করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সংক্রমণ ঝুঁকির মধ্যেও অবরুদ্ধ অবস্থা (লকডাউন) শিথিল করে সীমিত পরিসরে নিজ সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে শিল্পকারখানা খোলায় মত দিয়েছে সরকার। এ সুযোগে এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জে বিসিক (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা) নগরীতে ২৩৮টি পোশাক কারখানা খোলা হয়েছে। এসব কারখানার মধ্যে কয়েকটিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অধিকাংশের অবস্থা নিয়ে শঙ্কিত শ্রমিকরা। তবে শিল্প পুলিশ বলছে, শতকরা ৩২ ভাগ কারখানায় পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণে এসব কারখানার মালিকপক্ষকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
শিল্প পুলিশ-৪-এর পরিদর্শক (ইন্টেলিজেন্স) শেখ বশির আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, নারায়ণগঞ্জে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্যভুক্ত ২৩৫ কারখানার মধ্যে চালু রয়েছে ২৬টি, বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) ৭৯২টি মধ্যে ১৭০টি, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষের (বেপজা) অধীনে ইপিজেডে ৪৮ মধ্যে ২৫টি ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) ১৭২ মধ্যে ১৭টি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই পোশাক কারখানা চালুর সংখ্যা বাড়ছে। তবে কোথাও কোনো শ্রমিক অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়নি।’
সদর উপজেলার শাসনগাঁও বিসিক শিল্পাঞ্চলের পোশাক কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, যেসব কারখানা চালু হয়েছে তার অধিকাংশেরই স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। হাত ধোয়া, তাপমাত্রা নির্ণয়, ব্লিচিং বা ক্লোরিনমিশ্রিত পানি দিয়ে জুতা পরিষ্কার ইত্যাদি করতে কড়াকড়ি করা হচ্ছে না। অনেক শ্রমিক হাত না ধুয়েও কারখানায় প্রবেশ করছে। কারখানায় দেওয়া হচ্ছে না হ্যান্ড স্যানিটাইজারও। শ্রমিকরা কাপড়ের তৈরি মাস্ক ব্যবহার করলেও তাদের হাত গ্লাভস দেওয়া হয়নি। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কারখানায় প্রবেশের সময় ফটক দিয়ে শ্রমিকদের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আসা-যাওয়া করতে দেখা গেছে।
সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়া কারখানাগুলো হলো ফকির অ্যাপারেলস, স্টার লাইন অ্যাপারেলস, স্টার নেট গার্মেন্টস, রহমানিয়া গার্মেন্টস, উয়েভ টেক্স অ্যাপারেলস লিমিটেড, ফোর ডিজাইন প্রাইভেট লিমিটেড, মানহা অ্যাটায়ার্স কম্পোজিট লিমিটেড, ইউনিসন ডিজাইন লিমিটেড, নিমরেক ডিজাইন লিমিটেড, নিট গার্ডেন প্রাইভেট লিমিটেড, জাবন অ্যাপারেলস লিমিটেড, প্যাট্রিসিয়া অ্যাপারেলস ও আর ফোর ফ্যাশন ওয়্যার প্রাইভেট লিমিটেড।
ফকির অ্যাপারেলসের শ্রমিক আয়েশা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাত ধোয়া, তাপমাত্রা দেখে তারপর কারখানায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। তবে কারখানা থেকে কোনো মাস্ক, গ্লাভস দেওয়া হয়নি। শুরুতে শ্রমিক কম থাকলেও এখন কারখানায় প্রায় সব শ্রমিক চলে এসেছে। অল্প কিছু শ্রমিক এখনো গ্রাম থেকে আসেনি।
ফোর ডিজাইন প্রাইভেট লিমিটেডের শ্রমিক কহিনূর বেগম বলেন, বাইরে হাত ধোয়া, তাপমাত্রা দেখা হলেও ভেতরে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
ফোর ফ্যাশন ওয়্যার প্রাইভেট লিমিটেডের শ্রমিক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘কারখানার গেটে একটি মাত্র পানি ছিটানোর বক্স (জীবাণুনাশক ট্যানেল) বসানো হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ৪০০ শ্রমিক যাতায়াত করতে গেলেই ভিড় জমে যায়। হেক্সিসল, মাস্ক, গ্লাভস কিছু দেয় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সামনে ঈদ, তার ওপর সব শ্রমিকের বাসাভাড়া বকেয়া পড়েছে। এখন কাজ না করলে বেতন দেবে না। তাই বাধ্য হয়ে কাজে এসেছি।’
পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকা নিয়ে শ্রমিকদের অভিযোগের বিষয়ে শিল্প পুলিশ-৪-এর পরিদর্শক (ইন্টেলিজেন্স) শেখ বশির আহমেদ বলেন, ‘আমরা কারখানাগুলো পর্যবেক্ষণ করছি। ২৩৮ কারখানার মধ্যে শতকরা ৬৮ ভাগ কারখানায় পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বাকি ৩২ ভাগ কারখানায় আংশিক রয়েছে। এজন্য আমরা কারখানার মালিকদের চিঠি দিয়েছি যাতে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আর কারখানাগুলোতে ৩৫ শতাংশ শ্রমিক কাজে যোগ দিয়েছে।’
বিভিন্ন কারখানায় পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই শ্রমিকদের অভিযোগের বিষয়ে বিকেএমইএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলভ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ অভিযোগটি আমরা শুনেছি। বিকেএমইএর পক্ষ থেকে একটি মনিটরিং টিম করা হচ্ছে। এরা প্রতিটি কারখানা পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট দেবে। যেখানে সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকবে না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেটা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় লকডাউন করা কিংবা বিকেএমইএর সদস্যপদ বাতিল করা হবে।’