয়টা স্পষ্ট করার স্বার্থে শুধু একটি উদাহরণ দেব। পুরনো পুঁথিসাহিত্যের ভাষায় আরবি-ফারসি ইত্যাদি হরেক রকমের ভাষার মিশ্রণ ঘটেছে বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। কিন্তু সাধারণভাবে এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে হিন্দুস্তানির নাম নেওয়া হয় না। অথচ বাস্তবতা হলো, সেকালে হিন্দুস্তানি এমনকি ইউরোপীয় বণিকদের ব্যবহৃত ভাষাগুলোর মধ্যেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর ব্যবহারগত বিস্তার বোঝা যাবে শুধু এ উদাহরণ থেকেই যে, ইউরোপীয়রা ভারতীয় ভাষাগুলোর মধ্যে হিন্দুস্তানি নিয়েই সবচেয়ে বেশি ব্যাকরণ প্রণয়ন করেছিল আর এগুলো বেশ জনপ্রিয়ও হয়েছিল। এই বাস্তবতা মাথায় রেখে কথিত পুঁথির ভাষাকে হিন্দুস্তানি এবং বাংলার ব্যবহারিক-প্রায়োগিক মিশ্রণ হিসেবে দেখলে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে বিস্তর সুবিধা পাওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের প্রভাবশালী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে তেমনটা প্রায় দেখাই যায় না। নজরুলের ক্ষেত্রেও প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটেছে। তার হিন্দি গান, বাঙালির প্রায় অচেনা হিন্দুস্তানি লব্জ, হিন্দি-হিন্দুস্তানি শব্দরূপের ব্যবহার ইত্যাদি প্রত্যক্ষ উপাদানের উপস্থিতি সত্ত্বেও ‘আরবি-ফারসি’ বর্গের বাইরে আলোচনাটা যায়নি।

বস্তুত নজরুলের বাকরীতির বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ স্বভাব এসেছে হিন্দুস্তানি থেকে আর নজরুল এ উত্তরাধিকার সন্দেহাতীতভাবে পেয়েছেন তার সময় পর্যন্ত অত্যন্ত সচল পুঁথিসাহিত্যের ধারা থেকে। ‘কামাল পাশা’, ‘আনোয়ার’, ‘রণ-ভেরী’, ‘শাত-ইল-আরব’, ‘কোরবানি’ ইত্যাদি কবিতা শব্দ-সঞ্চয়, সুর-বিন্যাস এবং উচ্চারণভঙ্গির দিক থেকে দোভাষী পুঁথির প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার বহন করছে।

কিন্তু কবিভাষা তো শব্দসঞ্চয় নয়, বরং শব্দের অন্বয়; উপাদানের গ্রন্থনা নয়, বরং ভাবের অনুকূলে উপাদানের যথার্থ বিন্যাস; বাচ্যার্থ নয়, বরং অভাবনীয় সব ব্যঞ্জনার রহস্যময়তা। সেদিক থেকে দেখলে ক্রোধ, বিপ্লব-বিদ্রোহ, বর্তমানময় বাস্তবতা এবং অন্যায্যতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম : বাংলা কবিতায় ইতিপূর্বে প্রায় অনুপস্থিত এসব উপাদানকে কাব্যভাষার অধীন করতে পারাই নজরুলের কবিভাষার সর্বোত্তম অর্জন। এর সঙ্গে প্রধানত প্রেম-প্রকৃতির কবিতায় যুক্ত হয়েছে বৈষ্ণব কবিতার আবহ, লোককবিতার উচ্চারণভঙ্গি, নারীসুলভ কথ্যভঙ্গি এবং সাধারণ বাতচিতের বিচিত্র উপাদান। আবদুল মান্নান সৈয়দ নজরুলকে বলেছেন ‘অন্তমিলের সম্রাট’। এটা আসলে সুর-সম্মোহনের অংশ, সুরের যে সম্মোহন নজরুলের কবিতায় কেবল শব্দের চলন নিয়ন্ত্রণ করেনি, শব্দরূপকেও বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে। আরও দুটো উপাদান নজরুলকে দারুণভাবে আবিষ্ট করে রেখেছিল বলেই মনে হয়। একটা হলো, ধ্বন্যাত্মক শব্দের নিপুণ সংস্থান আর অন্যটা ছন্দ-মিলের অটুট সমঝোতায় শব্দ-সমাবেশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত