বাংলা সাহিত্যে প্রত্যেক কবির একটা ভাবমূর্তি দাঁড়িয়ে যায়। কেউ পল্লিকবি, কেউ বিশ্বকবি, নাগরিক কবি, আধুনিক কবি, মরমি কবি, বিপ্লবী কবি, গণমানুষের কবি ইত্যাদি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাগ্যেও একটি পদবি তৈরি হয়ে গেছে সেই ১৯২০ সাল থেকে ‘বিদ্রোহী কবি’।
অনেকের ধারণা নজরুলের জীবনে শুধুই বিদ্রোহ, শুধুই ঝড়ের তাণ্ডব। প্রকৃত প্রস্তাবে নজরুলের জীবনে যে হাস্যরস, যে আনন্দময় দিক ছিল তা উপেক্ষিত থেকেছে আলোচনায়। সেই শূন্য জায়গায় আলো ফেললেন লেখক তাপস রায়। ‘রসিক নজরুল’ শীর্ষক একটি দুর্দান্ত গ্রন্থ রচনা করে তিনি আমাদের সামনে তুলে আনলেন আরেক অজানা নজরুলকে।
গ্রন্থের মুখবন্ধে হায়াৎ মামুদ লিখেছেন: ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’- এমন এমন অদ্ভুত শিরোনামে কবিতা- ভাবা যায়! তাপস রায় রসিক নজরুল লিখে ভুল করেননি।’
গ্রন্থের মূল্যায়নমূলক লেখায় আহমদ রফিক একটা মানবিক গোপনকে স্পর্শ করতে চেয়েছেন- ‘তাপসের বই পড়লে মনে হতে পারে, নজরুল যেমন প্রবল উচ্ছ্বাসে হাসতেন এবং অন্যদেরও হাসাতেন। আসলে সেটাই শেষ ও সব কথা নয়। দারিদ্রাবস্থার সঙ্গে বরাবর লড়াইয়ে নজরুলের এসব হাসি ঠাট্টার নেপথ্যে ছিল সঙ্গোপন কান্না।’
‘যৎকিঞ্চিৎ’ শিরোনামে তাপস রায় নিজেই বলেছেন, ‘নজরুল বাঁধনহারা ছিলেন। তাই বলে প্রতিপক্ষকে কখনো কটূবাক্যে আক্রমণ করেছেন তাঁর শত্রুরাও এ কথা বলবে না। তবে প্রয়োজন হলে জবাব দিয়েছেন হাসির গান গেয়ে অথবা ব্যঙ্গ ছড়া লিখে। যেমন কবি গোলাম মোস্তফা যখন নজরুল সম্পর্কে লিখলেন:
‘কবি নজরুল ইসলাম/ বাসায় একদিন গিছলাম/ ভায়া লাফ দেয় তিনহাত/ হেসে গান গায় দিন রাত...।
নজরুল এর উত্তরে লিখলেন:
‘গোলাম মোস্তফা/ দিলাম ইস্তফা।’
তাপস একজন অনুসন্ধিৎসু লেখক। এই বইটি রচনার আগে তিনি বিস্তর জানতে চেষ্টা করেছেন নজরুল সম্পর্কে। বইয়ের সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি দেখলে বোঝা যায় পরিশ্রমের পরিধি। মেম সাহেবের বাংলা, বৈষ্ণব তো নয়, অভিনব মিল, ডাবজল, সত্যিকার সম্পর্ক, চায়ের নেশা, পঞ্চ মুদ্রা কোরবানি, ঘটক, এত চা এত জল, কাকের তাড়া, তেঁতুল গাছে দই, কলজে দিয়ে গান ইত্যাদি শিরোনামে ছোট ছোট ঘটনার বর্ণনা করেছেন যা অভিনব এবং চমকপ্রদ। ঘটনাগুলোর মধ্যে রসিকতা যেমন আছে তেমন নজরুলের ব্যক্তিত্বও সহজেই বোঝা যায়।
বইয়ের এক ঘটনায় নজরুলকে চেনা যায়- তিনি বলছেন, ‘নবাবরা নজরুলকে দেখার জন্য কুর্নিশ করবে এটাই তো নিয়ম।’ কেউ অটোগ্রাফ চাইতে এলে দাম দিতে হবে এমন হাস্যরসও তিনি করতেন কখনো কখনো।
নজরুলের বিশ বছরে সাহিত্য সাধনার জীবন কিন্তু ঘটনাবহুল। এই গ্রন্থে আরও একটি ঘটনা সন্নিবেশিত হতে পারে। নিশ্চয় পরবর্তী সংস্করণে লেখক তা করবেন। একটি হলো- নজরুল চমৎকার রান্না করতে পারতেন।
জেলখানায় তিনি যখন রান্না করতেন সকলে খাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকত।
নজরুলের জীবনে হাস্যরস যেমন আছে বেদনার চিহ্নও কম নয়। বাংলা সাহিত্যে বিখ্যাত মানুষদের জীবনে হাস্যরসের নানা উপাদান আমাদের আনন্দিত করে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত এ ধরনের নানা হাস্যরস আমাদের জানা আছে। ঠাকুরবাড়িতে পাগলামি সংক্রান্ত অনেক ঘটনা আমাদের কৌতূহল তৈরি করে দেয়।
সম্প্রতি সাহিত্য থেকে হাস্যরস কিংবা রসরচনা নির্বাসিত। সেই শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা গল্প, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পদ্য, সুকুমার রায়ের ছড়া, অন্নদাশঙ্কর রায়ের গল্প ও ছড়া আমাদের প্রফুল্লতা দেয়। হুমায়ূন আহমেদের নাটক এবং কিছু উপন্যাসের মধ্যে হাস্যরস ও কৌতুক দেখা যায়। এই শূন্য জায়গায় সাহস করে পা ফেলেছেন তাপস রায়।
নজরুলেল জীবন ও কর্ম থেকে নেওয়া খণ্ড খণ্ড ঘটনার কোলাজ ‘রসিক নজরুল’ গ্রন্থটি। তাপস রায় মাইকেল মধুসূদন দত্তসহ জসীমউদ্দীন, অধুনা শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ প্রমুখের হাস্যরস গল্পের মঞ্চায়ন করতে পারেন।
বর্তমান গ্রন্থটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, সামগ্রিক নজরুলকে আবিষ্কারের জন্য ‘রসিক নজরুল’ এর আবশ্যকতা অনিবার্য।
লেখালেখির জন্য স্টিভেনসনের একটি কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে লেখা পাঠে আনন্দ পাওয়া যায় সেই লেখা গুরুত্বপূর্ণ- বাকি সব নিরর্থক। আমি একজন পাঠক হিসেবে বলতে চাই- তাপস রায়ের লেখা আমাকে আনন্দ দিয়েছে। আমি একটা সুখকর অনুভবের জায়গা থেকে ‘রসিক নজরুল’ গ্রন্থটি পাঠ করেছি। বইটিতে গৌতম ঘোষের প্রচ্ছদ চমৎকার। পাঞ্জেরি পাবলিকেশনসকে ধন্যবাদ এ রকম একটি চিত্তাকর্ষক গ্রন্থ প্রকাশ করার জন্য।