বাংলাদেশে ভার্চুয়াল চিত্রকর্ম প্রদর্শনীর প্রচলন আমরা অতীতে দেখিনি। সর্বপ্রথম অনলাইনে চিত্রপ্রদর্শনীর ঐতিহাসিক সূচনা করেছেন ছাপচিত্র বিভাগের মেধাবী ছাত্র সাদেক আহমেদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের ছাপচিত্র বিভাগের মেধাবি ছাত্র ছিলেন; কিছুদিন শিক্ষকতাও করেছেন। তবে বাংলাদেশে ভার্চুয়াল গ্যালারি নির্মাণ এবং প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত করার যে কর্মযজ্ঞ তিনি সম্পন্ন করেছেন তা সত্যিই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তবে একটু বলে রাখা ভালো, ২০১১ সালে গুগল আর্ট প্রজেক্ট থেকে মোমা নামে একটি অনলাইন গ্যালারির সূচনা করা হয়েছিল। এরপর আর থেমে নেই। বর্তমানে লন্ডনের গ্যালারি এবং যাদুঘরগুলোতে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ভ্রমণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ৩৬০ ডিগ্রি যাদুঘরের ট্যুর থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের স্পটলাইট পর্যন্ত আমরা ঘরে বসেই সংগ্রহশালা এবং গ্যালারি ঘুরে দেখতে পারি। ঠিক একইভাবে ব্রিটিশ গ্রন্থাগারেও ভার্চুয়াল ভ্রমনের ব্যবস্থা রয়েছে।
ব্রিটিশ যাদুঘরের ভেতর ৮ মিলিয়নেরও বেশি অবজেক্ট ভার্চুয়াল গ্যালারিতে রাখা আছে। নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অফ আর্ট তিনটি সাইটকে কভার করে, যা সমস্ত গুগল আর্টস অ্যান্ড কালচারে নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। অনলাইন প্রদর্শনী এবং এখানে শিল্প ইতিহাসের একটি টাইমলাইনও রয়েছে, যেখানে আপনি খ্রিস্টপূর্ব আট হাজার থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত শৈল্পিক অনুশীলনের বিকাশ খুব সহজেই দেখতে পারবেন। আর তাই বৈশ্বিক শিল্প প্রদর্শনীর আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে এই “বৈশ্বিক দুর্যোগের গতিপ্রকৃতি” শীর্ষক ভার্চুয়াল চিত্রপ্রদর্শনী ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করছে।
শিল্পী মোস্তাফিজুল হকের চিত্রকর্ম সম্পর্কে কিছু কথা বলার প্রয়োজন আমি সবসময়ই অনুভব করি। তবে এর আগে ইমানুয়েল কান্টের “ক্রিটিক অব পিউর রিজন” গ্রন্থ থেকে লেখকের যুক্তি বিচারের প্রাণময়তা এবং জ্ঞানের মাপজোক নিয়ে ‘থিউরি অব পারসেপশন’ তত্ত্ব সম্পর্কে একটু ধারণা প্রকাশ করতে চাই।
এ আলোচনায় জ্ঞানের দুই ধরণের পরিচিতি তিনি দান করেছেন। একটি হচ্ছে প্রায়োরি এবং আরেকটি হচ্ছে পোস্টেরিওরি। পোস্টেরিওরি হচ্ছে যখন কোনো বাক্য বা বিবৃতির অর্থ বোঝার জন্য অথবা সঠিকতা বিচারের জন্য পর্যবেক্ষণ বা অভিজ্ঞতার প্রয়োজন পড়ে তখন সেই জ্ঞানের যৌক্তিক প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় পোস্টেরিওরি। নীরিক্ষাধর্মী চিত্রকর্ম সম্পর্কে ধারণা নির্মাণ এবং আলোচনার জন্য পোস্টেরিওরি জ্ঞানচর্চাটা জরুরি। অর্থাৎ শিল্পী মোস্তাফিজুল হকের চিত্র আলোচনায় শুধু মোরগ, শকুন বা ঘোড়ার অবয়বকে অনুভূতির মানদণ্ডে রাখা যাবে না; এখানে চিন্তার প্রকৃত ধারার বিশ্লেষণ এবং স্বাধীনতার মৌলিক অস্তিত্ব নিয়ে ভাবনার সৌন্দর্যকে উপস্থাপন করাটা জরুরি।
কল্পনা বা ইমাজিনেশন আসলে কীভাবে আসে; কল্পনার দৃশ্যরূপের সাথে বাস্তবতার নিরন্তর সত্য কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় তা গভীরভাবে অনুধাবনযোগ্য।
শিল্পীর পারসেপশান বা অনুভূতি হচ্ছে প্রথমেই পালক, পালকের অস্তিত্ব আবার ঝরে পড়া। পলকের আঁধার, আধাঁরের রূপ, লড়াই, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব- এসব কিছুই সময়ের সঙ্কটকালীন অতিবাস্তব দৃশ্যরূপের একেকটি আদল মাত্র। শুভ এবং অশুভ সময়ের লড়াই; টিকে থাকার যুদ্ধ সবকিছুই স্বতন্ত্র স্বাধীনতাকে ঘিরে।
যা ইচ্ছে তাই কিনে খেতে পারলেই মানুষের বেঁচে থাকার স্বাধীনতা টিকে থাকে না। স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে হলে অস্তিত্ব প্রকাশের উন্মুক্ত পরিসর চাই; নিজস্বতা রক্ষার প্রতিরোধ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করার অধিকার থাকা প্রয়োজন। তাই তো এই বৈশ্বিক দুর্যোগে প্রকৃতি তার মাতৃস্নেহে মানুষ ব্যাতিত সকল জীবের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় খুবই আন্তরিক। মানুষের ক্ষমতায়নের বর্বর চর্চায় মানুষ আজ মৃত্যুর একমাত্র নিয়তি। তাইতো আজ শকুনেরা স্বাধীন; শুভ শক্তির ক্রমাগত পরাজয়ে ভারসাম্য অরক্ষিত হয়েগেছে আর সমগোত্রীয় লড়াই হয়ে উঠেছে অমানবিক। এই লড়াইটা অদৃশ্য জীবানুর আক্রমনের পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয়েছে ঠিকই কিন্তু একটি পোস্টেরিওরি খুব পরিস্কার করেছেন শিল্পী সেটা হচ্ছে স্বাধীনতার সৌন্দর্য । প্রতিবাদের ভাষা প্রকাশের স্বাধীনতা, ক্ষোভ, রাগ, দুঃখবোধ প্রকাশের স্বাধীনতা আজ সত্যিই খুব বেশি প্রয়োজন। মানবজাতি বিদ্যুতায়নের নামে, শিল্পের নামে, নগড়ায়নের নামে সবসময়ই খড়গহস্তে প্রকৃতির বেড়ে উঠার স্বাধীনতায় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, কখনও খুব প্রয়োজনে কখনোবা শখ করে।
তাই তো শিল্পী আজ অন্তর আত্মায় অনুধাবন করছে প্রকৃতি আর প্রাণীর স্বাধীনতাকে। কতটা নৈসর্গিক হলে শিল্পী তুলিতে জীবের অস্তিত্ব, সংগ্রাম এবং টিকে থাকার লড়াই সৌন্দর্যের বাঁধনে এঁকেছেন। রং আর রেখার কথা তো চিত্রের আলোচনায় একটি ধারাবাহিক বক্তব্যের অংশ। রং দিয়ে শিল্পী ভর তৈরি করেছেন কি না; নীলাভ ব্যাকগ্রাউণ্ডে দুঃখ বা ভালোবাসার মিশেল অনুভূতি ছিল কি না; রংয়ের আস্তরায়ণে রেখার যে বলিষ্ঠতা প্রকাশ পেয়েছে তা বিন্যাসপ্রকরণে কতটা সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠা করেছে তা দর্শক বিবেচনায় নেবে।
আমি যা বলার চেষ্টা করছি তা হচ্ছে, শিল্পী শকুনের কম্পোজিশন ফ্লাসকাট করেছেন চিন্তাদৃশ্যের পরিচ্ছন্নতার প্রয়োগে।
বৈশ্বিক দুর্যোগের গতি যা চিত্রের বিষয়গত উপস্থাপনে খুবই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংগ্রামরত জীবেদের ভঙ্গিমা, প্রকৃতি থেকে যেন ক্যানভাসের মধ্যে আরও বেশি শক্তির সঞ্চারণ ঘটিয়েছে; সাহসিকতা আর স্পর্ধার নিমিত্তে যেন শিল্পী রূপের বিশ্লেষণ এবং সমন্বয় ঘটিয়েছেন নীরিক্ষাপ্রবণতায়।
বিষয়ের নেপথ্যে অর্ন্তমুখিনতা আর সামনে উজিয়ে দিয়েছেন ভঙ্গি; নানান কায়দায় ফর্ম ভাঙ্গার চেষ্টা এবং কখনো কখনো ফর্মকে নিজের মতো করে সৃষ্টির মুন্সিয়ানা কিন্তু রয়েছে। সুন্দরকে উপভোগ করার জন্য হৃদয়ে গ্রহণের দাবিনামা সম্পর্কিত ধারণা যেমন স্বতন্ত্র আকাঙ্ক্ষার প্রাপ্তিতে, ঠিক তেমনি সৌন্দর্য সৃষ্টি বা সৌন্দর্যচেতনা স্বাধীন। তাই তো বিশিষ্ট দার্শনিক এবং সমালোচক ইমানুয়েল কান্ট বলেছেন “শিল্পের সৌন্দর্য বিচার করতে গেলে তার নান্দনিকতা অনুভব করা যায় না, যা ওই শিল্পকর্মের অবাধ কল্পনার মাঝে লুকায়িত থাকে।”
তাই তো শিল্পকর্মের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শিল্পীর কল্পনার জগত এবং সেই জগতে জীবন, প্রকৃতি ও বাস্তবতার মিথষ্ক্রিয়ার উপলব্ধিকে বিবেচনা করা।
অবয়ব নির্মাণের প্রত্যয় থেকে চেতনার মাত্রা ও বৈশিষ্ট্য নির্ণীত হয়। তাইতো শিল্পী মোস্তাফিজুল হকের শিল্পকর্মে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি (Realisticl Assumption) এবং আবেগবাদী দৃষ্টিভঙ্গি (Emotional Assumption) প্রকট যা শিল্পত্বত্তে¡র চারটি মৌলিক স্তরের প্রথম দুইটি স্তরকে প্রকাশ করছে। তাইমেয়ুসের (Timaeus) সংলাপে প্লেটো বলেছেন, অনুকরণ যত আদর্শের অনুধ্যানে পর্যবসিত হয় তত তা পুর্ণ ও নিত্যকে ধারণ করেএবং ততই তা সুন্দর হয়।
এ শিল্পীর কাজে সত্যিই চেতনালব্ধ আদর্শের অনুধ্যান খুঁজে পাওয়া যায়। প্রকৃতি এবং প্রকৃতির সব প্রাণের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতার সত্যরূপকে সৃজন করবার প্রয়াস করেছেন। আত্মার অর্ন্তনিহিত আকুতির রূপপর্বকে আলিঙ্গন করেছেন।
বিশিষ্ট শিল্পসমালোচক সাধন কুমার ভট্টচার্য প্লেটোর চিন্তার সাথে সূত্রবদ্ধ হয়ে বলেছেন, “শিল্পের অস্তিত্ব স্বীকৃত হয়েছে যা প্রত্যক্ষ জগতের বিশেষ বস্তুর অনুকরণে নয়, যা অতিন্দ্রীয় প্রত্যক্ষলব্ধ সত্য স্বরূপের অনুধ্যান”।
শিল্পী মোস্তাফিজুল হক “করোনার দিনগুলিতে স্বাধীনতা” সিরিজে সত্য স্বরূপের অনুধ্যানী হয়েছেন। তিন বর্ণের গাঁথুনিতে রূপের ধারাকে নির্মাণ করেছেন। চিত্রে পশুপাখি বা প্রাণীর অবয়বগুলোকে জীবের প্রকৃতি হিসেবে তুলে ধরেছেন। লড়াই, সংকট এবং সংগ্রাম বাস্তবতার আত্মিক ক্রিয়াকে বিষয় নিরপেক্ষ করে প্রতিপন্ন করেছেন। শিল্পনির্মাণে শিল্পীর এই নিরন্তর প্রচেষ্টা এবং বিষয়ানুগ প্রচেষ্টা প্রাকৃতকল্প হয়ে টিকে থাকবে।
১৫ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত শিল্পী মোস্তাফিজুল হকের এই ভার্চুয়াল প্রদর্শনীটি শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, শান্ত মারিয়ম ফাউন্ডেশন ও সুন্দরবন কুরিয়ারের প্রতিষ্ঠাতা সদ্যপ্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মো. ইমামুল কবীর শান্তকে উৎসর্গ করা হয়েছে।
শিল্পী মোস্তাফিজুল হক বৈশ্বিক দুর্যোগেরকালে আয়োজিত এ প্রদর্শনীর আয় থেকে অর্ধেক অর্থ অসহায় মানুষের জন্য দান করবেন। শিল্পী মোস্তাফিজুল হক সবসময়ই সোজাসাপ্টা কথা বলতেই পছন্দ করেন। তবে ভেতর থেকে তিনি খুবই আবেগী একজন মানুষ। কষ্ট চেপে ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকা শিল্পীর অভ্যাগত সততা যা কখনো সৃষ্টির আড়াল নয়। বাগেরহাটের রামপালে প্রকৃতির সঙ্গে কেটেছে শিল্পীর শৈশব; শিল্পপাঠে এবং চর্চায় শিল্পীর জগতময় চিন্তা সত্যিই অভিজ্ঞতার আলোকবর্তিকাকে সমৃদ্ধ করেছে।