আবরার জাগিয়ে দিল ৮ বছর পরও ছেলে হত্যার বিচার না পাওয়া মায়ের বেদনা

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন (চমেক) আবিদুর রহমান আবিদ। ২০১১ সালের ১৯ অক্টোবর চমেক এর তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবিদুর রহমান আবিদকে ছাত্রলীগ কর্মীরা পিটিয়ে গুরুতর জখম করে। দুদিন পর ২১ অক্টোবর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

অনেকটা বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদের মতোই নির্মমভাবে নিহত হন আবিদ। তাকে হত্যার ঘটনায় আন্দোলনের মুখে ছাত্র রাজনীতিও নিষিদ্ধ হয় চমেকে।

তবে আবরার হত্যার যথাযথ বিচার দাবিতে যখন সবাই তৎপর, তখন আবিদের মা আট বছর পর সংবাদ সম্মেলন করে তার ছেলেকে হত্যার বিচার পাননি বলে দাবি জানান।

সোমবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এসে সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আবিদের মা সৈয়দুন্নেসা। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে আবিদ হত্যার বিচার চাই, সব আসামিদের ফাঁসি চাই’।

আবিদ হত্যার বিচার ৮ বছরেও হয়নি জানিয়ে ‘ন্যায়বিচার’ চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে পরিবার।

পাশাপাশি আবিদ হত্যা মামলার আসামিরা খালাস পাওয়ায় উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে জানান তারা।

ওই ঘটনায় আবিদুরের মামা নেয়ামত উল্লাহ চৌধুরী বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় চমেক ছাত্রলীগের ভিপি মফিজুর রহমান জুম্মান এবং জিএস হিমেল চাকমাসহ ২২ জনকে আসামি করে মামলা করেন।

সোমবার সংবাদ সম্মেলনে আবিদের বোন মোরশেদা ইয়াসমিন বলেন, ‘আবরারকে যেভাবে হত্যা করা হয় সেভাবে আট বছর আগে আবিদকেও হত্যা করা হয়। যদি আবিদ হত্যার বিচার হতো তাহলে আবরার হত্যা হতো না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল প্রার্থনা, আবরার হত্যার আসামিদের যেভাবে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তেমনি আবিদ হত্যা মামলার আসামিদের যেন আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা হয়’।

সোমবার সংবাদ সম্মেলনে নিহত আবিদের বড় ভাই জিল্লুর রহমান লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা শেষে কলেজ ক্যাম্পাস থেকে আবিদকে ধরে নিয়ে যায় তারই সহপাঠী ও সিনিয়র ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা। আবিদকে কয়েক ঘণ্টা হকিস্টিক, লাঠি, স্ট্যাম্প ও লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছিল। ছাত্র সংসদ নামের টর্চার সেলে আবিদের ওপর ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তিন-চার ঘণ্টা নির্যাতনের খবর পেয়েও চমেক কলেজ প্রশাসন আবিদকে বাঁচাতে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি’।

তিনি আরো বলেন, ‘চমেক হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা না করিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আন্দোলনে বাধ্য হয়ে ২০ অক্টোবর সকালে তাকে চমেকের আইসিইউতে ভর্তি করানো হয়। ২১ অক্টোবর রাতে আবিদ মারা যায়। আবিদকে তাৎক্ষণিক চমেকে ভর্তি করানো হলে আমরা ভাই হারাতাম না’।

এ ঘটনায় জড়িতদের বাঁচাতে এবং আন্দোলন থামাতে তখন অনির্দিষ্টকালের জন্য চমেক ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা হয় বলেও সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

‘কলেজ প্রশাসনের ইন্ধনে এবং খুনিদের প্ররোচনায় চার্জশিটে আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়’ অভিযোগ করে আবিদের বড় ভাই জিল্লুর রহমান বলেন, ‘২০১২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দেওয়া চার্জশিটে আসামিদের মধ্যে ১০ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে তাদের অব্যাহতি দিতে আবেদন করে পুলিশ।’

বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যার পর জড়িতদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ ও বুয়েট প্রশাসন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু আবিদ হত্যার পর চমেক প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি দাবি করেন আবিদের বোন মোরশিদা ইয়াসমিন। 

ওই চার্জশিট দেওয়ার কোনো খবর মামলার বাদী ও আবিদের মামা নেয়ামত উল্লাহ চৌধুরী পাননি বলেও দাবি করেন জিল্লুর রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে জিল্লুর রহমান জানান, ওই মামলায় চলতি বছরের ১৭ জুলাই দেওয়া রায়ে সব আসামিকে বেকসুর খালাস দেন। আমরা এই রায়ে সংক্ষুব্ধ বিধায় উচ্চ আদালতে আপিল করব। আশা করি আমরা উচ্চ আদালতে আবিদ হত্যার ন্যায়বিচার পাব। আর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃষ্টি কামনা করছি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আবিদের ভাই মনসুরুল আহমেদ, ছোট বোন সাজেদা ইয়াসমিন, শাহেদা ইয়াসমিন ও ভগ্নিপতি সোহেলসহ পরিবারের সদস্যরা।