চিকিৎসাবিজ্ঞানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ 

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৫ এএম

চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা ভেবে কূল পাচ্ছেন না, কেন এত অধিক সংখ্যক মানুষ প্রতি বছর বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে। কীভাবে এসব রোগ সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা পাওয়া যায় এবং রোগপ্রতিরোধ ও প্রতিকারের মাধ্যমে অসহায় মানুষকে রক্ষা করা যায়। জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে নতুন নতুন আবিষ্কার মানুষের স্বাস্থ্যসমস্যা দূরীকরণে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে তা নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্বের শেষ নেই। উন্নত বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা নানা ধরনের জটিল স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ে বছরের পর বছর গবেষণা চালিয়েও সিদ্ধান্তে আসতে পারছেনা কেন মানুষ বিশেষ স্বাস্থ্যসমস্যার জন্য চিকিৎসা নিয়ে ভিন্ন ধরনের ফলাফল পাচ্ছেন। একই ওষুধের কারণে বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এটা কি এই কারণে যে প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবে আলাদা মানুষ, অন্য মানুষের সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই? বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ও মারণঘাতী স্বাস্থ্যসমস্যার মধ্যে রয়েছে স্থূলতা, এইজিং, ডিমেনশিয়া, ক্যানসার, সংক্রামক রোগ ও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ডায়াবেটিসের মতো আরও বহু জটিল রোগ। এখন রোগের ধরন ও প্রকৃতিকে আগের সনাতনী দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করার সুযোগ কমে যাচ্ছে। আমাদের বিশেষ কিছু রোগ সম্পর্কে যথাযথ ধারণা পাওয়ার জন্য ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিসেবে এটা বোঝা এখন সহজ হয়েছে যে, কোনো কোনো মানুষের শরীর ও স্বাস্থ্য অন্যদের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষকে এমন ক্ষমতা দিয়েছে যে, মানুষ এখন কোষ পর্যায়ে রোগের উৎপত্তি বিশ্লেষণ করতে পারে। এটাকে এক অসাধারণ বিপ্লব বলে চিকিৎসাবিজ্ঞান স্বীকার করে নিয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও রোগ সম্পর্কে নিত্যনতুন ধ্যান-ধারণা কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন বিভিন্ন মানুষের জন্য ভিন্ন উপায়ে রোগপ্রতিরোধ ও প্রতিকারের সুষ্ঠু উপায় খুঁজতে চেষ্টা করছেন। তবে নিঃসন্দেহে এটি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের অনেক বিষয় খুব সহজভাবে বুঝতে সাহায্য করছে সত্যি। সমসাময়িককালে এসব উন্নয়ন আমাদের সামনে এমন সব জটিল বিষয় উপস্থাপন করছে যার সমাধান খুঁজে পেতে হয়তো আমাদের অনেক সময় লেগে যাবে। আর সেই কারণে স্বাস্থ্যসমস্যা সমাধানে একদিকে এগিয়ে থাকলেও অন্যদিকে এসব জটিলতার কারণে আমরা পিছিয়ে পড়ছি, আমরা সমানতালে এগোতে পারছি না।

রোগপ্রতিরোধ, প্রতিকার ও লাইফস্টাইল পরিবর্তনের মাধ্যমে চিকিৎসাবিজ্ঞান একজন মানুষকে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ জীবনপ্রাপ্ত যে কারও মনে হতে পারে, এ জীবন তার জন্য মঙ্গলজনক নয়, সহনশীলও নয়। দীর্ঘজীবনপ্রাপ্ত অধিকাংশ মানুষ ডিমেনশিয়া বা মস্তিষ্কের কার্যকারিতাহীনতায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে অনেক কিছুই মনে রাখতে পারে না, মতিভ্রমে ভোগে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও বিভিন্ন জটিল সংবেদনশীল সিস্টেম অকার্যকর হতে শুরু করে। অনেক মানুষ মাত্রাতিরিক্ত অসুস্থতার কারণে নিজের যতœ নিজে নিতে পারে না, অন্যের গলগ্রহ হয়ে থাকতে হয়। এই সমস্যা উন্নত বিশ্বে অতি প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানে সিনিয়র সিটিজেনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সিনিয়র সিটিজেনদের ভরণপোষণ, পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বিধান, পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানসহ অন্যান্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে গিয়ে সরকারকে বাজেটের একটি বিরাট অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী বয়সজনিত স্বাস্থ্যসমস্যা ও রোগবিমারির কারণে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যয় অনেকগুণ বেড়ে গেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কিছু দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয় এবং প্রায়শই মৃত্যুবরণ করে নতুবা অসুস্থতা বা পঙ্গুত্ব নিয়ে দুর্বিষহভাবে জীবনযাপন করে। বয়স্ক মানুষ সাধারণত ক্যানসার, উচ্চরক্তচাপ, স্ট্রোক, হৃদরোগ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসে বেশি আক্রান্ত হয়। অনেক বয়স্ক মানুষ স্থূল হয়ে যায় বলে স্বাস্থ্যসমস্যা আরও জটিল হয়ে পড়ে। উল্লিখিত রোগের কমবেশি চিকিৎসা থাকলেও ডিমেনশিয়া নিয়ে গবেষকরা ভীষণ দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। কারণ ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ বা প্রতিকারে এখনো কোনো পন্থা আবিষ্কৃত হয়নি। ইতিমধ্যে ডিমেনশিয়া নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়ে গেছে। কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা চিন্তাভাবনা করছেন। তার মধ্যে রয়েছে স্টেমসেল থেরাপি। স্টেমসেল থেরাপির মাধ্যমে মস্তিস্কের রোগাক্রান্ত কোষ বা কোষপি-কে সরিয়ে সুস্থ কোষ বা কোষসমষ্টি প্রতিস্থাপন করলে ডিমেনশিয়ার প্রতিকার হতে পারে। সামাজিক সম্পর্ক বা লাইফস্টাইল ডিমেনশিয়ার ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়েও বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ডিমেনশিয়ার ধরন, প্রকারভেদ ও অন্যান্য কিছু রহস্যজনক ফ্যাক্টর বিজ্ঞানীদের চরম বিভ্রান্তিতে ফেলে রেখেছে যা উত্তরণের পথ এখনো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এক কথায় ডিমেনশিয়ার সংজ্ঞা প্রদান করা সহজ নয়। ডিমেনশিয়া হলো এমন অনেক রোগের সমষ্টি যাতে আক্রান্ত হলে মস্তিষ্ক তার কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

গবেষকরা হৃদরোগ, স্ট্রোক, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ক্যানসার জাতীয় মারণঘাতী রোগের উৎপত্তি, বিস্তার, কার্যপ্রণালি, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সম্পর্কে ইতিমধ্যে বেশ কিছু অগ্রগতি অর্জন করলেও তা এখনো সীমিত পর্যায়েই রয়ে গেছে বলে অনেক অভিজ্ঞ চিকিৎসাবিজ্ঞানী মনে করেন। কারণ এসব রোগের মৃত্যুহার মোটেই হ্রাস করা যাচ্ছে না, বরং দিন দিন বাড়ছে বলেই পরিসংখ্যান তথ্য দিচ্ছে। কিন্তু মস্তিষ্কের কার্যাবলি ও কার্যপ্রণালি নিয়ে গবেষকরা এখনো বেশি দূর এগোতে পারেননি। মস্তিষ্কের কার্যাবলি, কার্যপ্রণালি ও বিভিন্ন রোগ ও তার চিকিৎসা এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে। ডিমেনশিয়া নিয়ে গবেষণা করা ও তার প্রতিকার খুঁজে বের করা কেন এত কষ্টসাধ্য তা অতি সহজে অনুমান করা যায়। ডিমেনশিয়া নিয়ে কাজ করতে হলে রোগীর মস্তিষ্ক বের করে এনে তা স্যাম্পল হিসেবে ব্যবহার করে গবেষণা চালাতে হয়। রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য রক্ত, মলমূত্র ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকে স্যাম্পল নিয়ে যেভাবে গবেষকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান, রোগীর মস্তিষ্ক নিয়ে সেভাবে গবেষণা চালানো সম্ভবপর নয়। আমরা মস্তিষ্ককে স্ক্যান করতে পারি। কিন্তু সেই পরীক্ষা শুধু মস্তিষ্কের গঠন নিয়ে আলোকপাত করতে পারে। ডিমেনশিয়ার প্রতিকার বা ওষুধ আবিষ্কার করতে হলে আমাদের জানতে হয়, মস্তিষ্কের কোষ কীভাবে আচরণ করে, কীভাবে কাজ করে বা কীভাবে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে। সেটা জানার জন্য একজন গবেষকের প্রয়োজন রোগীর জীবন্ত মস্তিষ্কের কোষসমষ্টি এবং তা পাওয়া মোটেই সম্ভব নয়। আসলে বৃদ্ধ বয়সে মস্তিষ্কের কোষে কী ঘটে, কীভাবে ঘটে তার ওপর পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া রীতিমতো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য সবচেয়ে জটিল ও চ্যালেঞ্জের কাজ হবে, মানুষ কেন এবং কীভাবে বুড়িয়ে যায় তার গুপ্ত রহস্য অনুসন্ধান করা। মানুষের আণবিক ও কোষ পর্যায়ে ক্ষয় ও ধ্বংসলীলা বুঝতে বুঝতে বিজ্ঞানীদের বহু সময় পার হয়ে যেতে পারে। কারণ ব্যাপরটি যেমন সূক্ষ্ম তেমনি জঠিল। তবে গবেষকরা ইতিমধ্যে জেনে গেছেন যে,  ক্রোমোজমের প্রান্ত, যাকে টেলোমার বলা হয়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাটো হতে থাকে। তারা কমবেশি এও জানেন, কোনো কোনো কোষের জৈবিক কার্যপ্রণালি ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে থাকে। কিন্তু কোন জৈবিক কার্যপ্রণালি দুর্বল হয় এবং কীভাবে হয় তা এখনো নির্দিষ্টভাবে জানা সম্ভব হয়নি। এ ব্যাপারে অনেক কিছু এখনো মানুষের অজানা রয়ে গেছে।

শরীরের বাড়তি ওজন বা স্থূলতা এই শতাব্দীর চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য অন্য এক মহাচ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থূলতা বয়স্ক মানুষের জন্য এক বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকি। কারণ স্থূলতার কারণে শরীরে অসংখ্য রোগের উৎপত্তি হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এখনো কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন না, কেন অনেক মানুষের শরীরে মাত্রাতিরিক্ত চর্বি জমে। একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী স্বীকার করেছেন, মানুষ যতটুকু ভাবে আমরা স্থূলতা সম্পর্কে তার চেয়ে অনেক কম জানি। স্থূলতা মহামারী একটি বড় ধরনের গ্লোবাল চ্যালেঞ্জ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি একটি বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক মানুষ অনেক বেশি খায় ও ব্যায়াম না করেও স্থূল হয় না। আবার এমন বহু মানুষ রয়েছে যারা খুব কম খায় আর প্রচুর ব্যায়াম করে। তারপরও তাদের ওজন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অনেক মানুষের শরীরে বিস্তর চর্বি জমা হয় এবং ব্যায়াম করেও তা জ্বালিয়ে দেওয়া যায় না। আবার অনেক মানুষের শরীরে চর্বি জমলেও ক্যালরি উৎপাদনের জন্য তা অতি সহজে ব্যবহৃত হয়ে যায়। এসব বৈষম্যমূলক ও অস্বাভাবিক কার্যপ্রণালি বোঝা ও ব্যাখা করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পক্ষে সব সময় সহজসাধ্য হয় না। এসব বৈষম্য বিস্ময়কর নয় কি! এসব বিস্ময়কর বৈষম্য ও অস্বাভাবিক কার্যপ্রণালির উত্তর চিকিৎসাবিজ্ঞান কীভাবে দেবে?

লেখক: ওষুধ ও জনস্বাস্থ্য  বিশেষজ্ঞ। সাবেক অধ্যাপক ও ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে ডেফোডিল ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনারত।

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত