চট্টগ্রামের পাথরঘাটার বিস্ফোরণের দুদিন হয়ে গেলেও কারণ এখনো অজানা। কারণ উদঘাটনে গঠিত পৃথক তিন কমিটির কোনোটিই স্পষ্ট করে বলেনি কিছু। এ ঘটনায় আহত ওই ভবনের নিচতলার এক বাসিন্দার বক্তব্য অনুসারে, ঘরে জমে থাকা গ্যাস আগুনের স্পর্শ পেয়ে বিস্ফোরিত হয়। তদন্ত দলগুলোও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটার বিষয়ে তার বক্তব্য মেনে নিয়েছে। তবে ঘরে জমা গ্যাস কি লাইনের গ্যাস ছিল, নাকি সেপটিক ট্যাংকের তার কোনো জবাব মেলেনি। শুধু কেজিডিসিএল পক্ষ থেকে জোর দাবি করে বলা হয়েছে, গ্যাসলাইনের ত্রুটি থেকে ওই বিস্ফোরণ ঘটেনি। গত রবিবার সকালের ওই বিস্ফোরণে ভবনটির নিচতলার দেয়াল ও সীমানা প্রাচীর ধসে রাস্তার ওপর পড়লে পথচারীরাও হতাহত হয়। ভবনটির উল্টো দিকের ভবনের নিচতলার
দোকানও বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই ঘটনায় রবিবারই গঠিত হয়েছে চসিক, সিএমপি ও জেলা প্রশাসনের পৃথক তিন তদন্ত কমিটি। ওই তদন্ত কমিটিগুলোর অনুসন্ধান এখনো চলছে।
দুর্ঘটনার পরপর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়া বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন মহল থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে, জরাজীর্ণ গ্যাসলাইন কিংবা রাইজার থেকে লিকেজ হওয়া গ্যাস জমা হয়েই এ বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। তবে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি বিস্ফোরণের ৯ ঘণ্টার মধ্যে দেওয়া তদন্ত রিপোর্টে বলেছে, গ্যাসের লাইন কিংবা রাইজারে কোনো লিকেজ ছিল না। গ্যাসলাইনের লিকেজের কারণে এ বিস্ফোরণ ঘটার মতো কোনো নমুনা সেখানে পাওয়া যায়নি। তাদের দাবি, সেপটিক ট্যাংকের থেকে ঘরে গ্যাস জমা হয়ে এ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সন্ধ্যা রানীর সঙ্গে ঘটনার বিষয়ে গত রবিবার কথা বলেছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার লোকজন। তিনি তাদের জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাসায় আগুন ধরানোর জন্য দেশলাইয়ের কাঠি জ¦ালাতেই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। তিনি নিজে এবং ঘটনার সময় বাসায় থাকা বোনের মেয়ে অর্পিতার শরীর দগ্ধ হয়েছে বিস্ফোরণের আগুনে। তার এ বক্তব্যের সূত্র ধরে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, কোনোভাবে ওই ঘরে প্রচুর গ্যাস জমা হয়েছিল। আগুনের ছোঁয়া পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়।
হতাহতের ঘটনায় মামলা : এদিকে বিস্ফোরণে সাতজন নিহতের ঘটনায় অবহেলাজনিত মৃত্যু ও ক্ষতিসাধনের অভিযোগে মামলা হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেলে মামলাটি করেন বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহত রিকশাচালক মাহমুদুল হকের স্ত্রী শাহীনা আক্তার। মামলায় দুজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্তের স্বার্থে মামলায় উল্লেখ করা দুজনের নাম বলা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে সূত্র জানিয়েছে, মামলায় ভবন মালিক অমল বড়য়া ও তার ভাই টিটু বড়–য়ার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
হাসপাতালে চলছে আহতদের আর্তনাদ : নোয়াখালীর বাসিন্দা কিশোর মো. আরিফ রিকশায় ফিশারিঘাট থেকে শুভপুর বাসস্ট্যান্ড যাচ্ছিল বাড়ি ফিরবে বলে। রিকশায় তার সঙ্গে ছিলেন ফুফাতো ভাই ফিশারিঘাটের ট্রলার শ্রমিক ইউনুস ও ইউনুসের সহকর্মী ইসমাইল। তাদের বহনকারী রিকশাটি রবিবার সকালে পাথরঘাটার ব্রিক ফিল্ড রোডের বড়–য়া বিল্ডিংয়ের সামনে যেতেই বিকট বিস্ফোরণে ছিটকে গিয়ে পড়ে দেয়ালের নিচে। ওই ঘটনায় আরিফসহ রিকশার তিন আরোহী আহত হন। ওই ঘটনায় নিহত অন্যদের মধ্যে রয়েছেন রিকশাচালক মাহমুদুল হকও। দুই পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়ায় আরিফের আর নোয়াখালী যাওয়া হয়নি। আপাতত ঠাঁই হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের অর্থোপেডিক ওয়ার্ডে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আরিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেয়ালের নিচ থেকে কে বের করেছে জানি না। এরপর একটা পিকআপে তোলা হয় আমাদের। সেখানে রিকশাচালককেও দেখেছিলাম। তখন তার জ্ঞান ছিল না। পিকআপে কয়েকজনের নিচে চাপা পড়েছিলাম।
আরিফের বাবা মো. সিরাজ জানান, নোয়াখালী জেলার মাইজদী থেকে ফুফাতো ভাই ইউনুসের সঙ্গে শনিবার চট্টগ্রাম গিয়েছিল আরিফ। ওই রাতে ইউনুস ফোন করে জানায়, আরিফ আবদার করায় তাকে চট্টগ্রাম নিয়ে গেছে। রবিবার তার বাড়ি চলে যাওয়ার কথা ছিল। মেডিকেলের এক ডাক্তার ফোন করে জানান আরিফ হাসপাতালে।
পাথরঘাটা বিস্ফোরণে আহত আরিফের ফুফাতো ভাই নোয়াখালী সদরের মো. ইউনুছ ক্যাজুয়ালিটিতে চিকিৎসাধীন। তিনি জানান, হঠাৎ ওই বিল্ডিংটা অতিক্রম করতেই বিকট শব্দে দেয়াল রিকশার ওপর পড়ে। এরপর আর কিছু মনে নেই। ট্রলার শ্রমিক ইউনুছ আরও জানান, তার সহকর্মী ইসমাইলের কোনো স্বজন এখনো আসেনি।
এ ঘটনায় গুরুতর আহত সেন্ট জনস্ স্কুলের শিক্ষিকা টিসা গোমেজ (২২) বর্তমানে আইসিউতে চিকিৎসাধীন। তার ভাই রিগ্যান গোমেজ বলেন, স্কুলে যাচ্ছিল সকালে। এরপর আমরা তাকে মেডিকেলে খুঁজে পাই। ডাক্তাররা বলেছেন, ৭২ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রয়েছে। তার এখনো জ্ঞান ফেরেনি।
পাথরঘাটার বড়–য়া বিল্ডিংয়ের নিচতলার বাসিন্দা অর্পিতা নাথ ওই ঘটনায় দগ্ধ হন। চমেক হাসপাতালের উপপরিচালক আখতারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিস্ফোরণে দগ্ধ অর্পিতা নাথকে ঢামেকের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়েছে। বাকি ৮ জনকে এখানে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে টিসা গোমেজ, নজির (৬৫) ও আবদুল হামিদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
ওই ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ছয়জনের লাশ রোববার শনাক্ত করা হলেও বাকি একজনকে শনাক্ত করা হয় সোমবার। ওই ব্যক্তি হলেন মাহমুদুল হক (৩০)। রিকশাচালক মাহমুদুল নগরীর বাকলিয়া থানার ভেড়া মার্কেটের বাসিন্দা। তিনি লোহাগাড়া উপজেলার আন্ধারমানিক গ্রামের আবুল হাশেমের ছেলে।
চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল হক ভূইয়া বলেন, মাহমুদুল হকের মরদেহ তার চাচাত ভাই সাদ্দাম হোসেনসহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।