সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) পক্ষে-বিপক্ষে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে গতকাল মঙ্গলবারও বিক্ষোভ হয়েছে। সবচেয়ে সহিংস উত্তরপ্রদেশের মেরঠ জেলায় নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে পুলিশ ফেরত পাঠিয়েছে। গত রবিবার তৃণমূল কংগ্রেসের চার সদস্যকেও বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হয়েছিল। বাধা পেয়ে বোনকে নিয়ে দিল্লি ফেরার আগে রাহুল গান্ধী বলেন, ‘আমরা আটকে দেওয়ার বিষয়ে পুলিশের কাছে সরকারের নির্দেশনা দেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা দেখাতে পারেনি। শুধু বলেছে, আপনারা দয়া করে ফিরে যান। এটা অগ্রহণযোগ্য।’
সিএএ ও এনআরসি নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে গতকাল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টারের (এনপিআর) জন্য ৮ হাজার ৫০০ কোটি রুপি বরাদ্দের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। আসাম বাদে সব রাজ্য ও কেন্দ্রীয়শাসিত অঞ্চলে আদম শুমারিখ্যাত এনপিআর হবে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালা রাজ্য আগেই এনপিআর স্থগিত রেখেছে। রাজ্যে তারা সিএএ ও এনআরসি বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে। এরই মধ্যে এনপিআরের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যগুলোর সংঘাত বাড়াবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে বরাদ্দের ঘোষণা দিয়ে কেন্দ্রীয় তথ্য সম্প্রচারমন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর বলেছেন, বায়োমেট্রিক নয়, এনপিআরে আগের মতোই বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। কোনো পরিচয়পত্র ও নথির প্রয়োজন হবে না।
নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে গতকাল কলকাতায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে ফের বিশাল মিছিল হয়েছে। বিধান সরণি থেকে বেলেঘাটা পর্যন্ত মিছিলে হাঁটেন তিনি। মিছিল শুরুর আগে স্বামী বিবেকানন্দের বাড়ির সামনে জমায়েতে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ করে বক্তব্য দেন মমতা। তিনি বলেন, বিজেপি ধর্ম নিয়ে বিভাজনের রাজনীতি করছে। বাংলায় কোনো এনআরসি ও সিএএ হবে না। আমরা হিন্দু-মুসলমান ভাগাভাগি করতে দেব না। ভারতে শুধু বিজেপি থাকবে, তা হবে না।
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দিল্লিতে স্বরাজ অভিযান দলের প্রধান যোগেন্দ্র যাদবের নেতৃত্বে বিক্ষোভ হয়েছে। যন্তরমন্তরেও বিক্ষোভ করেছেন একদল আন্দোলনকারী। পিটিআই বলছে, তামিলনাড়ুর সালেম সিটিতে আইনবিরোধী বিশাল বিক্ষোভ হয়েছে। আর গুজরাটে ক্ষমতাসীন বিজেপি আইনের পক্ষে বড়সড় শোডাউন করেছে।
তবে সিএএ নিয়ে বিজেপির অবস্থানের সমালোচনা করেছেন তাদের কলকাতা ইউনিটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসের নাতি চন্দ্র কুমার বোস। সোমবার টুইটে তিনি বলেন, ‘সিএএ যদি কোনো ধর্মের জন্য না হয়, তাহলে কেন হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান জৈন ও পার্সিদের কথা উল্লেখ করছি! কেন মুসলিমদেরও অন্তর্ভুক্ত করছি না? আসুন স্বচ্ছ হই।’ নিজের অবস্থানের পক্ষে আরেক টুইটে চন্দ্র কুমার বলেন, ‘মুসলিমরা যদি নিজেদের দেশে অত্যাচারিত না হন, তাহলে তারা এ দেশে আসতেন না। তাই তাদের অন্তর্ভুক্ত করায় কোনো ক্ষতি নেই। তাছাড়া এ ধারণা পুরোপুরি সত্যিও নয়– পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে বসবাসকারী বালুচ মুসলিম বা পাকিস্তানের আহমদিয়া মুসলিমদের কী অবস্থা? ভারত সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের জন্য উন্মুক্ত একটি দেশ।’
এনআরসি ও সিএএ’র বিরোধিতা করে আগেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের সমাবর্তনে রাজ্যপাল তথা আচার্যকে বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল। গতকাল ঘেরাও-বিক্ষোভের মুখে আচার্য জগদীপ ধনখড় ফিরে যেতে বাধ্য হন। কালো পতাকা হাতে শিক্ষার্থীরা ‘গো ব্যাক’ সেস্নাগান দেন। পরে তার চেয়ার ফাঁকা রেখে সমাবর্তন হয়। চলে যাওয়ার আগে ক্ষোভ প্রকাশ করে রাজ্যপাল বলেন, ‘রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। রাজ্যপাল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে এটা আমার কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক মুহূর্ত। আমি মর্মাহত। পরিকল্পিতভাবে এ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। এটা পুরোপুরি প্রশাসনিক ব্যর্থতা। দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
আসামের এনআরসি নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে গত ১২ ডিসেম্বর সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন পাস করে সংসদ। এরপর থেকেই এ আইনের বিরুদ্ধে ভারতজুড়ে বিক্ষোভ হচ্ছে। বিভিন্ন রাজ্যের বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বহু আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে।