বাঁশখালীতে হাতি মেরে গোপনে পুঁতে ফেলার অভিযোগ

এশিয়ার একমাত্র হাতির প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত চুনতি অভয়ারণ্য। আর এ অভয়ারণ্য বেশ কিছু অংশজুড়ে রয়েছে বাঁশখালীর পাহাড়ী জনপদ। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগের আওতায় জলদী অভয়ারণ্য রেঞ্জ ও কালীপুর রেঞ্জের আওতায় ৮টি বিট অফিস রয়েছে।

চলতি বছরে জ্ঞাতভাবে ৪টি হাতির মৃত্যু এবং অজ্ঞাতসারে আরো হাতির মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।

চলতি বছরে ৫ ফেব্রুয়ারি সাধনপুর পাহাড়ি হাতির মৃত্যু হয়। এরপর ৩০ মার্চ সাধনপুর লটমনি পাহাড়ে এবং ২৩ মে একইভাবে হাতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

সর্বশেষ গতকাল ১৩ জুন বৈলছড়ির অভ্যারখীল পাহাড়ে হাতিকে মেরে গোপনে পুঁতে ফেলার ঘটনা জানাজানি হলে সেখানে প্রশাসন, বনবিভাগ ও স্থানীয়  সাংবাদিকেরা ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হয়ে সেখানে ছুটে যান। পরদিন ১৪ জুন বনবিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ স্থান পরিদর্শন করে কিভাবে হাতিকে মারা হয়েছে সে ঘটনা তদন্ত করেন।

এছাড়া চলতি বছরে ২ ফেব্রুয়ারি পুঁইছড়ির জহরলাল দেব প্রকাশ কালাবাশি (৩৫), ৬ ফেব্রুয়ারি সাধনপুর এলাকার আবদুল মুবিন (৫০), ১১ মার্চ বাঁশখালী ইকোপার্ক এলাকায় শীলকুপের রিতা বড়–য়া হাতির হামলায় মৃত্যুবরণ করেন।

এদিকে বাঁশখালীর বৈলছড়ি ইউনিয়নের অভ্যারখীল পাহাড়ে গোপনে পুঁতে ফেলা হাতির ১৩ জুন সন্ধান পাওয়া গেছে। পুঁতে ফেলা হাতির গন্ধে এলাকাবাসী অতিষ্ট হয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান কফিল উদ্দিনের কাছে অভিযোগ করলে তিনি বনবিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে অবহিত করেন।

এরই প্রেক্ষিতে বাঁশখালীর কর্মরত একদল সাংবাদিক বৈলছড়ি ইউনিয়নের অভ্যারখীল পাহাড়ি এলাকায় পুঁতে ফেলা হাতির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

এ সময় কালীপুর রেঞ্জের আওতাধীন সাধনপুর বনবিট কর্মকর্তা জলিলুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বৈলছড়ি ইউনিয়নের অভ্যারখীল পাহাড়ি এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য বসতভিটা।

এছাড়া পাহাড়ের জায়গা খণ্ড খণ্ড করে গড়ে তোলা হয়েছে নানা প্রজাতির ফসলি ক্ষেত।

বিগত ১০-১২ দিন আগে স্থানীয় কিছু লোক বাগানে বিদ্যুৎ এবং বিষাক্ত কাঁঠাল খাওয়ানোর পর হাতির মৃত্যু হলে বনবিভাগকে না জানিয়ে অভ্যারখীল পাহাড়ি এলাকার জনৈক আবদুল আলিমের জায়গায় হাতিটিকে পুঁতে ফেলা হয়।

খবর পেয়ে বাঁশখালীতে কর্মরত সাংবাদিকরা ওই হাতি পুঁতে ফেলার ঘটনাস্থলে গিয়ে সরজমিনে প্রত্যক্ষ করেন এবং বিষয়টি নিশ্চিত হন।

এ ব্যাপারে বৈলছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কফিল উদ্দিন বলেন, স্থানীয় জনগণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঘটনাস্থলে চৌকিদার দফাদারকে প্রেরণ করে হাতি পুঁতে ফেলার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর বন বিভাগ এবং প্রশাসনকে অবহিত করা হয়।

তিনি আরও বলেন, এই পাহাড়ি এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে যারা হাতিকে নানাভাবে হত্যা করে হাতির মূল্যবান অংশ ও দাঁত বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে।

এ ব্যাপারে সাধনপুর রেঞ্জের সাধনপুর বনবিট কর্মকর্তা জলিলুর রহমান বলেন, চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় জনগণের খবরের ভিত্তিতে এসে হাতিকে মেরে পুঁতে ফেলার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। যদি ঘটনাটি ১০-১২ দিন আগের। যারা এই হাতি হত্যা এবং আমাদেরকে না জানিয়ে অগোচরে মাটি চাপা দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।

বাঁশখালী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. সমরঞ্জন বড়–য়া বলেন, এ ধরনের প্রতিনিয়ত হাতির মৃত্যুর ঘটনা বাঁশখালীর আগে অন্য কোথাও দেখেনি । কি কারণে হাতিগুলো বার বার মারা যাচ্ছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। হাতির ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায় একেকটা হাতি একেক কারনে মৃত্যুবরণ করেছে।

জলদী অভয়ারন্য রেঞ্জ ও বাঁশখালী ইকোপার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান শেখ বলেন, পাহাড়ে অধিক জনবসতি গড়ে উঠায় খাদ্য স্বপ্লতার কারণে হাতি লোকালয়ে ছুটে আসছে। আর এ সুযোগে কিছু খারাপ লোক খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে হাতিকে হত্যা করছে। আবার অনেক সময় বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে হাতিকে মারা হচ্ছে।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার বলেন, কেউ যদি অন্যায়ভাবে ভিন্ন কৌশলে হাতিকে ফাঁদ পেতে হত্যা করে তাহলে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হবে। আর হাতির হামলায় যারা মারা যাচ্ছে তাদের বনবিভাগ ও সরকারিভাবে সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।