জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৫ এএম

বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা নদীভাঙন নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই এই ভূখণ্ডের মানুষের জীবনযাত্রা গড়ে উঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্যোগের প্রকৃতি বদলে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যা হচ্ছে আরও আকস্মিক, বৃষ্টিপাত আরও অনিয়মিত, খরা আরও দীর্ঘ এবং উপকূলে লবণাক্ততা আরও ভেতরে প্রবেশ করছে। ফলে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, সবকিছুই একসঙ্গে চাপে পড়ছে। খাদ্যনিরাপত্তা শুধু কৃষির বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ একসময় খাদ্য ঘাটতির দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। স্বাধীনতার পর দুর্ভিক্ষ, ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে খাদ্য উৎপাদন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এখন নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি জলবায়ু পরিবর্তন। খাদ্যনিরাপত্তা বলতে শুধু পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনকে বোঝায় না। এর অর্থ হলো, প্রত্যেক মানুষের জন্য সবসময় পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা থাকা এবং সেই খাদ্য কেনার সামর্থ্য থাকা।

এই বাস্তবতার প্রতিফলন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও স্পষ্ট। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ এবং আয়ের অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনকভাবে উঠে এসেছে ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আইপিসি)’-এর ২০২৬ সালের বিশ্লেষণে। সেখানে বলা হয়েছে, মে থেকে আগস্ট ২০২৬ সময়ে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ উচ্চমাত্রার খাদ্য অনিরাপত্তায় (আইপিসি ফেজ ৩ বা তার বেশি) রয়েছে। বছরের শেষভাগে এই সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জ, কক্সবাজার এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় জলবায়ুজনিত দুর্যোগ। ২০২৬ সালের আগাম বন্যার আশঙ্কায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে বন্যার পানি আসার আগেই ২০ হাজারের বেশি পরিবারকে আগাম নগদ সহায়তা দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, দুর্যোগ এখন আর শুধু জরুরি ত্রাণের বিষয় নয়; বরং আগাম প্রস্তুতি ও পূর্বাভাসভিত্তিক ব্যবস্থাপনাই হয়ে উঠছে খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষার নতুন কৌশল। খাদ্যনিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের কৃষিও একাধিক ঝুঁকির মুখে। দেশের খাদ্যব্যবস্থা এখনো ধানকেন্দ্রিক। অথচ অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘ খরা, নদীভাঙন এবং উপকূলে লবণাক্ততার বিস্তার ধান উৎপাদনকে আগের চেয়ে অনেক বেশি অনিশ্চিত করে তুলেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈশি^ক বাজারে সার, জ¦ালানি ও কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি। সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু অভিযোজনকে একই কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় উৎপাদন বাড়লেও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশের কৃষিতে এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। দেশের উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘ খরা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার এবং উপকূলজুড়ে ঘূর্ণিঝড়ের ঘনঘটা কৃষির প্রচলিত উৎপাদন ব্যবস্থাকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে। একসময় কৃষকরা মৌসুমের সময়সূচি ধরে বপন ও কাটার পরিকল্পনা করতে পারতেন। এখন সেই ক্যালেন্ডার বারবার বদলে যাচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ওপর।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুষ্টি। বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও মানুষের খাদ্যতালিকায় পুষ্টির বৈচিত্র্য এখনো পর্যাপ্ত নয়। অনেক পরিবার আয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল কিংবা ফলমূল নিয়মিত কিনতে পারে না। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। শিশুদের খর্বাকৃতি বৃদ্ধি, রক্তস্বল্পতা এবং মাতৃস্বাস্থ্যের সমস্যার সঙ্গে এই বাস্তবতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রথমত, জলবায়ু-সহনশীল কৃষিকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। লবণাক্ততা, খরা ও জলাবদ্ধতা-সহনশীল নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবন এবং দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষিতে গবেষণা ও সম্প্রসারণ সেবায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক চাষাবাদ দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়। তৃতীয়ত, কৃষকের ঝুঁকি কমাতে শস্যবীমা, সহজ ঋণ এবং ডিজিটাল কৃষি পরামর্শব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে খাদ্যব্যবস্থাকে শুধু ধাননির্ভর রাখলে চলবে না। ডাল, ভুট্টা, তৈলবীজ, ফল, শাকসবজি, মাছ ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এতে একদিকে যেমন পুষ্টি নিরাপত্তা বাড়বে, অন্যদিকে একটি ফসলের ক্ষতিতে পুরো খাদ্যব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ার ঝুঁকিও কমবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিরও নতুন করে মূল্যায়ন প্রয়োজন। দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও কার্যকর হলো দুর্যোগের আগে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে প্রস্তুত করা। আগাম সতর্কবার্তা, পূর্বাভাসভিত্তিক নগদ সহায়তা, কৃষকের জন্য জলবায়ু তথ্যসেবা এবং স্থানীয় খাদ্য মজুদব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

এখন আর খণ্ডিত উদ্যোগে কাজ হবে না। কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, বাজারব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। খাদ্যনিরাপত্তাকে শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়েছে। এটি অর্থনীতি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তার সমন্বিত ইস্যু। উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে নয়; সংকটের সময় সাধারণ মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে বাংলাদেশের জন্য সেটিই হবে উন্নয়নের সবচেয়ে কঠিন, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

লেখক : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী পেশাজীবী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত