আরও ৫০ লাখ পরিবারের তালিকা করা হচ্ছে। তাদের ১০ টাকা কেজি দরের চাল দেওয়া হবে। এর ফলে মোট এক কোটি পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। স্বামী-স্ত্রী, দুই সন্তান ও পিতা-মাতাকে নিয়ে এক কোটি পরিবার মানে হচ্ছে ছয় কোটি মানুষ। এই বিপুলসংখ্যক মানুষ যদি স্বল্পমূল্যের এ চাল পান তাহলে তারা করোনাভাইরাসের দুর্যোগ মোকাবিলায় সাহস পাবেন। আমাদের অতিদরিদ্র ও দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪ কোটির কিছু বেশি। আরও প্রায় দুই কোটি মানুষকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে। কিন্তু নতুন করে ৫০ লাখ মানুষকে তালিকাভুক্ত করাটাই এই সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, অতীতে সব সরকারই এ ধরনের তালিকা করার সময় দলীয় নেতাকর্মীদের প্রাধান্য দিয়েছে। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ওপরে উঠতে পারলেই এই কর্মসূচি সফল হতে পারে।
সাবেক স্থানীয় সরকার কমিশনের প্রধান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ এম এম শওকত আলী গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের উদ্দেশ্য খুবই মহৎ। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তালিকাটি করবেন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তৃণমূল পর্যায়ের মেম্বার-চেয়ারম্যানরা। তারা ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদেরই এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করবেন। নিরপেক্ষভাবে এই তালিকা করা হলে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারত।’
তালিকা কাদের দিয়ে করানো উচিত জানতে চাইলে সাবেক এই সচিব বলেন, ‘তালিকা করানো উচিত নিরপেক্ষ কোনো প্রফেশনাল বডিকে দিয়ে। এটা অল্প সময়ের কাজ নয়। অনেক সময় নিয়ে এ তালিকাটি করা হলে উপকার পাওয়া যেত। কারণ এদের নানা সুবিধা দেওয়া হয়। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর প্রায় সব সুবিধাই তো তাদের জন্য। একটা তালিকা থাকলে খুব সহজেই বাছাই করা যেত কে কোন ভাতা বা সুবিধা পাচ্ছেন। কারণ নানা ধরনের কর্মসূচি রয়েছে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ হরেক রকম ভাতা। একটি যথাযথ তালিকা থাকলে এখানে স্বচ্ছতা চলে আসত।’
গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন সরকার আরও ৫০ লাখ গরিব মানুষকে রেশন কার্ড দেবে। এই কার্ডের মাধ্যমে তারা ১০ টাকা কেজি দরের চাল কিনতে পারবেন। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিভাগের বিভিণ্ণ জেলার প্রশাসক, কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠককালে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
খাদ্য সচিব ড. নাজমানারা খানুম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। একটি কমিটি এ দায়িত্ব পালন করছে। সেই কমিটিতে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য থেকে শুরু করে, মসজিদের ইমামসহ সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, দেশে সার্বিক দরিদ্র্যের হার এখন ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। আর অতি দারিদ্র্যের হার নেমেছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে। এর মানে ৪ কোটিরও বেশি মানুষ দরিদ্র, এর মধ্যে অর্ধেকের অবস্থা আরও খারাপ। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের (বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি) মতে, যেসব ব্যক্তি দিনে ২ হাজার ১২২ ক্যালরির নিচে খাদ্যগ্রহণ করার সামর্থ্য রাখে, তাদের দরিদ্র এবং যারা দিনে ১ হাজার ৮শ’ ক্যালরির নিচে খাদ্যগ্রহণ করার সামর্থ্য রাখে, তাদের অতিদরিদ্র বা চরমদরিদ্র বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৯৯০ সালের পর গত বছর দারিদ্র্যের সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ করছে বিশ্বব্যাংক। নতুন এ সংজ্ঞা অনুযায়ী, দৈনিক ১ দশমিক ৯০ ডলারের (১৪৮ টাকা) কম আয় করা মানুষ দরিদ্র বলে গণ্য করা হয়। এর আগে দৈনিক ১ দশমিক ২৫ ডলারের (৯৭ দশমিক ২৭ টাকা) কম আয় করাদের দরিদ্র বলে সংজ্ঞায়িত করেছিল সংস্থাটি। জাতিসংঘের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যেসব ব্যক্তি দিনে ১ দশমিক ২৫ ডলার, অর্থাৎ ১শ টাকার কম ব্যয়ে জীবনধারণ করে তারা অতিদরিদ্র।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমদ বলেন, তালিকা তৈরিতে সদিচ্ছার প্রমাণ দেওয়া উচিত। কারণ এই কর্মসূচিটি সরকারের সবচেয়ে বড় কর্মসূচির একটি। আমরা অতীতে দেখেছি প্রম ৫০ লাখের তালিকায় অনেক ধনী ব্যক্তির নাম ছিল। নতুন তালিকায়ও এ ধরনের নাম যেন না থাকে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তালিকার বিষয়ে জানতে চাইলে শেরপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ফিরোজ আল মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বজনপ্রীতি বা রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে বের হয়ে করোনায় কর্মহীন মানুষের তালিকা করতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের কোনো কোটা দেওয়া হয়নি। প্রত্যেক ওয়ার্ডে একটি কমিটি করে বলে দেওয়া হয়েছে, যতজন কর্মহীন মানুষ আছে, সবার তালিকা পাঠতে। ওই কমিটির প্রধান হিসেবে রয়েছেন ওয়ার্ড মেম্বার বা কমিশনার। সচ্ছতার জন্য কমিটিতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও মসজিদের ইমামকে যুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেরপুর পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আমির হোসাইন বাদশা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি আমার এলাকার প্রতিটি ঘরে গিয়ে কর্মহীন মানুষদের ভোটার কার্ড (এনআইডি) সংগ্রহ করছি। যাদের এনআইডি নেই তারা এমনিতেই তালিকা থেকে বাদ পড়বেন। এক্ষেত্রে মসজিদের ইমাম ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে দিয়েছে সরকার। সেই কমিটির সুপারিশ থেকেই এ তালিকা পাঠানো হবে। এক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি করা হচ্ছে না। জানতে চাইলে শেরপুর জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুব দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্থানীয় সরকারের অধীনে এই তালিকা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমরা সমাজসেবা অফিসার, কৃষি কর্মকর্তাসহ মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা নিচ্ছি। তিনি বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুসারে স্থানীয় চেয়ারম্যান ও তার সদস্যরা এক্ষেত্রে সহযোগিতা করবেন। কারণ সরকারি কর্মকর্তারা এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা নয়। ফলে এই অঞ্চলে কে গরিব কে অসহায় তা বলা কঠিন। এটা স্থানীয় প্রতিনিধিরা ভালো জানেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী, অসচ্ছল, এতিম ও করোনার কারণে কর্মহীন মানুষের তালিকা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতাও নেওয়া হচ্ছে। নিরপেক্ষ তালিকার বিষয়ে জানতে জামালপুরের জেলা প্রশাসক এনামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিরপেক্ষ তালিকা করতে প্রয়োজন সবার সহযোগিতা ও ভালো মনমানসিকতা। বিশ্বজুড়ে করোনা সমস্যায় আছে শত কোটি মানুষ। অনেক প্রাণহানি হচ্ছে। এই অবস্থায় সবাই রাজনীতি ও স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের সহযোগিতায় কাজ করবে বলে আশা করি। তারপরও আমরা একটি ‘মানবিক সহায়তা কমিটি’ করেছি, যারা নিরপেক্ষ তালিকা করছে। এদের তদারকি ও নজরদারির জন্য উপজেলা, জেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে লোকবল কাজ করছে। রাজনৈতিকভাবে এই তালিকা তৈরির সুযোগ রাখা হয়নি।
বাংলাদেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের ১৪৫টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় দরিদ্রশ্রেণির বদলে স্বচ্ছদের ভাতা পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, ত্রাণ দেওয়ার সময় অনিয়মের প্রধান কারণ হলো দেশে ধনী ও দরিদ্রের কোনো তালিকা না থাকা। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ টাকা ও ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা আনতে ২০১৩ সালে প্রতিটি খানা থেকে তথ্য সংগ্রহের কাজে হাত দেয় পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ। উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় খানা ডাটাবেস জরিপ (এনএইচডি) চালিয়ে দেশে প্রমবারের মতো একটি ধনী-দরিদ্রের তালিকা তৈরি করা। ৩২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সাড়ে তিন কোটি খানার তথ্য সংগ্রহ করার প্রকল্পটি ২০১৭ সালের জুনে শেষ করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্পটি শেষ করতে পারেনি পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ। এখন প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২১ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আর ৩২৮ কোটি টাকার প্রকল্প গিয়ে ৭২৭ কোটি টাকায় ঠেকেছে। বিবিএস মহাপরিচালক তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রকল্পটির কাজ এখনো শেষ হয়নি। স্থানীয় পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, সরকারিভাবে মাঠ পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণের সময় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। পুরনো ধাঁচে ত্রাণ বিতরণ প্রক্রিয়ার কারণে এমনটি হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। তা ছাড়া যাদের এখন ত্রাণ খুব প্রয়োজন, তাদের নাম সঠিক জায়গায় যাচ্ছে না। বিবিএস যদি ওই তালিকাটি করতে পারত, তাহলে ত্রাণ নিয়ে এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলে জানিয়েছেন একাধিক জেলা প্রশাসক। এ বিষয়ে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারপ্রধানের অধীনে নির্বাহী কর্মকর্তাসহ বিভিণ্ণ পর্যায়ে ব্যক্তিরা রয়েছেন। এই তালিকা করতে তাদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। এটি করতে পারলে তালিকা মোটামুটি নিরপেক্ষ হবে। শুধু জনপ্রতিনিধিদের হাতে ছেড়ে দিলে তালিকা নিরপেক্ষ হওয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে। এজন্য প্রশাসনের লোকদের কাজে লাগানোর বিকল্প নেই।